বাত ব্যথা নিয়ন্ত্রণের এখনই সময়

অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম

১২ অক্টোবর, বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি বাত ব্যথা বা আর্থ্রাইটিস বিষয়ে সচেতনতার জন্য পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘বাত ব্যথা নিয়ন্ত্রণের এখনই সময়’। এই বিষয়ে সচেতনতা কেন এত জরুরি? পৃথিবীতে বাত ব্যথা বা আর্থ্রাইটিস মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যার একটি অন্যতম কারণ। এই রোগে মানুষ শারীরিক অক্ষমতার জন্য কাজ করতে পারে না। রোজগার হতে বঞ্চিত হয় বিধায় অনেক মানুষ গরিব হয়ে যায়। রিউমোটোলজি বিভাগ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে মেডিসিনের একটি আধুনিক শাখা। বাংলাদেশে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিভাগ এই বিষয়ে চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষকগণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বিভাগ যথাক্রমে ২০০১ ও ২০১০ সালে বাংলাদেশে বাত ব্যথা রোগের প্রকোপ নির্ণয়ের জন্য দুইটি গবেষণা করে।

গবেষণার ফলাফল নিম্নরূপ: শতকরা ২৬ দশমিক ৩ (২০০১ সাল) ও ২৬ দশমিক ৫ (২০১০সাল) ভাগ মানুষ জীবনের কোন না কোন সময় বাত ব্যথায় ভোগেন। পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি ভোগেন। পুরুষের হার ২১ দশমিক ১ ভাগ ও নারীদের ৩১ দশমিক ৩ ভাগ (২০০১ সাল)। আশঙ্কার বিষয় যে ১০ বছরের ব্যবধানে নারীদের হার প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ৩৪ দশমিক ৫ ভাগ এবং পুরুষদের হার ১৮ দশমিক ৬ ভাগ হয়েছে (২০১০সাল)। একই এলাকায় পরিচালিত এই দুটি গবেষণায় দেখা যায়, বাত ব্যথার সবচেয়ে বেশি প্রকোপ থাকে কোমড়ে। কোমড়ে ব্যথা বাত ২১ দশমিক ২ ভাগ ও ২০ দশমিক ১ ভাগ (২০১০ ও ২০০১ সাল)। এরপরে হাঁটু ব্যথা বাত ১৪ দশমিক ৭ ভাগ ও ১৪ ভাগ (২০১০ ও ২০০১ সাল)। কাঁধের জোড়ার বাত ৭ দশমিক ৪ ভাগ (২০১০ সাল) ও ১১ দশমিক ৫ ভাগ (২০০১ সাল), কুঁচকি বা হিপের বাত ৭ দশমিক ১ ভাগ (২০১০ সাল) ও ১৩ ভাগ (২০০১ সাল), গোড়ালীর বাত ৬ ভাগ (২০১০ সাল) ও ৭ দশমিক ৭ ভাগ (২০০১ সাল)।

দুঃখের বিষয়, গবেষণা বছরে কাজ করতে পারে নাই তার প্রকোপ প্রায় ১৯ ভাগ (২০১০সাল) ও ২২ভাগ (২০০১ সাল)। ২০০১ সালে মানুষ গড়ে প্রায় ৪৯ দশমিক ৩ (± ৪৭.৫) দিন কাজে যেতে পারেন নি যা ২০১০ সালে ১৮ (±১৫ দশমিক ২) দিন। উপরের উপাত্ত হতে এটি প্রতিয়মান যে, বাত ব্যথা রোগের প্রকোপ অত্যন্ত আশঙ্কার যে নারীরা এই রোগে অনেক বেশি আক্রান্ত হন। সময়ের ব্যবধানে নারীদের মাঝে এই প্রকোপ বেশি। তাই এখনই সময় সবার সচেতন হওয়ার।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) রিউমাটোলজি বিভাগ শিক্ষা সেবা ও গবেষণা কাজের জন্য দেশ ও বিদেশে সুপরিচিত। এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিকেরও বেশি চিকিৎসক এই বিভাগ থেকে রিউমাটোলজিতে এমডি ডিগ্রি লাভ করেছেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয় সরকারি কোন প্রতিষ্ঠানে কোন পদ না থাকায় এই বিশেষজ্ঞদের চিকিৎসা সেবার বিস্তার করানো যাচ্ছে না। এদেশের অনেক মানুষ বাতব্যথা রোগের জন্য পাশ্ববর্তী অনেক দেশে গিয়ে অনেক টাকা ব্যয় করেন, কোন কোন সময় প্রতারিত হন। মনে করেন ভাল হয়ে যাবেন, কিন্তু প্রায় অনেক প্রকার বাতব্যথার রোগীরা চিকিৎসায় ভাল থাকেন ও প্রায় সুস্থ থাকেন। অপচিকিৎসা ও অন্যান্য অনেক কারণে আমাদের রোগীরা আরও দরিদ্র হন এবং শেষমেশ সাধারণ চিকিৎসা চালানোর সক্ষমতা হারিয়ে কর্ম অক্ষম হন। আমরা এই বিশেষ দিন আহ্বান করছি আসুন সবাই সচেতন হই এবং সময় নষ্ট না করে যার যার অবস্থান থেকে এই রোগগুলো হতে আমাদের রোগীদের নিরাময় বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি। সরকারের নিকট আবেদন সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে তাড়াতাড়ি এই আধুনিক বিষয়টির বিভাগ চালুসহ পদ সৃষ্টি করত চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা ও গবেষণা বিস্তার করে আমাদের বাতের কষ্টে থাকা রোগীদের বাঁচাবেন।

লেখক: চেয়ারম্যান, রিউমাটোলজি বিভাগ, বিএসএমএমইউ ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল, এশিয়া প্যাসিফিক লিগ অফ অ্যাসোসিয়েশনস ফর রিউমাটোলজি

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ