মহামারীতে রোজায় কী করবেন?

  • 1
    Share

অনলাইন ডেস্ক: করোনার টিকা নিয়ে যখন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিল দেশের মানুষ, তখন নতুন করে হানা দিয়েছে মরণঘাতী ভাইরাসটি। এবারের সংক্রমণ আগের চেয়ে ভয়াবহ। বলা হচ্ছে করোনা খোলস পাল্টে আফ্রিকান ভেরিয়েন্ট নামে আক্রান্ত করছে মানুষকে। এরই মধ্যে রোগীতে ঠাসা হাসপাতাল। ফলে আবার ফিরে যেতে হয়েছে আগের অবস্থানে। লকডাউনে মানুষকে ঘরবন্দি থাকতে হচ্ছে। একই সময় চলছে পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস। রোজায় মুসলমানদের জীবনযাপন পদ্ধতি পাল্টে যায়। এ সময় সারা দিন পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়। খাবার খেতে হয় সন্ধ্যা, রাত ও সুবহে সাদিকের সময়। এই পরিবর্তিত জীবনের সঙ্গে মানিয়ে চলা এবং সুস্থ থাকার জন্য শৃঙ্খলার বিকল্প নেই। দরকার কঠোর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা ও বিশ্রাম।

ইফতার

করোনা প্রতিরোধ করতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য রোজার সময় যেসব খাবার শরীরে শক্তি জোগায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে সেসব খাবার খাওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন তাঁরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. সুমাইয়া মামুন জানালেন, কেউ করোনা আক্রান্ত হলে সবার আগে তার সুস্থতার ওপর নজর দেওয়া উচিত। কেউ কভিড পজিটিভ হয়ে নেগেটিভ হওয়ার পরও পরিপূর্ণ সুস্থ হতে সাধারণত দেড়-দুই মাস সময় লেগে যায়। রোজার সময় একজন কভিড রোগীর বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। তার দেওয়া ডায়েট চার্ট অনুসরণ করে খাবার খেতে হবে।

যাঁরা সুস্থ আছেন তাঁরা অবশ্যই রোজা রাখতে পারবেন। এতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে এ জন্য ইফতার, রাতের খাবার ও সাহরিতে পুষ্টির দিকে নজর রাখতে হবে। অনেকেই ইফতারে খেজুর খান। এটা অনেক ভালো। খেজুরে প্রাকৃতিক সুগার আছে। এটা দ্রুত সারা দিনের ধকল কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। সঙ্গে ফাইবার ও নানা ধরনের খনিজ পদার্থ পাওয়া যায়। খেজুর খেলে রোজায় যাঁদের কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়, তাঁদেরও উপকার হয়। খেজুর খাওয়া শেষে জুস ও চিনির শরবত খান অনেকেই। এসবের পরিবর্তে পানি খাওয়া ভালো। সম্ভব হলে ডাবের পানি খেতে পারেন।

এতে প্রচুর পটাসিয়াম আছে। পানিশূন্যতা পূরণ হয়। চিনির শরবত খাবেন না। তার কারণ আমাদের শরীরে আলাদা করে চিনির কোনো প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত চিনি খেলে ওজন বেড়ে যাওয়া, হার্টের রোগসহ বিভিন্ন অসুখ হতে পারে। মিষ্টি কিছু খেতে চাইলে ফলমূল খেতে পারেন। একেক দিন একেক রকম ফল খেতে পারেন। ডুবো তেলে ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার ইফতারে খাবেন না। এতে অনেক ক্ষতি হয়। অনেকেই সারা দিন রোজা রাখার পর ইফতারের সময় কম সময়ে অনেক বেশি খাবার খেয়ে ফেলেন। এটা করা যাবে না। রাতের খাবার ও সাহরিতে ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস ও সবজি, ডাল ও ফলমূল খাওয়া উচিত।

সাহরি

সারা দিন রোজা রাখতে হবে ভেবে সাহরিতে বেশি খাওয়া যাবে না। পরিমিত পরিমাণ খাবার খেতে হবে। এমন সব খাবার খাওয়া উচিত যেগুলো দীর্ঘ সময় পেটে থাকে। যে খাবারে ফাইবার বেশি এমন খাবার লাল চালের ভাত, বাদাম, চিয়া সিডের শরবত, কলা, আপেল, কমলাসহ বিভিন্ন রকম ফল, ভাত দিয়ে ঘন ডাল, সিদ্ধ ডিম খাওয়া ভালো। এতে দিনে অনেক বেশি সময় ধরে আমরা অল্প অল্প শক্তি পাব। সাদা চালের ভাত খেলে তা খুব অল্প সময়ে হজম হয়ে যায়। অনেক সময় ধরে শরীরে শক্তি দিতে পারে না। সাহরিতে ভাতের বদলে দই, চিড়া, কলা খাওয়া যেতে পারে। এমন খাবার সারা দিন শরীর ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করবে।

পানিশূন্যতা পূরণে

এবার রোজা হচ্ছে গরমের মধ্যে। তার ওপর দিনের দৈর্ঘ্যও বেশ লম্বা। ফলে দীর্ঘ সময় পানিশূন্যতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ জন্য ইফতার ও সাহরির মধ্যে কমপক্ষে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন। তারাবি নামাজের সময় সঙ্গে পানির বোতল রাখতে পারেন। নামাজের আগে, পরে ও মধ্যে পানি পান করলে ভালো লাগবে। পানি জাতীয় খাবার তরমুজ ও শসাও খেতে পারেন। চা, কফি দিয়ে পানিশূন্যতা পূরণ করতে যাবেন না। এতে হিতে বিপরীত হয়।

রোজায় ব্যায়াম

শরীর সুস্থ রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই। বিশেষ করে করোনার এই সময়ে ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যায়াম বেশি করা উচিত। যাঁদের শ্বাসকষ্ট আছে তাঁরাও নিয়ম মেনে কম পরিশ্রমের ব্যায়াম করতে পারেন। উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা [করোনা ফোকাল পারসন ও প্রধান টিকা কর্মকর্তা] ডা. আলামিন হোসেন জানালেন, করোনা রুখতে এবং সুস্থ থাকতে আমাদের প্রত্যেকের ব্যায়াম করা উচিত।

ব্যায়াম করার ধরাবাধা কোনো সময় নেই। যে কেউ সুবিধামতো সময়ে ব্যায়াম করতে পারেন। তবে দুপুর ও কড়া রোদের সময় ব্যায়াম পরিহার করা ভালো। আরামদায়ক আবহাওয়ায় শরীরচর্চা করা স্বাস্থ্যকর। এ জন্য আমরা ভোরে, বিকেলে অথবা সন্ধ্যায় মানুষকে ব্যায়াম করতে উত্সাহিত করি। রোজার সময় তারাবি নামাজেই শরীরচর্চার কাজ অনেকটা হয়ে যায়। বয়স্কদের বেলায় নিয়মিত তারাবি পড়াই শরীরচর্চার সমান। যাঁরা তরুণ তাঁরা ইফতারের আগে কিংবা পরে বিশ্রাম নিয়ে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা ব্যায়াম করতে পারেন। ব্যায়াম করার সময় সঙ্গে পানি রাখুন।

ব্যায়ামের ফাঁকে ফাঁকে পানি পান করুন। মনে রাখবেন সপ্তাহে কমপক্ষে যেন আড়াই ঘণ্টা হয়। সুস্থ থাকলে দৌড়াতেও পারেন। সকালে যোগব্যায়াম অথবা ইয়োগা করতে পারেন। যাঁরা বিভিন্ন ক্রনিক সমস্যায় ভুগছেন তাঁরা বিকেলে ছাদে অথবা বাড়ির উঠোনে ১৫ থেকে ২০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করুন। এতেই রোজায় শরীরচর্চার কাজ হয়ে যাবে।

ইফতার পার্টিতে করণীয়

রোজায় ইফতার পার্টির ক্ষেত্রে করোনাকালে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ইফতার পার্টি করতে গিয়ে কেউ যাতে করোনায় আক্রান্ত না হন সেদিকে নজর রাখা উচিত বলে জানালেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা। এবারকার করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবিশিষ্ট। এ জন্য লোকসমাগম এড়িয়ে চলার কোনো বিকল্প নেই। রোজায় যাঁরা ইফতার পার্টি, ইফতার বিতরণ করবেন বা করতে চান তাঁদের পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে তা করা উচিত।

বাসায় করোনা রোগী থাকলে

বাসায় করোনা রোগী থাকলে তাঁর রুমে গেলে দুজনই মাস্ক পরুন। চেষ্টা করুন করোনা রোগীর সঙ্গে কম সময় কাটাতে। রোগীর সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমানো যাবে না। কমপক্ষে ছয় ফুট দূরে ঘুমাতে হবে। রোগীর বিছানার চারপাশে পর্দা বা আবরণ দিয়ে ঘিরে দিন। রোগীর ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে দিন। বাসায় বাথরুম একটা হলে সবার শেষে করোনা রোগী বাথরুম ব্যবহার করা ভালো। ব্যবহার শেষে বাথরুম জীবাণুমুক্ত করে নিন। করোনা রোগীকে সঙ্গে নিয়ে ইফতারসহ কোনো খাবার খাওয়া যাবে না। তাঁকে দূর থেকে আলাদা খাবার দিন।

রোজা রেখেও নেওয়া যাবে টিকা

করোনা প্রতিরোধে রোজার মাসেও চলছে ভ্যাকসিন কার্যক্রম। রোজা রেখে ভ্যাকসিন নিতে কোনো বাধা নেই। করোনা ভাইরাসের টিকা মাংসপেশীতে নেয়া হয়। এটা সরাসরি খাদ্যনালী ও পাকস্থলীতে প্রবেশ করে না। সেহেতু এতে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। আপনি যদি প্রথম ডোজ টিকা নিয়ে থাকেন তাহলে দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে নিন। প্রথম ডোজ না নিলে নিবন্ধন করে রাখুন।

সোনালী/জেআর

শর্টলিংকঃ