বৈষম্য দূর করে সমতা প্রতিষ্ঠার দাবি

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রাজশাহী বিভাগীয় জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শনিবার বিকালে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দানে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরের পর থেকেই জনসভায় বিভাগের আট জেলা থেকে নেতাকর্মীরা মাদ্রাসা ময়দানে সমবেত হতে থাকেন। বিকেলের মধ্যেই লাখো মানুষ উপস্থিত হন সেখানে। লাল পতাকায় ভরে ওঠে মাদরাসা ময়দান।
জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য মোস্তফা লুৎফুল্লাহ এমপি, মাহমুদুল ইসলাম মানিক ও কামরুল আহসান। তারা মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করে সমতা প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
জনসভায় রাশেদ খান মেনন বলেন, দেশে আজ উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু বৈষম্য হচ্ছে পাহাড়সমান। আমাদের মাথাপিঁছু আয় ১৯০৯ ডলার। কিন্তু যারা দরিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন তাদের দৈনিক মাথাপিছু আয় এক ডলারেরও কম। এই বৈষম্য কেবলমাত্র অংকের হিসাবে নয়। ’৭৪ সালে আমাদের ছিলো চার জন কোটিপতি। আর এখন আমাদের কোটিপতির সংখ্যা এক লক্ষ ২২ হাজার। কেবল কোটিপতি নয়, এরা কোটি কোটি কোটিপতি। তাদের জীবনযাপন, তাদের আয়েশ, তাদের বিলাস বাংলাদেশের যুবকদেরকে হতাশ করে।
তিনি বলেন, যত টাকা পাকিস্তানিরা নিয়ে গেছে, তার চেয়েও বেশি টাকা এই ক’বছরে পাচার হয়ে গেছে। পার্লামেন্টে যখন ঋণখেলাপিদের নাম প্রকাশ করা হয় তখন একইসঙ্গে অবশ্যই টাকা পাচারকারীদের নাম প্রকাশ করতে হবে। তখন আমরা দেখব, অনেক পরিচিত লোক রয়েছেন। অনেক পরিচিত নেতা রয়েছেন, যাদের কথা লুকানোর জন্যই নাম প্রকাশ করা হয় না।
মেনন বলেন, প্রতিদিন ব্যাংক লুট হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক যখন দেউলিয়া হয়ে যাবে, তখন এর দায় নাকি নিতে হবে জনগণকে। কেন জনগণ ব্যাংক ডাকাতদের দায় নেবে? এক টাকা নয় দু’টাকা নয়, ২০১৪ সালে এক বছরে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। আমি বলি, আজকে সেই টাকার পরিমাণ পাঁচ লক্ষ হাজার কোটি টাকার ওপরে। তা দিয়ে একটি বাজেট আমরা তৈরি করতে পারতাম। দুদক সে সম্পর্কে কথা বলে না। দুদকের চেয়ারম্যান সেসব নিয়ে কথা বলেন না।
চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিয়ে রাশেদ খান মেনন বলেন, যখন কেউ ধরা পড়ে তখন বলেন, দল কোনো দায় নেবে না। তাহলে কে দায় নেবে? বনে থাকলে দাপিয়ে বেড়াবেন। আর বনের মধ্যে যখন অন্যায় করে ধরা পড়ে যাবেন তখন বলবেন, দায় নেব না। এই দায় নিতে হবে। যে সমস্ত ভোগবাদী নীতি আমার দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সেই নীতি বাদ দিয়ে আমরা সেøাগান তুলেছি ২১ দফার ভিত্তিতে ন্যায্যতা-সমাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার প্রতি আস্থা রাখতে হবে।
রাশেদ খান মেনন আরও বলেন, সকল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। ২১ দফা দাবি আমরা দিয়েছি। আজ রাজশাহী বিভাগীয় জনসভা হলো। এর আগে আমরা বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাজবাড়ী, রংপুরে করেছি। আরও করবো। এগুলো প্রস্তুতি। আমাদের কথা যদি না শোনেন, দাবি যদি না মানেন রাজপথে লড়াইয়ের মাধ্যমেই আমরা দাবি আদায় করব। অবশ্যই আমরা বিজয় অর্জন করব।
তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানে সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা, মানবিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। আমরা সেই সংবিধানের পথে হাঁটতে চাই, চলতে চাই। দেশ উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ হবে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হবে। তখন যেন আবার সেøাগান দিয়ে বলতে না হয়, কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না।
জনসভায় ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে লেখা আছে সামাজিক বৈষম্য থাকবে না, ধনী-গরিবের পার্থক্য থাকবে না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে আছি। অসাম্প্রদায়িক-সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে আছি। আমরা বাহাত্তরের সংবিধানের সঙ্গেও আছি। যদি কেউ বাহাত্তরের সংবিধান বাস্তবায়ন করতে না পারেন, ওয়ার্কার্স পার্টি জীবন দিয়ে হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করবে। তিনি বলেন, সংবিধানের চার মূলনীতি আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেই আমরা ওয়ার্কার্স পার্টিকে বিকল্প শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
বাদশা বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় বলা হয় আমরা মাছ উৎপাদনে বিশে^ চতুর্থ স্থানে রয়েছি। যারা মাছ উৎপাদন করে তারা কারা? তারা এই অঞ্চলের মানুষ। এই অঞ্চলের জেলেরা। তারা আজ পদ্মানদীতে নামতে পারে না। প্রশাসন তাদের জাল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ঢাকার মানুষ ফরমালিনযুক্ত বিষাক্ত মাছ খেত। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ ট্রাকে পানিসহ মাছ ঢাকার বাজারে পৌঁছে দেয়। ঢাকার বাবুসাহেবরা ফরমালিনমুক্ত মাছ খান। কিন্তু ঢাকায় যেতে পথে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষকে ২৬ জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। কারা চাঁদা নেয়? যে চাষিরা মাছচাষ করে বিশে^র দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ¦ল করে, আজ তাদের ওপর চাঁদাবাজি হয়! রাষ্ট্র চুপ করে দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এটা বেশি দিন চলতে দেয়া যাবে না। আমরা চলতে দেব না। এটা প্রতিহত করার জন্য উত্তরাঞ্চলের মানুষ ঢাকায় মাছ পাঠানো বন্ধ করে দেবে। ঢাকার মানুষকে আবার ফরমালিনযুক্ত মাছ খেতে হবে।
উত্তরাঞ্চলকে দেশের খাদ্যভাÐার উল্লেখ করে রাজশাহী-২ (সদর) আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, আমি পার্লামেন্টে বলেছিলাম, যে কৃষক ঢাকার বাজারে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যায় বঙ্গবন্ধু সেতুতে তাদের কাছ থেকে টোল নেয়া যাবে না। যারা ঢাকার মানুষকে খাওয়ায় তারা টোল দেবে না। তাদের ট্রাক সরাসরি যাবে। কেউ তাদের স্পর্শ করতে পারবে না। এই নিশ্চয়তা আমাদের দিতে হবে। তিনি বলেন, এই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন সংকটজনক। পদ্মানদী নাব্যতা হারাচ্ছে। দখলদারদের কবলে পড়ছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এ কারণে রাজশাহী শহররক্ষা বাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। নদী দখল রাজশাহীর মানুষ মেনে নেবে না।
জনসভায় ফজলে হোসেন বাদশা জেলাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের দাবি জানান। বলেন, এলাকায় এলাকায় যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করতে প্রতিটি জেলার আলাদা বাজেট হওয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র বড় বড় বিল্ডিং উঠে যাওয়া আর প্রশস্ত রাস্তা বাংলাদেশের উন্নয়ন নয়। প্রত্যেকটি মানুষের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকারই হচ্ছে উন্নয়ন। সে ব্যাপারে আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সংবিধানেই সামাজিক বৈষম্য রোধ করার কথা লেখা আছে। তাহলে কেন জেলা বাজেট করা হবে না?
বাদশা বলেন, রাজশাহীর গাঙপাড়া নামের একটি জায়গায় গরিব মানুষরা বসবাস করে। প্রশাসনের নির্দেশে তাদের উচ্ছেদ করা হলো। তারা হাতজোড় করে সরকারি কর্মকর্তার সাসমনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, এই শীতে আমাদের উচ্ছেদ করবেন না। কিন্তু তাদেরকে উচ্ছেদ করা হলো। এই উচ্ছেদের কারণে শীতে ছয়জন নারী-পুরুষ মৃত্যুবরণ করলো। আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাউকে পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদ করা যাবে না। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, আপনার নির্দেশ বাস্তবায়ন যদি হবেই তাহলে ছয়জন মানুষ প্রবল শীতে মৃত্যুবরণ করেছে, এদের হত্যার বিচার চাই। আমি বলব এটা রাষ্ট্রীয় হত্যাকাÐ। আমরা এক দিকে দেখি শীতে গরিব মানুষ মৃত্যুবরণ করে আর রাজনীতি করে বাড়িতে টাকার গুদাম তৈরি হয়।
তিনি বলেন, বাড়িতে এখন শত কোটি টাকার গুদাম পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে টাকার গুদাম, অন্যদিকে গরিব মানুষের ওপর নির্যাতন। রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে এমন উইপোকা ঢুকে পড়েছে যে এখন এই দেশে রাজনীতি করে বাড়িতে টাকার গুদাম তৈরি করা যায়। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বলা হয়েছিল। শুধু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দেখতে চাই না। নির্দেশ বাস্তবায়ন দেখতে চাই। রাজনৈতিক পরিচয়ে যারা বাড়িতে টাকার গুদাম তৈরি করতে পারে তাদের ব্যাপারে দায় কার? শুধু ব্যক্তির অপরাধ নয়।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাবেক ভিপি ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, আমাদের এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। হাজার হাজার বেকার কর্মসংস্থানের আবেদন করেন। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে নাকি কর্মসংস্থান হবে। যতটুকু শুনেছি, ২৩ হাজার দরিদ্র পরিবারের সন্তান চাকরির জন্য এখানে আবেদন করেছে। শুনেছি ২৩ জন লোকের নাকি চাকরি হবে। ২৩ হাজার আবেদন করে যদি ২৩ জন লোকের চাকরি হয় তাহলে এই চাকরির কী প্রয়োজন আছে! আবেদনের জন্য এই বিজ্ঞপ্তি দেয়ার কী প্রয়োজন আছে আমি জানি না।
ফজলে হোসেন বাদশা এ সময় রাজশাহীতে শিল্প স্থাপনের দাবি জানান। একইসঙ্গে বন্ধ রাষ্ট্রায়াত্ত¡ কারখানাগুলোকেও চালু করার আহŸান জানান। তিনি বলেন, রাজশাহীর রেশমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ১০ বছর ধরে দাবি জানাচ্ছি। একটি বাড়ি একটি খামার হলে রেশম নিয়ে একটি বাড়ি একটি কারাখানা সম্ভব। এর মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এ সময় তিনি উত্তরাঞ্চলের মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানে বিশেষ সুবিধা প্রদানেরও দাবি জানান।
যমুনা সেতুতে পৃথক রেলসেতু স্থাপনের দাবি পূরণ করায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাদশা বলেন, উত্তরাঞ্চলের পণ্য পরিবহনে যমুনা সেতুতে পৃথক রেলসেতু স্থাপনের জন্য আমি পার্লামেন্টে দাবি জানিয়েছিলাম। আগামী ১৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রী এটির উদ্বোধন করবেন। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা দেখতে চাই আন্তঃজেলা রেল যোগাযোগ সৃষ্টি হবে। বন্দর, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যদি আমাদের যোগাযোগ না থাকে তাহলে কী করে গ্রামে শিল্প হবে! তিনি বলেন, বাদশা বলেন, বিএনপি-জামায়াতের আমলে রাজশাহী বিমানবন্দরে গরু চরতো। আমরা বিমানবন্দর চালু করেছি। এখন চার-চারটা বিমান চলে। বিমানের টিকিট পাওয়া যায় না। এই বিমানবন্দরকে এখন আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি লিয়াকত আলী লিকু। পরিচালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক দেবাশিষ প্রামানিক দেবু। এতে দলটির রাজশাহী জেলার সভাপতি রফিকুল ইসলাম পিয়ারুল ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আশরাফুল হক তোতাসহ বিভাগের অন্য জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা বক্তব্য দেন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি রোধ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, দেশে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও অর্থনৈতিক লুটপাট বন্ধ করা, নারী ও শিশু ধর্ষণ ও সহিংসতা প্রতিরোধ, মাদকাশক্তি নিরোধ এবং সন্ত্রাস, সা¤প্রদায়িকতা ও জঙ্গি প্রতিরোধসহ সামাজিক ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২১ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে দেশের সব বিভাগীয় শহরে জনসভা করছে ওয়ার্কার্স পার্টি। এর অংশ হিসেবেই রাজশাহীতে এ জনসভা হলো।

শর্টলিংকঃ