ব্রিকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ!

।।মনোয়ারুল হক।।

দীর্ঘদিন পর পূর্ব নির্ধারিত ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যাশিত শীর্ষ সম্মেলন কোভিড পরিস্থিতির কারণে ভার্চুয়াল মিটিংয়ে রূপান্তরিত হয়। ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সাতটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যার মধ্যে হাতি সংরক্ষণ, জ্বালানি সহযোগিতা ইত্যাদি রয়েছে।

ভারত-বাংলাদেশ শীর্ষ সম্মেলনের প্রতিবারই একাধিক পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি থাকে। ভারতের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত দেওয়া সমঝোতা চুক্তির কোনো অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করার সময় হয়েছে।

এই শীর্ষ সম্মেলনের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশকে ব্রিকস ব্যাংকে যোগদানের আহ্বান।

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে ব্রিক সূচিত হয়েছিল ২০০৯ সনের ১৬ জুন। প্রথম ব্রিক (BRIC) সামিট অনুষ্ঠিত হয় রাশিয়ায়। প্রথম ও দ্বিতীয় সামিট অনুষ্ঠিত হয় কেবলমাত্র চারটি দেশকে নিয়ে; তৃতীয় সামিট অনুষ্ঠিত হয় চীনে, যেখানে পঞ্চম দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার যোগদান করার ভেতর থেকে ব্রিকস রূপ ধারণ করে ।

২০১১ সালের সামিটে প্রথম ব্রিকস ব্যাংক অথবা নতুন উন্নয়ন ব্যাংকের আলোচনা সূচিত হয়েছিল। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ-এর অনুরূপ নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গঠন করার আলোচনা শুরু হয়েছিল। ২০১২ সনের চতুর্থ ব্রিকস সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভারতে; তখন মনমোহন সিং ছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। ভারতের পক্ষ থেকে এই ব্যাংক গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় ২০১২ সালে; সেই প্রস্তাব কার্যকর হয় ২০১৪-তে। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত সেই সামিটে নতুন ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং পরের বছর জুলাই মাসে যাত্রা শুরু করে। চীনে তার হেড অফিস; রিজনাল অফিস দক্ষিণ আফ্রিকাতে।

ব্যাংকটি তার প্রথম ক্যাপিটাল ঘোষণা করে ১০০ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, ১০ বিলিয়ন ডলার পেইড-অফ এবং বাকি ৪০ বিলিয়ন ডলারের কল বিধান রেখে ব্যাংক তার যাত্রা শুরু করে । আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের অনুকরণে একটি ডেভলপিং ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু এর। মজার পার্থক্য হচ্ছে, ব্যাংকের সকল সদস্যের সমান ভোটধিকার। বিশ্বব্যাংকের তা নয়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ শীর্ষ ক্ষমতাধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে, যার ফলে বিশ্বব্যাংক একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে সেই ১৯৪৪ সালে।

এরপর দীর্ঘ সময়কাল পর্যন্ত ব্যাংকটি তেমন কোনো প্রভাব সৃষ্টি করেনি ।১৯৬৮ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাংক ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে অনুন্নত বিশ্বের ঋণ প্রবাহের ক্ষেত্রে। ২০১৫ সালের শুরু হওয়া ব্রিকস ব্যাংক পৃথিবীর জিডিপির ১৬ ট্রিলিয়ন অংশ, যাদের জনসংখ্যা ৩০০ কোটি, পৃথিবীর মোট জিডিপির ২০ শতাংশ। এই দেশগুলোর ব্রিকস ব্যাংক আর বিশ্বব্যাংকের মধ্যে প্রধান বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য হচ্ছে ব্রিকস ব্যাংকের সদস্যদের সমান ক্ষমতা, যা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কিংবা আইএমএফ-এ নাই। সেই বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক একটি শীর্ষ অর্থনৈতিক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ব্যাংক। ব্রিকস ব্যাংক কিন্তু তা নয়।

১৭ ডিসেম্বরের শীর্ষ সম্মেলন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ব্রিকস ব্যাংকে যোগদান করার আহ্বান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানজনক; কিন্তু প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ আট বছর পর এই ব্রিকস ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়া। ৮ বছরের পরে ভারত কেন উপলব্ধি করছে, বাংলাদেশের এই ব্যাংকে যোগদান করা দরকার- এ প্রশ্ন আমাদের মাঝে সৃষ্টি হবে, ঘুরপাক খাবে, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত বহু সমঝোতা চুক্তি, এমনকি সরাসরি চুক্তি পূর্ণ কার্যকর করেনি। বাংলাদেশের এমন কোনো ঘটনা নাই। এমন কোনো চুক্তি নাই- যা বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করে নাই।

ঋণচুক্তি, পানি চুক্তি- কোনো কিছুই বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান কল্পে ভারত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত সরাসরি বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে; ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান অস্পষ্ট। কারণ পশ্চিমবাংলা জুড়ে বিজেপি কর্তৃক বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চলছে। পশ্চিমবাংলার নির্বাচনের আগের সেই প্রচারণা কোন মাত্রা লাভ করে- তা বোঝা যাবে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও যদি বিজেপি জয় লাভ করে তাহলেই। কেবলমাত্র পশ্চিমবাংলায় জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মুসলিম। এদের অর্ধেকই বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে দাবি করে বিজেপি বারবার মাঠ ময়দান কাঁপাচ্ছে। এমনকি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একই বাক্য প্রয়োগ করেছেন।

বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছুদিন আগে হঠাৎ করে পেঁয়াজ বন্ধ কিংবা এ রকম আরও বহু ঘটনা ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আস্থা বিনষ্ট হচ্ছে। সরকারকে কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে অথচ আমাদের সরকার প্রতিবেশীসুলভ সহযোগিতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রেখেছে। ব্রিকস ব্যাংকে বাংলাদেশের যোগদানে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক হলেও ব্রিকস ব্যাংকের অন্যতম প্রধান সদস্য চীন ও রাশিয়া এ বিষয়ে এখনো কোনো আহ্বান করেনি, তাই বিষয়টা অস্পষ্ট।

তাছাড়া আরও প্রশ্ন থেকে যায়, ব্রিকস ব্যাংকের বিনিয়োগ সুদের হার চৈনিক বিনিয়োগের মতন উচ্চ সুদ হবে কি না? অবকাঠামো নির্মাণে শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন আছে বাংলাদেশের, কিন্তু ওই ব্যাংকে কীভাবে অংশগ্রহণ করবে, সেটি বাংলাদেশকে ভাবতে হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ