ভদ্র গলিতে ‘অভদ্র’ কাজ

  • 5
    Shares

অনলাইন ডেস্ক: করোনা মহামারির মধ্যেই রাজধানীর বড় মগবাজারের ভদ্র গলিতে চাঁদাবাজি করছে একটি চক্র। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার দোহাই দিয়ে গলির বাড়ি, ফ্ল্যাট মালিক ও সব পর্যায়ের ভাড়াটিয়ার ওপর প্রতি মাসে ১২০ টাকা হারে চাঁদা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি, ফ্ল্যাট মালিক ও ভাড়াটিয়ারা চাঁদাবাজ চক্রের হাতে জিম্মি। ভয়ে তাদের কেউ মুখ খুলছেন না।

গতকাল সোমবার সরেজমিন ভদ্র গলিতে গিয়ে জানা যায়, চাঁদাবাজির জন্য ওই চক্রটি ‘মগবাজার সোসাইটি (ভদ্র গলি)’ নামে একটি সংগঠন করেছে। সংগঠনটির ব্যানারেই চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। ২৫ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটিও করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বে আছেন ভদ্র গলির কাছাকাছি একটি বাড়ির মালিক মো. আলিম উল্যাহ খোকন।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ভদ্র গলির একজন বাড়ির মালিক বলেন, চাঁদাবাজদের মধ্যে বাইরের লোকজনও রয়েছেন। করোনার কারণে সবাই আর্থিক সংকট রয়েছে। এর মধ্যে বাড়ির মালিকরা কষ্ট করে চাঁদা দিতে পারলেও ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা! করোনা, লকডাউনের কারণে ভাড়াটিয়াদের অনেকের চাকরি নেই, বেতন নেই। যারা ব্যবসা করেন তাদেরও আয় কমেছে। জীবন-যাপনে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। এর মধ্যে চাঁদাবাজির নতুন কৌশলের শিকার হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, অনেক ভাড়াটিয়া স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন- জুলুম করে চাঁদা আদায় করা হলে তারা গলি ছেড়ে চলে যাবেন। এই ক্রান্তিকালে ভাড়াটিয়া চলে গেলে বাসা ফাঁকা থাকবে। এতে বাড়ির মালিকদের সংকট আরও বাড়বে।

ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছেন কেন- এর জবাবে কমিটির আহ্বায়ক আলিম উল্যাহ খোকন  উল্টো প্রশ্ন করে বলেন, এই টাকা কে দেবে, সুবিধাটা কে ভোগ করছে? সুবিধা যে ভোগ করতেছে সেই তো দেবে। আমি যে বাড়িতে থাকি, বাড়িওয়ালা আমাকে সার্ভিস চার্জ দেয় নাকি আমি বাড়িওয়ালাকে সার্ভিস চার্জ দেই। যে ভাড়া থাকে সে সার্ভিস চার্জ দেবে। আমরা বাড়িওয়ালাদের চিঠি দিয়েছি, তারা ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে কমিটির কাছে জমা দেবে। ভাড়াটিয়াদের চিঠি দেওয়া হবে না। ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা বাড়িওয়ালাদের দায়িত্ব।

ভদ্র গলির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের মার্চে ওই চক্রটি সিসি ক্যামেরা স্থাপন, গেটে রঙ করা ও নৈশপ্রহরীর খরচ বাবদ প্রতিটি বাড়ি মালিকের কাছ থেকে তিন হাজার বা তারও বেশি হারে চাঁদা আদায় করেছে। ৯ এপ্রিল হঠাৎ করে ভাড়াটিয়াদের ওপর চাঁদা আরোপ করে বাড়ি ও ডেভেলপারদের দ্বারা নির্মিত ফ্ল্যাট মালিকদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিকরা চাঁদার বিষয়টি ভাড়াটিয়াদের জানালে তাদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেকে এই চাঁদা দেবেন না বলেও জানিয়ে দেন।

জানা যায়, বড় মগবাজার নয়াটোলা রোডের কুইক লন্ড্রির পাশ থেকে ভদ্র গলি শুরু। গলিতে ২১-২২টি ভবন রয়েছে। সেখানে চার, পাঁচ, ছয় ও সর্বোচ্চ আটতলা পর্যন্ত ভবনও রয়েছে। ফ্ল্যাটের সংখ্যা প্রায় তিনশ। কিন্তু হঠাৎ করেই ওই গলিতে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। ভয়ে বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিকরা বিষয়টি পুলিশকে জানাতেও ভয় পাচ্ছেন।

‘মগবাজার সোসাইটি (ভদ্র গলি)’র আহ্বায়ক মো. আলিম উল্লাহ খোকনের বাড়ি এই গলির বাইরে বলে সেখানকার বাড়ি মালিকরা দাবি করেছেন। সরেজমিন দেখা যায়, গলির একটি জায়গার গেটে ‘পারিবারিক রাস্তা’ নামের সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। এই গেট সংলগ্ন হলুদ রঙের একটি ভবনের পর আহ্বায়ক খোকনের বাড়ি। ভদ্র গলির বাইরে তার বাড়ির রাস্তা রয়েছে। তার বাড়িটি গলির সঙ্গে মেশানো হয়েছে। তাই বাড়ি মালিকরা তাকে এই গলির বাইরের লোক বলে দাবি করছেন। আপনার বাড়ি ভদ্র গলির বাইরে বলে বাড়ির মালিকদের কেউ কেউ বলেছেন- এর জবাবে মো. আলিম উল্লাহ খোকন অশালীন বাক্য ব্যবহার শুরু করেন।

জানা যায়, চক্রটি মূলত চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যেই আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছে। কমিটির অধিকাংশ সদস্য আহ্বায়কের পরিবারের সদস্য।

৯ এপ্রিল বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিকদের কাছে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, ‘বিগত দুই মাস কমিটি কর্তৃক সিসি ক্যামেরা, লাইট প্রতিস্থাপন, গেট মেরামত ও রঙ করা হয়েছে। ১ এপ্রিল থেকে একজন নৈশপ্রহরী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সব খরচ বিচার-বিশ্নেষণ করে পুনর্নির্ধারিত ফ্ল্যাটপ্রতি (এর সঙ্গে ভাড়াটিয়ারা যুক্ত) ১২০ টাকা মাসিক ফি ১-৬ মের মধ্যে কমিটির কোষাধ্যক্ষের কাছে জমা দিয়ে রশিদ বুঝে নেওয়ার অনুরোধ করছি।’ সমকাল

সোনাল/জেআর

শর্টলিংকঃ