বন্যায় ভেসে যাচ্ছে মাছ, তলিয়ে গেছে ফসল

  • 17
    Shares

সোনালী ডেস্ক: বন্যার পানি বৃদ্ধি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানির প্রবল চাপে রাজশাহীর বাগমারার ভবানীগঞ্জ পৌর এলাকাসহ সোনাডাঙ্গা, কাচারী কোয়ালীপাড়া, দ্বীপপুর, বড়বিহানালী ও ঝিকরা ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এদিকে নাটোরের সিংড়ায় আত্রাই নদীর পানি অব্যাহত বৃদ্ধিতে সিংড়া পৌর এলাকার ১২টি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। এতে ভেসে গেছে পুকুরে চাষকৃত কোটি কোটি টাকার মাছ, পানিতে তলিয়ে গেছে ধানসহ বিভিন্ন ফসল।

বাগমারা প্রতিনিধি জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানির প্রবল চাপে বাগমারার বিভিন্ন ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে পড়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ।

বিভিন্ন সড়ক কোমর পর্যন্ত পানিতে ডুবে যাওয়ায় ওইসব এলাকার মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে। অপরদিকে বন্যার পানি বৃদ্ধির কারণে উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপদ বিভাগ ও এলজিইডি’র একাধিক বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে।

সরজমিনে এলাকায় গিয়ে জানা যায়, এবারে বর্ষার শুরুতে গত দু’দফায় টানা বর্ষণে উপজেলার নদ-নদী, খাল-বিল ও পুকুর পরিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এছাড়া টানা বর্ষণের সাথে উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে উপজেলা ৬টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা বন্যা প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

নওগাঁর মান্দায় বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুতগতিতে বারনই ও হীরা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত বাগমারার ভবানীগঞ্জ পৌর এলাকাসহ সোনাডাঙ্গা, কাচারী কোয়ালীপাড়া, দ্বীপপুর, বড়বিহানালী ও ঝিকরা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করে এবং মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম বন্যা কবলিত হয়ে পড়ে।

এ বন্যায় নিম্নাঞ্চলের কৃষি জমির আবাদ তলিয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে শত শত পান বরজ, আমন ধান, শসা, চিচিংগা, মরিচ, বেগুন, পটলসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি জাতীয় ফসল। ভেঙে পড়ছে অর্ধশতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি। শত শত পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।

উপজেলা সদর ভবানীগঞ্জ থেকে বড়বিহানালী বাজার পর্যন্ত সড়ক, ভবানীগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মোড় থেকে জাঙ্গালপাড়া হয়ে পীরগঞ্জ টেকনিক্যাল কলেজ পর্যন্ত সড়ক, ভবানীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজ মোড় থেকে তক্তপাড়া হয়ে বৈলসিংহপুর উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়ক এবং হাটদামনাশ বাজার থেকে শিমলা বাজার হয়ে সোনাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন পর্যন্ত সড়ক কোমর পর্যন্ত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে ওইসব সড়ক পথে মানুষের যোগাযোগ একবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

ভবানীগঞ্জ পৌর মেয়র আব্দুল মালেক ও সোনাডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আজাহারুল হক জানান, নওগাঁর মান্দায় বন্যার প্রভাবে বারনই ও হীরা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দ্রুত গতিতে বাগমারার ভবানীগঞ্জ পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। বন্যায় ভবানীগঞ্জ পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে শত শত পানবরজ ও ফসলি জমির আবাদ।

আমাদের সিংড়া প্রতিনিধি জানান, নাটোরের সিংড়ায় আত্রাই নদীর পানি অব্যাহত বৃদ্ধিতে সিংড়া পৌর এলাকার ১২টি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার আত্রাই নদীর পানি সিংড়া পয়েন্টে বিপদসীমার ১১১ সে:মি: উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বুধবার রাত দুইটার দিকে পানির তীব্র স্রোতে পৌর এলাকার শোলাকুড়া মহল্লায় সিংড়া-বলিয়াবাড়ি রাস্তার বাঁধ ভেঙে যায়। এতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে শোলাকুড়া, সোহাগবাড়ী, কতুয়াবাড়ী, মহেশচন্দ্রপুরসহ কয়েকটি এলাকার হাজার হাজার মানুষ। বৃহস্পতিবার সকাল ৭ টার দিকে নাগর নদীর হিয়াতপুর নামক স্থানে সিংড়া-তাজপুর সড়ক বাঁধ ভেঙ্গে যায়। এতে ওই ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

এদিকে বন্যায় উপজেলার ২ হাজার ৭৭৬ হেক্টর জমির রোপা আমন ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ১৩’শ পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। পানিবন্দি হয়েছে অন্তত এক লাখ মানুষ। ফলে নিরুপায় হয়ে আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে ছুটছেন বন্যাকবলিত এলাকার দুর্গত মানুষরা। ইতোমধ্যে ২৫ টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাজ্জাদ হোসেন জানান, নতুন করে বন্যার কারণে এই উপজেলায় ২ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমির রোপা আমন পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আরো ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি ।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওয়ালিউল্লাহ মোল্লা জানান, দ্বিতীয় দফার এই বন্যায় এ উপজেলায় অন্তত ১ হাজার ৩০০ টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা যায়নি। বন্যার পানি যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে আরও ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করতে মৎস্য বিভাগ তৎপর রয়েছেন।

সিংড়া পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, শোলাকুড়া মহল্লা সংলগ্ন বাঁধ ভেঙে তিনটি বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। আরো বাড়ি হুমকির মুখে।

সিংড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাসরিন বানু জানান, বন্যা পরিস্থিতি সার্বিক খোঁজ-খবর নিতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মনিটরিং সেল খোলা হয়েছে। পানিবন্দি মানুষগুলো যাতে কষ্ট না পায় সেজন্য ২৫টি আশ্রয় কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৮৮০ টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিক বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে বলেন, আশ্রয় কেন্দ্রে ও বন্যা কবলিত এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ করা হবে।

নাটোরের জেলা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন সদা প্রস্তুত রয়েছেন। সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ