বঙ্গবন্ধুর দেয়া আত্মপরিচয় রক্ষা করতে হবে

সোনালী ডেস্ক: রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি শ্লোগানের মাধ্যমে আমাদের পরিচয় দিয়েছিলেন। সেøাগানটি হলো, ‘আমি কে, তুমি কে, বাঙালি বাঙালি’। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর দেয়া সেই পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দেয়া সেই আত্মপরিচয় আমাদের রক্ষা করতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর দেয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, এ বছর আমরা মুজিববর্ষ পালন করতে যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার বিন¤্র শ্রদ্ধা নিবেদন করি। বঙ্গবন্ধু আমাদের আত্মপরিচয় দিয়েছেন। তিনি আমাদের দেশের জন্ম দিয়েছেন। তিনি হচ্ছেন জাতির জনক, এ ব্যাপারে কোন কথা থাকতে পারে না।
তিনি বলেন, যারা জাতির পিতাকে হত্যা করেছিলো তাদের জিয়াউর রহমানের আমলে পুরস্কৃত করা হয়েছিলো। ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে যারা নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিলেন তারা কি চেয়েছিলেন সেটি আমরা জানি। বঙ্গবন্ধুর দেয়া আত্মপরিচয় আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছি। ৭ই মার্চের ভাষণে সেই দিকনির্দেশনা ছিলো। মনে রাখতে হবে, সে সময় বাংলাদেশ একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। সেই কথা সংবিধানে স্পষ্ট করে লেখা আছে।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান শুধুমাত্র একটি সংবিধান নয়; বঙ্গবন্ধুর চেতনা, বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি, উন্নয়ন দর্শন সবকিছুই সংবিধানের মধ্যে লিপিবদ্ধ আছে। আমরা যদি বঙ্গবন্ধুকে চিনতে চাই, তবে বাহাত্তরের সংবিধানকে আমাদের সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এই মুজিববর্ষেই সেই চেতনা প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে।
তিনি বলেন, সামরিক শাসনের আরেকটি পর্ব ছিলো জেনারেল এরশাদের আমলে। তৎকালীন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ১৪ ফেব্রæয়ারিতে আমরা রাজপথে ছিলাম। সে সময়ও আমরা আরেকটি সামরিক শাসককে দেখেছিলাম। আন্দোলন চলাকালীন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর কি রকম নির্মমভাবে গুলি চালানো হয়েছিলো! সেদিন অসংখ্য ছাত্রছাত্রী আহত হয়েছিলেন, তিনজন শহিদ হয়েছিলেন। আমার মনে আছে, সেই শহিদদের লাশ নিয়ে বটতলায় যখন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলাম, তখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ঘেরাও করে ফেলা হয়েছিলো। আমরা সেই লাশ নিয়ে মহসীন হলে লুকিয়েছিলাম। অতএব, সকল সামরিক শাসকদের চরিত্র একই রকম হয়, এতে কোন সন্দেহ নেই। জিয়াউর রহমানের আমলে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাসহ আমরা ২৩ মাস জেল খেটেছিলাম। আমরা ঢাকা কারাগার ও রাজশাহী কারাগার দেখেছি, কীভাবে সামরিক শাসকেরা সেনাসদস্যদের ধরে এনে পশুর মতো হত্যা করে।
রাকসুর সাবেক এই ভিপি বলেন, একটি কথা খুবই অবাক লাগে! পচাত্তরে যখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসে তখন আমরা বিদেশি অনেক রাষ্ট্রদূতকে দেখেছি যে বাংলাদেশ একটি স্যাকুলার দেশ এটি তারা স্বীকার করতে চাইতো না। তারা বলতো, মডারেট ইসলামিক স্টেট। মডারেট ইসলামিক স্টেট এর তত্ত¡ আমেরিকা থেকে এসেছিলো। এটি আসার কারণ এর পিছে তাদের কিছু স্বার্থ জড়িত ছিলো।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ৬ ডিসেম্বরে ভারত যখন আমাদের স্বীকৃতি দেয় তখন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর একটি বক্তব্যে বাংলাদেশ কেমন হবে সেটি প্রতিফলিত হয়েছিলো। তিনি বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুও বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তাই এই মুজিববর্ষে চার মূলনীতি ও বঙ্গবন্ধুর পথ ধরেই আমরা এগিয়ে যেতে চাই। ভারতের অনেক রাজনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশ নাকি ইসলামিক রাষ্ট্র। আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশ কখনও বঙ্গবন্ধুর পথ, ধর্মনিরপেক্ষতার পথ পরিত্যাগ করবে না- এই প্রতিশ্রæতি আমরা দিতে চাই। রাষ্ট্রক্ষমতায় যেই আসুক তারা কখনও এই পথ থেকে বিচ্যুত হতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, বিএনপি বলে থাকে, ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে ধর্মহীনতা। ধর্মের সাথে অসাম্প্রদায়িকতার কোন সম্পর্ক নেই। কোন মানুষ যদি ধর্মে বিশ^াসী হয় তবে তার অবশ্যই অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে কিছু লোকের ফতোয়াতে আমাদের ঘাবড়ালে চলবে না। মুক্তিযুদ্ধের পথ ও ধর্মনিরপেক্ষতার পথকে আমাদের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে রাখতে হবে। আমরা যে পথে আছি, সেই পথে কোন ত্রæটি নেই। আমি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই, তিনি এই পথকে তুলে ধরেছেন এবং এই পথে দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমদের ঐক্যবদ্ধতার প্রশ্নে যেন কোন ফাঁক না থাকে সেই বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাদশা আরও বলেন, আমাদের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আমাদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ফোর্থ ইন্ড্রাস্টিয়াল রেভ্যুলেশনের সাথে যুক্ত হতে হবে। ফোর্থ ইন্ড্রাস্টিয়াল রেভ্যুলেশনের সাথে যুক্ত হতে গেলে আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া দরকার। আমাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা যদি ফোর্থ ইন্ড্রাস্টিয়াল রেভ্যুলেশনের সাথে অ্যাডজাস্ট করতে না পারে তাহলে আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হতে পারবো না। কারণ আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এমন থাকলে আমাদের লক্ষ্য অর্জনে আমরা সফল হতে পারবো কী না সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।
তবে কৃষিক্ষেত্রে দেশের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন ফজলে হোসেন বাদশা। বলেন, বাংলাদেশ একটি ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি সাফল্য অর্জন করেছে। সেটি হলো- আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমাদের কৃষিক্ষেত্রে একটি বিশাল সাফল্য এসেছে। কিন্তু সেই সাফল্য ধ্বংস হয়ে যাবে যদি আমরা কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারি। আমি যে এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছি সেটি হলো দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল। এই অঞ্চল বাংলাদেশের খাদ্যভাÐার হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের এই অঞ্চলের কৃষিজমি অপরিকল্পিত শিল্পয়ানের জন্য বিনষ্ট হচ্ছে। কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। সেক্ষত্রে আমাদের বিশেষ গুরুত্ব দেয়া দরকার।
তিনি বলেন, আমাদের ভূ-গর্ভস্থ পানি ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। তার ফলে ভূ-পৃষ্ঠে উত্তাপ বেড়ে যাচ্ছে। নদীর পানি থাকছে না, জলাশয়ের পানি থাকছে না। এর ফলশ্রুতিতে যে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। এক্ষেত্রে কৃষিক্ষেত্র অনেক ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের যে ঝুঁকি সেই ঝুঁকি পরিবর্তনে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এর আগে নিজের বক্তব্যের শুরুতে ভাষার মাসে ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন ১৪ দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা ফজলে হোসেন বাদশা।

শর্টলিংকঃ