বিজয়ের ধ্বনি এখনও কানে বাজে বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত আলীর

  • 538
    Shares

রিমন রহমান: যুদ্ধের ময়দানে চোখের সামনে সহযোদ্ধাকে শহীদ হতে দেখেছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন। তারপর দেখেছেন বিজয়। সেই বিজয়ের মুহূর্তটি এখনও অটুট বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত আলীর স্মৃতিতে। মনে পড়লে চোখ ভিজে যায় আনন্দে। এখনও তার কানে বাজে বিজয়ের দিনের ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত আলী। ছবি: সোনালী সংবাদ

মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত আলীর ভাষায়, যুদ্ধের মাঠ থেকে ফিরে তখন তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা হয় হয়। কেউ একজন এসে জানালো- দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। আত্মসমর্পণ করেছে পাকবাহিনী। সংবাদটা যাচাই করার আগেই চারদিক থেকে হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হলো ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান। মানুষের ঢল নামলো রাস্তায়।

বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করতে করতে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে ফেটে পড়লেন মুক্তিযোদ্ধারাও। সেই দিনটিই তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের। মুহূর্তটির বর্ণনা করতে গিয়ে যুদ্ধাহত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, তখনকার আনন্দ এবং ঠিক সেই মুহূর্তের অনুভূতি বর্ণনা করার মতো কোন শব্দ বা ভাষা আছে কি না আমার জানা নেই। বিষয়টি বর্ণনা করার ক্ষমতা অন্য কারও থাকলে থাকতে পারে। আমার অজানা। ওই স্মৃতি পুরোপুরি বর্ণনাতীত। তবে অনুভব করি এখনও।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত আলীর বাড়ি রাজশাহী মহানগরীর উপশহরে। সম্প্রতি একদুপুরে শোনাচ্ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের গল্প। তখনই বলছিলেন এসব কথা। একাত্তরে তিনি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ পড়াশোনা করছিলেন অর্থনীতিতে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ তাকে উদ্বুদ্ধ করে যুদ্ধে যেতে। হেমায়েত আলীর জন্ম চাঁপাইনবাবগঞ্জের নারায়ণপুরে।। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পায়ে হেঁটেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে যান চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এরপর যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

সেসব স্মৃতি তার এখনও স্পষ্ট। বলছিলেন, ১৯ এপ্রিল পাকবাহিনী চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখল করে গণহত্যা চালায়। সেদিনই যুদ্ধে যোগ দিতে চলে যান ভারতে। বিভিন্ন স্থানে ঘুরলেন কয়েকদিন। কিন্তু সেখানে গিয়ে কেউ তাকে প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার স্থান চিনিয়ে দেয়নি। বাধ্য হয়ে ফিরে আসেন। এরপর ১৭ জুন আবার ৬৯ জন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গী হলেন হেমায়েত। চলে গেলেন ভারত। পাকিস্তানের চর কিনা তা যাচাই-বাছাইয়ের পর সুযোগ দেয়া হলো প্রশিক্ষণের।

পানিঘাটায় শুরু হয় মূল প্রশিক্ষণ চার সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শেষে পাঠানো হলে সাত নম্বর সেক্টরে। হেমায়েত আলী হয়েছিলেন ছোট একটা গ্রুপের কমান্ডার। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ত্রিমোহনী দিয়ে নদী অতিক্রম করে যেন পাক সেনারা মুক্তিবাহিনীর মূল গ্রুপের কাছে পৌঁছাতে না পারে সেটা নিশ্চিত করাই ছিল তাদের দায়িত্ব। পরবর্তীতে সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের (বীর শ্রেষ্ঠ) অধীনে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। ৮ অক্টোবর কানসাট-সোনামসজিদ রোড ধরে হেঁটে যাচ্ছিল প্রায় শতাধিক পাক সেনা আর রাজাকাররা। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে এ দিন বেশিরভাগই নিহত হয়েছিল। বাকিরা পালিয়েছিল কোনরকমে।

১৪ অক্টোবর সোনামসজিদ চত্বরে ক্যাম্পে তারা দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। খবর এলো- টাকশালদীঘিতে অবস্থান করছে ২০-২৫ জন রাজাকার। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের নির্দেশে দুপুরের খাবার না খেয়েই মুক্তিযোদ্ধারা রওনা হলেন। রাজাকার ধরার লক্ষ্য নিয়ে কলাই ক্ষেত ধরে এগোচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু সংবাদটি ছিল ভুয়া। মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁদে ফেলতে নাটক সাজিয়েছিল পাকসেনারা। অতর্কিত হামলা করল হায়েনারা। পেছনে সরে যাওয়ারও উপায় নেই। হেমায়েতরা মেশিনগানের জবাব দিতে শুরু করলেন এসএলআর দিয়ে। কিন্তু কুলিয়ে ওঠা গেল না। মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেন। একদিকে গুলিবিদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের আর্তনাদ, অন্যদিকে হায়েনাদের উল্লাস। হেমায়েত খেয়াল করলেন পায়ে গুলি লেগেছে। বাম পাশেই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মাইনুদ্দিন। বাম কান দিয়ে বুলেট ঢুকে তার ডান কান দিয়ে বের হয়ে গেল। বুলেটে বুক ঝাঝরা হয়ে অদূরেই ছটফট করছেন মুজিবুল হক। তিনিও শহীদ হলেন। আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা সেদিন শাহাদাত বরণ করেছিলেন। অনেকে হয়েছিলেন গুরুতর আহত। ভারতের পিঁয়াজবাড়ি হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা হয়।

বাবা-মা জানতেন ছেলে শহীদ হয়েছে। সুস্থ হয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করেন হেমায়েত। তারপর আবার যুদ্ধে যোগ দেন। ১৪ ডিসেম্বর শহীদ হলেন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (বীর শ্রেষ্ঠ)। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে পড়ল। পরক্ষণেই প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠলেন। খুঁজতে থাকলেন পাকসেনাদের। খবর পেলেন তারা পালিয়েছে রাজশাহীর দিকে। মুক্তিযোদ্ধারাও পা ফেললেন সেদিকে। সামনে, ডানে, বাঁয়ে কোথাও পেলেন না শত্রুবাহিনী। তারা উঠলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হলে। ১৬ ডিসেম্বর সেখানেই পেলেন বিজয়ের খবর।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত আলী একজন উপ-পরিদর্শক হিসেবে ১৯৭২ সালে যোগ দেন পুলিশ বাহিনীতে। ’৭৬ সালে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হন। সর্বশেষ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন অবসরে। বই পড়েন, লেখালেখি করেন। কেউ গেলে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনান। স্মৃতির পাতায় ফিরে যান একাত্তরের সেই দিনগুলোতে।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ