বাদ পড়তে পারেন আ.লীগের আরও ১২ জেলার শীর্ষ নেতৃত্ব

  • 104
    Shares

অনলাইন ডেস্ক: টানা তিন মেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন। তারা নিজেরাই এখন নিজেদের প্রতিপক্ষ। দলীয় কমিটি গঠন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পদ ও মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ব্যস্ত পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়িতে। এদের অনেকেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এমনকি আছে সংঘর্ষ ও খুনোখুনির নজিরও। আর এতে ক্ষতি হচ্ছে দলের সার্বিক ভাবমূর্তির। কেন্দ্র থেকে বারবার সতর্ক কিংবা সমাধানের চেষ্টা করা হলেও মেলেনি কোনো আশানুরূপ ফল।

এ পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন ও বিরক্ত দলটির নীতিনির্ধারকরা এবার কোন্দল ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। যার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে নরসিংদী ও সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদের চার নেতাকে অব্যাহিত দেওয়া হয়েছে। একইভাবে আগামীতে আরও কমপক্ষে এক ডজন জেলা ইউনিটের ক্ষেত্রেও এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের বিভিন্ন ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোন্দলে জড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। যে কারণে কেন্দ্র থেকে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও সময়মতো পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা জমা দিতে পারেননি অনেক জেলা কমিটির শীর্ষ নেতৃত্ব। গত বছর ৩১ জেলায় সম্মেলনের মাধ্যমে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। তাদের চলতি বছর ২০ অক্টোবরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা পাঠানোর জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হলেও এর সব জমা পড়েনি। আবার বেশ কয়েকটি সাংগঠনিক জেলা থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটির দুটি করে তালিকা পাঠানোর ঘটনাও ঘটেছে। অনেক কমিটিতে আবার প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের জায়গা না দিয়ে নিজেদের লোক দিয়ে ‘পকেট কমিটি’ গঠনের অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া ওইসব কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। যে কারণে কেন্দ্র থেকে অনুমোদন মেলেনি কমিটিগুলোর। এর পাশাপাশি শুরু হয়েছে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া। আর এর অংশ হিসেবে গত রবিবার আওয়ামী লীগের সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি আবদুল লতিফ বিশ্বাস এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাতকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। দলের সভাপতির নির্দেশ ও সংগঠনের গঠনতন্ত্রের বিধি মোতাবেক এ পদক্ষেপ নেয় কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ। এর কয়েক দিন আগে নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম হিরু এবং সাধারণ সম্পাদক আ. মতিন ভূঞাকেও তাদের নিজ নিজ পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর এটা কোন্দলে জড়িত অন্য জেলা ইউনিটের নেতাদের জন্যও সতর্কতা সংকেত। সামনে আরও কমপক্ষে এক ডজন জেলা ইউনিটের ক্ষেত্রেও এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কোন্দল রয়েছে এমন তালিকায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, পঞ্চগড় এবং সিলেট, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগের কয়েকটি জেলার নাম রয়েছে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, তৃণমূলের কোন্দলের কারণে বিভিন্ন জেলা ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে সমস্যা দেখা দেয়। বিভিন্ন ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া জমা দেওয়ার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বহু অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগ আমলে নিয়ে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। দলে ঐক্য ফেরাতে অনৈক্যে জড়িয়ে পড়া তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে অ্যাকশন শুরু করেছেন দলীয় সভাপতি। শেখ হাসিনার একমাত্র লক্ষ্য তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় করা। যেখানেই নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব-কোন্দল পাওয়া যাবে সেখানেই ওই নেতাদের দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকলে সেটা মেনে নেওয়া হবে, তবে সীমা লঙ্ঘন করে আওয়ামী লীগ করা যাবে না। কেন্দ্রের সুস্পষ্ট এ বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই মূলত শেখ হাসিনার লক্ষ্য।

ইতিমধ্যে অব্যাহতি পাওয়া নেতারা সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্বে এলেও দলে শৃঙ্খলা ফেরাতে শেখ হাসিনা সভাপতির ক্ষমতাবলে অব্যাহতি দেওয়ার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। নিকট অতীতে দলে এমন কঠোর পদক্ষেপ আর নেওয়া হয়নি। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি, এর মধ্য দিয়ে দলের সর্বস্তরে কড়া বার্তা পৌঁছে যাবে। অনৈক্যের লেশমাত্র থাকবে না। আর এ ‘অ্যাকশন মুড’ সাংগঠনিক রাজনীতিতে সুফল বয়ে আনবে বলেও মনে করছে কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, দলীয় সভাপতির কাছে তথ্য আছে যে তৃণমূলের রাজনীতি ব্যক্তি তোষণে চলছে। অনেক এলাকায় ‘ভাই পার্টি’ হয়ে গেছে আওয়ামী লীগ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, কোথাও দুই আবার কোথাও তিন বা চার ভাগে বিভক্ত হয়ে চলছে আওয়ামী লীগের রাজনীতি। এভাবে দল চলতে পারে না। এখন দল ক্ষমতায় রয়েছে বলে বড় এই ক্ষতি স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছে না। তবে দল যখন ক্ষমতায় থাকবে না তখন এর মাশুল গুনতে হবে।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, ‘কেন্দ্রের এ পদক্ষেপ তৃণমূলে কঠোর অবস্থান জানান দেওয়ার জন্য। বিরোধপূর্ণ অন্তত এক ডজন জেলায় এ ধরনের অ্যাকশন নেওয়া হবে। তবে নিজেরা বিরোধ সমাধান করে কেন্দ্রকে অবহিত করলে শাস্তির আওতায় পড়বে না তারা। আর বিরোধ নিরসনে শুধু জেলা নয়, প্রয়োজনে মহানগর, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এই অ্যাকশন চলমান থাকবে।’

এ প্রসঙ্গে দলের সম্পাদকমণ্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের কোনো স্তরেই দায়িত্ব পালনকারী নেতাদের বিরোধ আর সহ্য করা হবে না। অ্যাকশন শুরু হয়েছে, এটা চলবে। এই অ্যাকশন গ্রহণের মধ্য দিয়ে সর্বস্তরে এ বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে যে দলে গ্রুপিং-বিরোধ সহ্য করা হবে না। যত বড় মাপের নেতাই হোক না কেন, শাস্তির আওতায় আনা হবে তাকে।’

সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনো নেতার পকেটের দল নয় যে পকেটে লোক থাকবে আর পকেটভারী ওই নেতা যা বলবে তাই হবে। রাজনীতি করতে হবে ব্যক্তি স্বার্থে নয়, দলের স্বার্থে। ব্যক্তির ইচ্ছায় দল চালানোর সময় শেষ।’

কাউকে অব্যাহতি দেওয়ার আগে বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করবেন জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘অব্যাহতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে কেন্দ্রের কঠোর অবস্থান জানানোই মূল লক্ষ্য। রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে স্বাভাবিক, কিন্তু সেটা যখন সীমা লঙ্ঘন করবে তখনই অ্যাকশনে যাওয়া হবে। অবশ্য অব্যাহতি দেওয়ার আগে বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করবেন। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে সর্বশেষ পদক্ষেপ হবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ গড়ে তুলতে চান। বিভেদ-বিরোধ জিইয়ে রেখে কেউ আওয়ামী লীগ করতে পারবেন না।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, ‘দলের সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ একটি সংগঠনে পরিণত করতে চান দলীয় সভাপতি। অনৈক্য রাজনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই কঠোর অবস্থান জানান দেওয়া হয়েছে দুই জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের অব্যাহতির মাধ্যমে।’ বিরোধপূর্ণ আরও জেলা থাকলে সেখানকার শীর্ষ নেতৃত্বকে একই পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও জানান আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এই সদস্য।

অন্যদিকে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, ‘কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত এক তালে, এক সুরে দল চলবে। এ লক্ষ্যে এখন কঠোর অবস্থানে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। সংগঠন কোনো ব্যক্তির নয়, সংগঠন করতে হবে আদর্শ অনুসরণ করে।’

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ