বন্যা সমস্যার সমাধান নেই!

মাহমুদ জামাল কাদেরী: এই কথাটা আমার নয়। আমার এক শিক্ষিত বন্ধু। সে ছাত্র হিসেবে ভাল ছিল। পড়াশোনার ঝোঁকও ছিল। তাই, পড়াশেষে ভাল চাকরি পেতে অসুবিধা হয়নি। আত্মপ্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে সহজেই। এখন ধর্ম-কর্ম নিয়ে সময় কাটান। এবারের বন্যা নিয়ে কথা প্রসঙ্গে বন্ধুটি বলে ওঠে, দেখ কত আর লেখালিখি করবে। কিছু হবে না। এখানে বন্যার মত সমস্যার সমাধান নেই। এখন শুধু দেখে যাওয়ার সময় ।

বন্যা তো আজকের সমস্যা নয়। সেই পাকিস্তান আমলে আমাদের জন্মের আগে থেকেই বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে এসেছে লাখো মানুষ। তখন থেকেই বন্যা সমস্যা সমাধানের দাবি শোনা গেছে। ১৯৫৪ সালে ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচির ৭ নম্বরে বন্যার কবল থেকে রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ছিল। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েও কিছু করতে পারেনি যুক্তফ্রন্ট সরকার। অবশ্য ক্ষমতায় বেশিদিন থাকতে পারেনি সে সরকার। তবে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। তখন নতুন নতুন রাস্তাঘাট, দালানকোঠা, অফিস-আদালত, শিল্প-কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কত কি-ই না হয়েছে। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উন্নয়নের দশক পালিত হয়েছে। কিন্তু বন্যা সমস্যার সমাধান হয়নি।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০ বছর হতে চললো, বন্যা কিন্তু আগের মতই রয়ে গেছে। প্রায় প্রতি বছর দেশের এক তৃতীয়াংশ, বিশেষ করে নিম্নাঞ্চল বন্যা কবলিত হয়ই। বিস্তীর্ণ এলাকার খেত-খামার, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ডুবে যায়। নদী ভাঙনে বিলীন হয় ছোট-বড় নানান স্থাপনাসহ কত কি! দুর্গত লাখো মানুষকে উদ্বাস্তু হতে হয়। রোগে-শোকে, পানিতে ডুবে মারাও যায় অনেকে। সে ক্ষয়ক্ষতি, বিশেষ করে আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয় না অনেকের পক্ষেই। তারা সর্বস্ব হারিয়ে বাস্তুহারা পরিচয়ে শহরে পাড়ি জমায়। সেখানে বস্তির সংখ্যা বাড়ে। প্রান্তিক মানুষের দারিদ্র্য গভীর হয়। এই অবস্থার পরিবর্তন কোথায়? সে লক্ষণও কি দেখা যায়?

অব্যাহত উন্নয়নের ছোঁয়া এইসব প্রান্তিক মানুষের জীবনকে উন্নত করে না । অথচ দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে ছুটে চলেছে। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে চলেছে। মহাকাশ-সমুদ্র জয় হচ্ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে, প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে। কিন্তু বন্যার মতো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কেন ? বন্ধুর প্রশ্নের জবাব কি দেব, ভেবে পাইনি।

সে আরও স্মরণ করিয়ে দিল, পাকিস্তানী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আপামর জনগণ রুঁখে দাঁড়িয়েছিল দিনবদলের স্বপ্ন নিয়ে। ৬ দফায় দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর ও সার্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি প্রাধান্য পেলেও ঐতিহাসিক ১১ দফার ৮ নম্বরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলসম্পদের সার্বিক ব্যবহারের কথা গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে এসব কথার গুরুত্ব থাকেনি কারও কাছেই। কোনো সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো, নিঃসন্দেহে বলা যায় ।

বন্ধুর কথার জের ধরেই বলা যায়, এর মধ্যেই নদীমাতৃক এই দেশের অনেক নদ-নদীই হারিয়ে গেছে চিরতরে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা দেশের নদী রক্ষার কার্যকর পদক্ষেপ নিলে হারিয়ে যেত না কোনো নদী। সেসব নদী জবরদখলে নিয়ে কাগজ-পত্র বানিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাড়ানোর সুযোগ পেত না প্রভাবশালীরা। পরিবেশের জন্য এর ফল হয়েছে বিপর্যয়কর। পানিশূন্যতা দেখা দিয়েছে। রূক্ষ্মতা বৃদ্ধি পেয়েছে, চরমভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ, বিশেষ করে বন্যার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়েছে। ফলে বন্যা হলেই তা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

বর্ষাকালে দেশের প্রধান নদ-নদীগুলো হিমালয়ের বরফগলা ও বৃষ্টির পানিতে উপচে ওঠে। বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হয়। পলি পড়ে জমির উর্বরতা বাড়ে। ভূগর্ভস্থ পানিশূন্যতা দূর হয়। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ও জনদুর্ভোগের শেষ থাকে না।

পৃথিবীর বৃহত্তম এই ব্বদ্বীপের নদীগুলো স্বাভাবিককারণেই আঁকাবাঁকা। তাই পানি ও পলি পরিবহনও বাধাগ্রস্থ হয়। অস্বাভাবিকভাবে তীর ভাঙে। নদীর তলদেশ ভরাট হয় প্রতিনিয়ত। চরের সংখ্যা বাড়ে। বিস্তীর্ণ চরে বাধা পেয়ে নদীপ্রবাহে চ্যানেল তৈরি হয়। নৌচলাচল বিঘ্নিত হয়। নদীভাঙনে দুই তীরের মানুষের সর্বস্ব হারানোর পাশাপাশি বর্ষাশেষে নাব্যতা হারায় নদী ।

আবহাওয়াবিদদের মতে, আগে সাধারণত প্রতি ৭ থেকে ১০ বছর পর পর বড় বন্যা হতো। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন ঘনঘন বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে গেছে। সেই সাথে বেড়েছে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি ব্যবস্থাপনার কার্যকর ভূমিকা চোখে পড়ে না।

প্রতিটি সরকার বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে নদ-নদী খনন ও তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণে বছর বছর কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে, বাস্তবায়নও করছে। এর অধীনে ভরা নদীতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার ধুম পড়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে মাটির বাঁধও নির্মিত হয়। কিন্তু এসব টেকসই না হওয়ায় তার সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে অহরহই জলমগ্ন হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ফসলের খেত ডুবছে, ভেসে যাচ্ছে পুকুরের মাছ। এর মধ্যেই কিছু লোকের ভাগ্য বদল হচ্ছে ঠিকই।

বন্যা শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই সৃষ্টি করে না, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ও বাড়িয়ে তোলে। তাই বন্যা মোকাবিলায় সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির পাশাপাশি অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত হওয়াটা জরুরি মনে করেন নদী বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে বন্যার প্রকৃতি ও ভয়াবহতা নির্ভর করে প্রধানত উজানের ঢল, তার গতি ও ধীর্ঘস্থায়িত্বের ওপর। এ ছাড়া বৃষ্টিপাতের পরিমাণ তো আছেই। বর্ষাকালে পরিস্থিতির চাপে উজানে নদীতে নির্মিত ব্যারাজের গেট খুলে দিলে এই ভাটির দেশে বন্যা প্রবল হয়ে ওঠে। ক্ষয়ক্ষতিও বেড়ে যায়। এ অবস্থায় শুধু নদী খনন ও নদীতীরে বাঁধ দিয়ে বন্যা মোকাবিলার পুরানো পদ্ধতি কতটা কার্যকর সেটা ভেবে দেখার বিষয়।

তবে স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনা করে নেয়া পদক্ষেপের ওপর অনেককিছুই নির্ভর করে । ইউরোপের ছোট্ট দেশ নেদারল্যান্ডস দীর্ঘ বাঁধ (ডাইক) নির্মাণ করে সমুদ্রতলদেশ থেকে জমি উদ্ধার করেছে। দীর্ঘদিনের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানও হয়েছে। তারা পারলে আমরা পারি না কেন?

নদী হলো জীবন্তসত্তা। সর্বদা পরিবর্তনশীল। সম্প্রতি উচ্চ আদালতের রায়েও এর স্বীকৃতি মিলেছে। তাই নদী রক্ষা ও বন্যা মোকাবিলায় ৫০ বা ১০০ বছরের দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প ঠিক কি কাজে আসবে সেটাই বা কে বলবে। এমন অনেক প্রকল্পই পরবর্তীতে ধামাচাপা পড়ে যেতে দেখা গেছে।

নদী ভাঙনের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক নির্দেশনাকে বাস্তবসম্মত বলতেই হবে। নদীতীরে স্থায়ী স্থাপনার পরিবর্তে দ্রুত অপসারণক্ষম স্থাপনা নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এ প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বড় বড় স্থাপনাগুলোর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা ভাবনার এখনই সময়। এর মধ্যেই অনেক দালান-কোঠা, রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হবার সচিত্র সংবাদ পত্র-পত্রিকায় ফলাও প্রচার পেয়েছে ।

বন্যা মোকাবিলা তথা নদী রক্ষা, নদী খনন, নদী ব্যবস্থাপনার মত কাজ আধুনিকভাবে করার জন্য পর্যাপ্ত গবেষণা ও বাস্তবসম্মত জাতীয় পরিকল্পনার বিকল্প নেই। কেন বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায় না সেটাই প্রশ্ন। অপরিকল্পিত ও বিচ্ছিন্নভাবে নদী খননে সমস্যার সমাধান না করে জটিলতাই বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে অর্থের শ্রাদ্ধ নিয়ে বেশিকিছু না বলাই ভালো ।

এ ধরনের প্রকল্প প্রনয়ণের কাজে শুধুমাত্র বিদেশি পরামর্শকদের ওপর নির্ভর না করে দেশীয় পরামর্শকদেরও কাজে লাগানো দরকার। কারণ তারাই স্থানীয় পরিস্থিতি, নদ-নদী, প্রকৃতি-পরিবেশ সম্পর্কে ভালো জানেন, বেশি বুঝেন । তবে, সার্বিকভাবে কাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিয়মিত নজরদারি না থাকলে সর্বগ্রাসী ঘুণ পোকার প্রাদুর্ভাব থেকেই যাবে। বন্যার সমাধানও ধরা ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যাবে। এমন অবস্থা আর কত দীর্ঘস্থায়ী হবে?

লেখক: সাংবাদিক।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ