প্রক্রিয়ায় আটকে আছে কিট কেনা

অনলাইন ডেস্ক: নানা প্রক্রিয়া শেষে গত ১৭ সেপ্টেম্বর দ্রুত করোনাভাইরাস শনাক্তে অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমোদন দেয় সরকার। কিন্তু অনুমোদনের এক মাসের বেশি সময় পরও কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে পারেনি। ঠিক কোন পদ্ধতিতে এই কিট কেনা হবে তা এখনো ঠিক করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি)। ফলে ঠিক কবে নাগাদ এই কিট দেশে আসবে ও অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা কিটের মান পরীক্ষা করে তিন-চারটি কোম্পানির নাম ইতিমধ্যেই সিএমএসডিতে পাঠিয়েছেন এবং সেখান থেকে তাদের পছন্দ অনুযায়ী কেনার চাহিদাপত্র দিয়েছেন। এক্ষেত্রে অধিদপ্তর দরপত্র আহ্বান বা সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়া (ডিপিএম)এই দুটির মধ্যে যেকোনো প্রক্রিয়ায় কেনার সুপারিশ করেছে।

অন্যদিকে সিএমএসডির কর্মকর্তারা বলছেন, টেকনিক্যাল মূল্যায়ন কমিটির মিটিং শেষে তারা অধিদপ্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছেন। সেখান থেকে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এলেই কেনার উদ্যোগ শুরু হবে। তবে সিএমএসডির কর্মকর্তারা চাইছেন, কিটের সহজলভ্যতা পরীক্ষা করে পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) বা জিটুজি (সরকার টু সরকার) পদ্ধতিতে কিট কিনতে।

এমন পরিস্থিতিতে ঠিক কবে নাগাদ এসব প্রক্রিয়া শেষে কিট কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে সরকার, তা নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কারণ গত দুই সপ্তাহ ধরে কিট কেনার ব্যাপারে স্পষ্ট করে সরকারের কেউ কিছু বলছেন না। গত সোমবার এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দেশ রূপান্তরকে জানান, কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো আসেনি। একই দিন স্বাস্থ্য সচিব (সেবা বিভাগ) মো. আবদুল মান্নান কিটের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানে বলে দেশ রূপান্তরের কাছে মন্তব্য করেন। আর এর পাঁচ দিন আগে গত ১৪ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয় যে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার জন্য প্রাথমিকভাবে দুই লাখ কিট দুয়েক দিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছেন; এরপর শুরু হবে পরীক্ষা। এমনকি এর চার দিন পর গত ১৮ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এমন তথ্যও দেওয়া হয় যে, সেদিনই কিছু কিট দেশে এসে পৌঁছেছে। এসব কিট দিয়ে তারা পরীক্ষা শুরু করতে পারবেন।

এমনকি যে প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে অ্যান্টিজেন টেস্ট হবে এবং কিটের মান পরীক্ষার দায়িত্ব সেই রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানও (আইইডিসিআর) এই কিটের ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলতে পারছে না। এ ব্যাপারে গত বুধবার আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা জানান, সরকার কেনার প্রক্রিয়ায় আছে। দেশে এসে পৌঁছেছে কি না জানা নেই। সিএমএসডি কিনবে। তারাই বলতে পারবে কিনেছে কি না। কেনার প্রক্রিয়ায় আছে, এটুকু তারা জানেন।

অথচ গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিএমএসডির দুই শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এতদিন বলে আসা কিট কেনার ব্যাপারে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন তথ্যের উল্টো তথ্য পেয়েছে দেশ রূপান্তর। এই দুই কর্মকর্তার তথ্যমতে, এখনো কোনো কোম্পানিকে কিট কিনতেই দেওয়া হয়নি। এমনকি গতকাল পর্যন্ত কোন পদ্ধতিতে এই কিট কেনা হবে, সেই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে পারেনি। পদ্ধতি চূড়ান্তের পরই শুরু হবে কেনার মূল প্রক্রিয়া।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, অ্যান্টিজেন কিট কেনার জন্য সিএমএসডিকে রিকুইজিশন দিয়েছি। পাশাপাশি তিন-চারটি কোম্পানির নামও দিয়েছি। সেখান থেকে তারা যেকোনো একটি বা দুটি বেছে নিতে পারে। এ ছাড়া উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার মধ্যে ইউনিসেফকে বলেছি ১০ লাখ কিট কিনে দিতে। ওরা সরাসরি উৎপাদনকারী দেশ থেকে নিয়ে আসবে। ওরা ইতিমধ্যেই আমাদের রিকুইজিশন নিয়ে গেছে। তবে ওদেরটা আসতে একটু দেরি হবে। অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরুর আগে যেসব ভ্যালিডেশন লাগে, সেগুলোর ভ্যালিডেশন হয়ে গেছে। এখন সিএমএসডি কিনে দিলেই আমরা শুরু করতে পারি।

কিট কেনার পদ্ধতির কথা উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, সিএমএসডি দুটি পদ্ধতিতে কিনতে পারবে দরপত্রের মাধ্যমে অথবা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম)। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত ডিপিএমের অনুমতি দেওয়া আছে।

তাহলে সিএমএসডির কিট কিনতে দেরি করছে কেন জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ১৫-২০ দিন আগে সিএমএসডিকে রিকুইজিশন দিয়েছি। কিনতে দেরি হচ্ছে কেন, সে ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর খোঁজ নিয়েছে। তারা কিট কেনার জন্য টেকনিক্যাল মিটিংও করেছে। সেখানেও আমরা গিয়েছিলাম। সেখানেও বলেছি কিনতে। হয়তো প্রসিডিউর মেনটেইন করতে দেরি হচ্ছে। তবে কেন দেরি হচ্ছে জানি না।

অথচ সিএমএসডি কিট কেনার ব্যাপারে অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিএমএসডি পরিচালক আবু হেনা মোর্শেদ জামান। গতকাল শুক্রবার রাতে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিট কেনার বিষয়টি প্রক্রিয়ায় আছে। নিয়ম হচ্ছে যে, টেকনিক্যাল মূল্যায়ন কমিটির একটা মিটিং হতে হয়। এই কমিটির সভাপতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। মিটিং হয়েছে। রেজল্যুশন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে পাঠিয়ে দিয়েছি। উনি এটা দেখছেন। আমরা যদি রেজল্যুশনটা আনুষ্ঠানিকভাবে পেয়ে যাই, তখন কেনার পদক্ষেপ নেব।

এমনকি কেনার প্রক্রিয়া নিয়েও ভিন্নমত এসেছে সিএমএসডির বক্তব্যে। এই কর্মকর্তা বলেন, অধিদপ্তর বলছে বাজারে অ্যান্টিজেন কিট সহজলভ্য। সে অনুযায়ী আমরা যদি অনেক সরবরাহকারীকে পাই তা হলে পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) পদ্ধতিতে সংগ্রহের উদ্যোগ নেব। আর যদি দেখি সহজলভ্য নয়, তখন আমরা জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) পদ্ধতিতে চলে যাব, যত দ্রুত আনা যায়। এই দুই ধরনের সুপারিশের কথা আলোচনা হচ্ছে। টেকনিক্যাল মূল্যায়ন কমিটি সম্ভবত এরকম একটা সিদ্ধান্ত দিতে পারে। চূড়ান্তভাবে অধিদপ্তর থেকে যে সিদ্ধান্ত আসে, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব। আমরা চাই স্বচ্ছ উপায়ে দ্রুত কিনতে।

সেক্ষেত্রে কত দিনের মধ্যে কিট কেনা হতে পারে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, এটা আমাদের জন্য একটা নতুন অভিজ্ঞতা। নির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ বলা যাবে না। আমরা শুধু এটুকু বলতে পারি অধিদপ্তর ও সিএমএসডি সবাই আমরা চাইছি যে, যত দ্রুত আনা যায়।

করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞরা দ্রুত অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, অ্যান্টিজেন পরীক্ষার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে টেস্টের ফল পাওয়া সম্ভব। এছাড়া এ টেস্টে তেমন কোনো ধরনের প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি দরকার হয় না বলে ফিল্ডে বা মাঠপর্যায়েই এ পরীক্ষা চালানো সম্ভব। বিশেষ করে যেকোনো কারণে হাসপাতালে জরুরি বিভাগে যদি রোগী আসে, সে সময় যদি আমরা অ্যান্টিজেন টেস্ট করে ফেলতে পারি, তিনি যদি করোনামুক্ত হন তাহলে আমরা তার স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারব। কিন্তু যদি করোনা পজিটিভ হন, তাহলে তাকে করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসা করতে পারি। এছাড়া আমাদের ট্রেসিং টেস্টিংয়ের জন্য অ্যান্টিজেন পরীক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন।

এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, আমরা যখন কোনো এলাকায় অনুসন্ধান করব, তখন যদি কাউকে সন্দেহ হয়, আমরা তাকে টেস্ট করে যদি পজিটিভ পাই, তাহলে কিন্তু তাকে দ্রুত আইসোলেট করে ফেলা যাবে। তার থেকে রোগ আর অন্যদেও মধ্যে ছড়াবে না। সুতরাং আমাদের অ্যান্টিজেন টেস্ট এখন খুব জরুরি। একজন রোগীর বাড়িতে বসেই ১৫ মিনিটের মধ্যে বলে দেওয়া যাবে তিনি করোনা আক্রান্ত কি না।

একইভাবে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অ্যান্টিজেন টেস্টের দরকার এখনো আছে। আরটিপিসিআর পদ্ধতিতে রোগীকে আসতে হয় পরীক্ষার জন্য। কিন্তু অ্যান্টিজেন টেস্টের ক্ষেত্রে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী খুঁজে পরীক্ষা করা যায়। বাড়ি গিয়ে নমুনা নিতে পারে। আরটিপিসিআরে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের দক্ষতা বেশি লাগে। কিন্তু অ্যান্টিজেন টেস্টের নমুনা সংগ্রহ ইপিআই কর্মীরাও পারে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা কমিউনিটি ক্লিনিকে বসেও আধ ঘণ্টার মধ্যে করা যায়। সংক্রমণ কমে গেছে। কিন্তু কমিউনিটি ট্রান্সমিশন তো বন্ধ হয়নি। সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এই পরীক্ষা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত জুন থেকে দেশে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষায় অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমোদন দেয় সরকার। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, অতি স্বল্প সময়ে কভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য সারা দেশে অ্যান্টিজেন টেস্টের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রস্তাব এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১১ সেপ্টেম্বরের ‘ইনটেরিম গাইডেন্স’ অনুসরণ করে দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, সরকারি পিসিআর ল্যাব এবং সব স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে অ্যান্টিজেনভিত্তিক টেস্ট চালুর অনুমতি দেওয়া হলো। এর আগে গত ৫ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিজেন নীতিমালার খসড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এরপর ২৪ জুলাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ