বেড়েছে পেঁয়াজের আবাদ

তৈয়বুর রহমান: ভাল দাম পাওয়ায় পেঁয়াজ আবাদের দিকে ঝুঁকেছেন রাজশাহীর কৃষক। কিছুদিন পেঁয়াজের দাম কম থাকলেও করোনাভাইরাস আতঙ্ক ও আসন্ন রমজানকে কেন্দ্র করে বেড়ে গেছে পেঁয়াজের দাম।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, রাজশাহীতে পেঁয়াজের চাহিদা ৫৪ হাজার ২০৯ মেট্রিক টন হলেও উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৪১২ মেট্রিক টন। চাহিদার থেকে ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ২০৩ মেট্রিকটন বেশি পিঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। গত ১০ বছরের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ পিঁয়াজ আবাদ হওয়ায় এবং বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি হলে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হবার আশঙ্কায় পড়ছেন চাষিরা।
কৃষকদের তথ্যমতে, প্রতি বিঘায় পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ৩ থেকে ৫ মেট্রিক টন। উৎপাদন খরচ পড়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এ অঞ্চলে ঢ্যামনা ও আলপেঁয়াজ নামের পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। ঢ্যামনা পেঁয়াজ উৎপাদন শেষের পথে হলেও এখনও জমিতে রয়েছে আলপেঁয়াজ।
ব্যবসায়ীদের মতে রাজশাহীতে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও তা দেশের চাহিদা পূরণ করতে বিভিন্ন জেলাতে চলে যায়। সুযোগ বুঝে বড় বড় কালোবাজারিরা ও মধ্যস্বত্বভোগীরা উঠার পরপরই গুদামজাত করে রাখে। ফলে দেশে দেখা দেয় পেঁয়াজ সঙ্কট। তথ্যমতে, রাজশাহী ও মুন্সিগঞ্জ ছাড়া অন্যান্য এলাকায় পেঁয়াজের উৎপাদন কম হয়। অপর দিকে সংরক্ষণের অভাবে প্রচুর পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে য়ায়। এর ফলে বেড়ে যায় পেঁয়াজের মূল্য। এক দিকে মধ্যস্বত্বভোগীরে সিন্ডিকেট অপর দিকে দেশের সব এলাকায় উৎপাদন কম হওয়া এই দুই-এর খপ্পরে পড়ে বেড়ে যায় পেঁয়াজের ঝাঁঝ। ফলে সরকার ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে বাধ্য হন। আমদানিকৃত পেঁয়াজের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই সব সময় ভারতের পেঁয়াজের দখলে থাকে বাংলাদেশের বাজার। কোনভাবে পেঁয়াজ আমদানি না হলেই তা নিয়েই শুরু হয় তেলেসমাতি কারবার। এখন করোনাভাইরাসের কারণে চলছে আবার সেই পেঁয়াজ সঙ্কটের ষড়যন্ত্র। এ কয়েক দিনে পেঁয়াজের মূল্য আবার বেড়ে গেছে।
গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এতেই বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের ঝাঁঝ বেড়ে যায়। পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। এক সময় দেশি পেয়াজ কেজি প্রতি ২৫০ টাকায় উঠে। বিদেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা মূল্যে গিয়ে ঠেকে। বাজার পেয়াজ শূন্য হয়ে পড়ায় দেশি পেয়াজের মূল্য হয় স্মরণকালের সর্বোচ্চ। লাগামহীন পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধিতে গোটা দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। পেঁয়াজ নিয়ে শুরু হয় রাজনীতি। একে অনেকেই সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজি বলে চিহ্নিত করেন।
এবারের পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধিতে বৃহত্তর রাজশাহীর প্রত্যেকটি জেলায় বেড়ে যায় পেঁয়াজের আবাদ। পেঁয়াজের আবাদ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, যে হারে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, মধ্যস্বত্বভোগীদের কবলে পড়ার আশক্সকা রয়েছে।
মধ্যস্বত্বভোগীর হাত থেকে চাষিদের রক্ষা এবং পেঁয়াজের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সরকারিভাবে পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, রাজশাহী জেলায় ২০১৯ সালে মোট ১৪ হাজার ৯০২ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ২২ হাজার ৪১২ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। চলতি ২০২০ সালে মোট ১৬ হাজার ৭৪৩ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ২৫ হাজার ৮৬৩ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত বারের চেয়ে এবার ৩ হাজার ৪৫১ মেট্রিক টন বেশি উৎপাদন হবে।
রাজশাহী জেলায় ২০০৯-১০ বছরে আবাদ হয়েছিল ১৪ হাজার ১৪৫ হেক্টর, ২০১০-১১ বছরে ১৪ হাজার ৫৪১ হেক্টর, ২০১১-১২ বছরে ১৫ হাজার ২১৭ হেক্টর, ২০১২-১৩ হাজার ৬৬৬ হেক্টর, ২০১৩ -১৪,১৩ হাজার ৮১৭ হেক্টর, ২০১৪-১৫, ১৩ হাজার ৪৫০, হেক্টর, ২০১৫-১৬ ১৫ হাজার ৫১৬ হেক্টর, ২০১৬-১৭, ১৫ হাজার ৫৮৬ হেক্টর, ২০১৭-১৮, ১৪ হাজার ৭৩৬ হেক্টর, ২০১৮-১৯, ১৪ হাজার ৯০২ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়। এবার অর্থাৎ ২০১৯-২০-এ রাজশাহীতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ।
রাজশাহী জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামছুল হক বলেন, রাজশাহীসহ বিভাগের প্রত্যেকটি জেলায় গত বছরের চেয়ে এবার পেঁয়াজের চাষ বেশি হয়েছে। সে অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়বে। আর কৃষক পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন এই কৃষি কর্মকর্তা।

শর্টলিংকঃ