ভুয়া কেম্পানির ফাঁদে সাড়ে চার হাজার নারী-পুরুষ

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী নগরীতে ভুয়া কোম্পানি খুলে অন্তত সাড়ে চার হাজার নারী-পুরুষের কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আট প্রতারক। তাদের কোম্পানির নাম ‘সিভিল ওয়াচ ইন্টারন্যানশাল লিমিটেড’। এর চেয়ারম্যান রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি এলাকার বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা জেমস।
তার প্রতিষ্ঠানের অন্য সাত পরিচালক হলেন, মোহনপুর টেমা গ্রামের রাকাত আলী সরকার পলাশ, বাগমারার মাহবুব আলম, নগরীর জাহাজঘাট এলাকার সাইদুর রহমান, কাজীহাটা এলাকার হেলাল আলী, তানোরের ঈশা মৃধা, গোদাগাড়ীর কাঁকনহাটের শওকত আহসান স্বপন ও বগুড়ার ফজলুর রহমান। পুলিশ বলছে, এরা সবাই প্রতারক। প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন টাকা।
রাজশাহী নগরীর নিউমার্কেট সংলগ্ন চাঁন অ্যান্ড শপিং কমপ্লেক্স ভবনের তৃতীয় তলায় সিভিল ওয়াচের কার্যালয়। প্রতারণার শিকার প্রায় এক হাজার নারী-পুরুষ গতকাল রোববার দুপুরের পর থেকে ভবনটির সামনে উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে আসে পুলিশ। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত প্রতারিতরা ভবনের সামনেই থাকেন। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ১ থেকে ৫ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সবার টাকা ফেরত দেবেন।
সিভিল ওয়াচের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা জেমস ‘দৈনিক নববাণী’ নামের একটি পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। এছাড়া বাংলাদেশ কনজুমার রাইটস সোসাইটি এবং একটি মানবাধিকার সংস্থার নাম ভাঙিয়ে তিনি এসব অপকর্ম করে বেড়ান। গতকাল পুলিশের সামনেই প্রতারিত এক ব্যক্তি গোলাম মোস্তফা জেমসকে লাঠি দিয়ে পেটান। তখন নারীরা বলছিলেন, টাকা ফেরত দিতে না পারলে তারা প্রত্যেকে জেমসকে একবার করে জুতাপেটা করতে চান। তাহলে টাকা লাগবে না।
প্রতারিতরা জানিয়েছেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে সিভিল ওয়াচের নামে কার্যক্রম শুরু করেন ওই আট প্রতারক। তারা নগরী ও বিভিন্ন উপজেলার স্বল্পশিক্ষিত সহজ-সরল নারীদের টার্গেট করেন। প্রলোভন দেখিয়ে তাদের সিভিল ওয়াচের সদস্য তৈরি করেন। আর বিভিন্ন কৌশলে হাতিয়ে নেন টাকা। প্রথমে কথা ছিলো, কেউ সিভিল ওয়াচের সঙ্গে কাজ করতে না চাইলে টাকা ফেরত দেয়া হবে। কিন্তু গতকাল জুবায়ের রহমান নিপল নামে এক যুবকের টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করেই বিষয়টি জানাজানি হয়। প্রতারকরা নিপল এবং তার স্ত্রীকে মারধর করেন।
নিপল জানান, তার বাড়ি নগরীর কাদিরগঞ্জ এলাকায়। এই কোম্পানিটি এমএলএম ধরনের। তিনি ২ হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে কোম্পানির সদস্য হন। এরপর আরও ৫০০ টাকা দিয়ে পণ্যের অর্ডার করেন। কিন্তু কয়েকদিন পরই শোনেন কোম্পানির ট্রেইনার শাকিল আহমেদ ২৭ লাখ টাকা নিয়ে লাপাত্তা। তখনই তিনি বোঝেন এটা সম্পূর্ণ ভুয়া একটি প্রতিষ্ঠান। তাই তিনি টাকা ফেরত চান। টাকা ফেরত দেয়া হবে বলে তাকে গতকাল ডাকা হয়। তিনি এবং তার স্ত্রী গেলে কোম্পানির লোকজন তাকে মারধর করেন। আর এ প্রতারণার বিষয়টি ইতোমধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন অন্যরাও। তারাও টাকা ফেরতের চেষ্টায় ছিলেন। তার গায়ে হাত দেয়ার পর সবাই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
নগরীর রামচন্দ্রপুর এলাকার গৃহিণী সেলিনা বেগম জানান, ১ হাজার ৩৫০ টাকা দিয়ে প্রথমে তিনি কোম্পানির সদস্য হন। তারপর নিয়োগপত্র পেতে দেন ১ হাজার টাকা। তাদের বলা হয়, কোম্পানিতে সদস্য হওয়ার তিন মাস পর থেকে কমপক্ষে ৬ হাজার ৪০০ টাকা করে বেতন দেয়া হবে। আর কাউকে সদস্য বানালে দেয়া হবে লভ্যাংশ। টাকা জমা রাখলে দেয়া হবে ২০ শতাংশ লভ্যাংশ। এসব লোভে পড়ে তিনি এখানে আসেন। এসে দেখেন, সবকিছুই প্রতারণা। পুঠিয়ার নার্গিস খাতুন নামে এক নারী জানান, সিভিল ওয়াচ শ্যাম্পু, সাবান, তেল, টুথপেস্টসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির কথাও জানায়। এসব পারিবারিক প্রয়োজনে কিনলেও ছাড় দেয়ার কথা বলা হয়। তিনি কোম্পানিতে মোট ৬ হাজার ২৫০ টাকা দিয়েছেন। কিন্তু তার এক পয়সাও লাভ হয়নি। তার মতো অন্তত পাঁচ হাজার নারী-পুরুষ টাকা দিয়েছেন। সিংহভাগই নারী। কেউ কেউ ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। কিন্তু বেতন তো দূরের কথা; জমা দেয়া টাকাই তারা ফেরত পাচ্ছেন না। তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
গতকাল সন্ধ্যায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চাঁন অ্যান্ড শপিং কমপ্লেক্সের সামনে প্রায় হাজার খানেক নারী বিক্ষোভ করছেন। ভবনটিতে ঢোকার প্রধান ফটক লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে। তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, নববাণী পত্রিকার কার্যালয়ে এর প্রধান সম্পাদক গোলাম মোস্তফা জেমসের কাছে কাগজপত্র দেখছে পুলিশের আরেকটি দল। সেখানে নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুল মমিনও ছিলেন। তিনি টাকা ফেরত দেয়ার জন্য জেমসকে চাপ দিচ্ছিলেন। এখানেও ছিলেন প্রায় দুই শতাধিক নারী।
কিছুক্ষণ পর জেমস তার নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এই ২০০ নারীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এই বলে যে তাকে কয়েকদিন সময় দিলে সবার টাকা ফেরত দিবেন। কিন্তু তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে কেউই টাকা ফেরত পাবেন না। জেমস বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হলেও তার কাছে টাকা নেই। তিনি টাকা নেননি। তার এ কথার প্রতিবাদ করেন নারীরা। তারা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জেমস সরে গিয়ে নিজের চেয়ারে বসেন। সেখানেই পুলিশের সামনে এক ব্যক্তি লাঠি দিয়ে জেমসকে পেটাতে শুরু করেন। পরে পুলিশ তাকে রক্ষা করে।
এরপর জেমসকে আবারও টাকা ফেরত দেয়ার চাপ দিতে থাকেন কাউন্সিলর আবদুল মমিন এবং পুলিশ কর্মকর্তারা। কিন্তু জেমস টাকা না দিয়ে বার বার কয়েকদিন সময় চান। এ সময় তার অফিসের কাগজপত্র জব্দ করে তাকে আটক করে নিয়ে যাবার প্রস্তুতি শুরু করে পুলিশ। তখন তার মামাশ^শুর জাহাঙ্গীর আলম এবং ব্যবসায়ীক অংশীদার বেলাল হোসেনকে ডাকেন জেমস। তারা জেমসকে নিজেদের জিম্মায় নেন। আগামি ১ থেকে ৫ এপ্রিলের মধ্যে টাকা ফেরত দেয়া হবে বলে তারা প্রতিশ্রæতি দেন। এছাড়া জেমস চেক বইয়ের একটি পাতাও দেন।
ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল মমিন বলেন, এটা পুরোটাই একটা ভুয়া প্রতিষ্ঠান। দুই-ছয় মাস চালিয়ে নিরীহ মানুষের টাকা-পয়সা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়াটাই ছিল এদের উদ্দেশ্য। পুলিশ জেমসকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর মামলা করে কারাগারে পাঠালেও দুইদিন পর তিনি জামিন নিয়ে চলে আসবেন। কিন্তু অসহায় মানুষগুলো তখন টাকা ফেরত পাবেন না। সে জন্য পুলিশের হাতে না দিয়ে টাকা আদায়ের একটা প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। টাকা না দিয়ে জেমসের পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
নগরীর বোয়ালিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাহবুব আলম বলেন, কতজনের কাছ থেকে কত টাকা নেয়া হয়েছে তার কোনো নথিপত্র সংরক্ষণ করেনি সিভিল ওয়াচ। তবে প্রতারিতদের তথ্যমতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার নারী-পুরুষের কাছ থেকে অন্তত অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। যাদের টাকা নেয়া হয়েছে তাদের সবার তালিকা করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা বুঝিয়ে না দিলে প্রতারক জেমসসহ অন্য সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেমস দাবি করেন, সাড়ে চার হাজার নয় মাত্র ২৬৯ জনের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। এই টাকায় কোম্পানির জন্য বিভিন্ন পণ্য কেনা হয়েছে। তবে তাদের গ্রাহক আছে আরও হাজারখানেক। এদের কাছ থেকেও কিছু টাকা নেয়া হয়েছে। তবে কত টাকা নেয়া হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেননি তিনি।
জেমস জানিয়েছেন, তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হলেও সব কাজ দেখাশোনা করতেন পরিচালক রাকাত আলী সরকার পলাশ, মাহবুব আলম, সাইদুর রহমান, হেলাল আলী, ঈশা মৃধা, শওকত আহসান স্বপন এবং ফজলুর রহমান। গতকাল দুপুর থেকে তারা অফিসে আসেননি।

শর্টলিংকঃ