বিদেশ না যাওয়ার শর্তে মুক্তি পাচ্ছেন খালেদা জিয়া

সোনালী ডেস্ক: ঢাকায় নিজের বাসায় থেকে চিকিৎসা গ্রহণ এবং বিদেশে না যাওয়ার শর্তসাপেক্ষে বিএনপির কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ৬ মাসের জন্য মুক্তি দেয়ার সুপারিশ করেছে সরকার। এখন আইনি প্রক্রিয়াগুলো শেষ হলেই মুক্তি পাবেন খালেদা জিয়া। গতকাল মঙ্গরবার এ তথ্য জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে সরকার সদয় হয়ে দ-াদেশ স’গিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই এই সুপারিশ করা হয়েছে। আনিসুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়ায় দুই শর্তে দ-াদেশ স’গিত রেখে তাকে মুক্তি দেয়া হোক। সরকার মানবিক কারণে সদয় হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা (উপধারা-১) অনুযায়ী এটা আইনি প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত সুপারিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
২৫ মাস সাজা ভোগের পর এমন এক সময়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত হল, যখন নভেল করোনাভাইরাসের মহামারিতে পুরো বিশ্বজুড়ে চলেছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা; নানা বিধিনিষেধে বাংলাদেশও রয়েছে প্রায় অবর্বদ্ধ অবস’ায়। কারা তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়া ‘করোনাভাইরাসের ঝুঁকিতে রয়েছেন’ বলে শঙ্কা প্রকাশ করে আগের দিনও তার মুক্তির দাবি জানিয়েছিলেন বিএনপিপন’ী আইনজীবীরা।
গতকাল মঙ্গরবার এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী জানান, মুক্তি পেলেও খালেদা জিয়া ঢাকায় নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করবেন, দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেদিন থেকে তার আবেদন গ্রহণ করবে, সেদিন তিনি মুক্তি পাবেন। আনিসুল হক বলেন, তার সাজা ৬ মাসের জন্য স’গিত রেখে তাকে ঢাকাস’ নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করার শর্তে এবং ওই সময়ে তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না- এই শর্তে তাকে মুক্তি দেয়ার জন্য আমি মতামত দিয়েছি। সেই মতামত এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে গেছে। তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে কিনা এ বিষয়ে তিনি বলেন, আগে ৬ মাস যাক, তারপর দেখা যাবে। তিনি বলেন, এখানে কিন’ বলা হচ্ছে না তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন না। সেটা তার অবস’ার ওপর নির্ভর করবে। তবে শর্ত হচ্ছে তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না।
এদিকে গতকাল মঙ্গরবার বিকেলের মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির সুপারিশের ফাইলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়। তবে আইনি প্রক্রিয়াগুলো শেষ না হলেও আজ বুধবার দুপুরের মধ্যে সেই প্রক্রিয়া শেষ হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব শহীদুজ্জামান। তিনি বলেন, আশা করি আগামীকালের (বুধবার) মধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শেষ করা যাবে। খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো জানতে চাইলে শহীদুজ্জামান গতকাল মঙ্গরবার বিকেলে বলেন, এরই মধ্যে আমরা খালেদা জিয়ার মুক্তির ফাইল হাতে পেয়েছি। এখন আমরা এ বিষয়ে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে উপস’াপন করবো। মন্ত্রীর অনুমোদনের পর সে ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদনের পর তাকে মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস’া নিতে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এরপরই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যবস’া করার বিষয়টি কারারক্ষীদের মাধ্যমে গতকাল মঙ্গরবার বিকেলেই তাকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দিতে আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস’া নেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে গতকাল মঙ্গরবার বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সেই সুপারিশ এসে পৌঁছায়নি। মন্ত্রণালয়ে এসে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুমোদন নিয়ে খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করার নির্দেশ কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, উনি (আইনমন্ত্রী) যা বলেছেন ঠিক আছে। কিন’ আপনাদের আর একটু অপেক্ষা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সিগন্যাল নিয়ে প্রক্রিয়া করতে হবে। ওঁর ফাইল এখনও অ্যাপ্র্বভ হয়নি। আইনমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়েই বলেছেন। তবে আইনমন্ত্রীর ফাইল এখনও আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। না আসা পর্যন্ত তো ওয়েট করতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশিৱষ্ট সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার মুক্তির সুপারিশের ফাইল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এলে একটি সারাংশ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রী ওই ফাইলে অনুমোদন দিলে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশের অনুলিপি কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে পৌঁছানোর পরই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে।
এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমি আগেই বলেছিলাম সরকার চাইলে খালেদা জিয়াকে ফৌজদারি আইন অনুসারে মুক্তি দিতে পারে। বহুদিন পরে হলেও সরকার সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে মুক্তি দিচ্ছে। এখন তার মুক্তির বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুসারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হবে। কারা কর্তৃপক্ষ থেকে চিঠি যাবে বিএসএমএমইউতে। এরপরই তিনি মুক্তি পাবেন। সাজা স’গিত থাকা অবস’ায় খালেদা জিয়া পূর্ণ পুলিশি নিরাপত্তায় থাকবেন কিনা জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের এ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জানান, সাজা স’গিত থাকা অবস’ায় পুলিশি নিরাপত্তার কোনও বিধান আইনে নেই। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তার (খালেদা জিয়া) জন্য পুলিশি নিরাপত্তা রাখা হবে।
প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্র্বয়ারি থেকে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন খালেদা জিয়া। সেখানে তার সঙ্গে রয়েছেন গৃহকর্মী ফাতেমা। এরমধ্যে তাকে (খালেদা জিয়া) দুবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়েছিল। প্রথমবার কয়েক ঘণ্টা হাসপাতালে কাটানোর পর তাকে ফের কারাগারে ফেরত নেওয়া হয়। তবে দ্বিতীয় দফায় বেশ কিছু দিন বিএসএমএমইউ-তে ছিলেন তিনি।
উলেৱখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রথমে পাঁচ বছরের এবং পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে ১০ বছরের কারাদ- দেন আদালত। অন্যদিকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৭ বছরের কারাদ- হয়েছে তার। এই দুই মামলায় খালেদা জিয়ার বির্বদ্ধে মোট ১৭ বছরের কারাদ-ের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসনের ভাই শামীম ইস্কান্দর জানান, তার বোন মুক্তি পাওয়ার পর নিজের বর্তমান বাসভবন ফিরোজাতেই উঠবেন। শামীম ইস্কান্দর জানান, তিনি এখনও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তার বোনের মুক্তির বিষয়টি শোনেননি, গণমাধ্যমে জানতে পেছেন।
এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে দলের সিদ্ধান্ত কী হবে, তা এখনও বলতে পারেননি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখর্বল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, আমরা মাত্র বিষয়টি জেনেছি। এখনও এ বিষয়ে আলোচনা করিনি। তবে আমরা তো ম্যাডামকে বিদেশে নিতে চেয়েছিলাম। এই অবস’ায় কী করা যায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবো। বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়র্বল কবির খান জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে মির্জা ফখর্বল ইসলাম আলমগীর দলের কথা তুলে ধরবেন। একইসঙ্গে সরকারের এই সিদ্ধান্তে পরবর্তী করণীয় কী হবে, তা নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে কথা বলবেন। তবে, তা প্রচার হবে অনলাইনে। বিএনপির দলীয় অফিসিয়াল ফেসবুকে তা প্রচার হবে বলে জানান তিনি। গত ৮ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব শহিদুজ্জামান জানিয়েছিলেন, খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে মুক্তি চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাবর আবেদন করা হয়েছে। কয়েকদিন আগে তারা মন্ত্রীর কাছ থেকে সেই চিঠি পেয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস’া নেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান। পরে দলীয় সূত্রে জানা যায়, ওই চিঠি শামীম ইস্কান্দর দিয়েছিলেন।

শর্টলিংকঃ