পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের হাতছানি

অনলাইন ডেস্ক: জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে কিছুটা মুক্ত জীবনের স্বাদ পেতে ভ্রমণ খুবই প্রয়োজন। এমনকি নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে নিজের চিন্তা গুলোকে সতেজ রাখতে ভ্রমণ অপরিহার্য। ভ্রমণ একাধারে যেমন জ্ঞানবর্ধক তেমনি রোমাঞ্চকর মনের খোরাকও যোগায়। নিজের জন্য কিছু সময় রাখা, মানসিক চাপ কমাতে এবং নিজেকে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সর্বোত্তম উপায় হলো ভ্রমণ।

ভ্রমণ প্রথমে আপনাকে নির্বাক করে দেবে তারপর আপনাকে গল্প বলতে বাধ্য করবে। ভ্রমণ শেষে নিজ বাড়িতে ফেরার আগ পর্যন্ত আপনি বুঝতে পারবে না আপনার সফর কত সুন্দর আর চমৎকার ছিলো।

একবার ভাবুন তো, আপনি সাঁতার কাটছেন এমন এক সুইমিংপুলে যেটি কিনা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ১৮০০ ফুট উপরে, যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি খুব সহজে দেখতে পাবেন দিগন্তজুড়ে খোলা পাহাড়ের ভাজ আর শুভ্র মেঘের আনাগোনা।

ভ্রমণপিপাসুদের আজকে জানাবো এমন একটি রিসোর্টের সৌন্দর্যের কথা যেটি কিনা চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত পার্বত্য অঞ্চল বান্দরবান জেলায় অবস্থিত ‘সাইরু হিল রিসোর্ট’। নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী, আধুনিক অবকাশ যাপনের সব ব্যবস্থা নিয়ে গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল এই রিসোর্টটি। দেশের অন্য যেকোনো রিসোর্টের তুলনায় অবস্থান আর সৌন্দর্যের দিক দিয়ে এটি নিশ্চয় প্রথমসারির রিসোর্টের তালিকায় থাকবে।

বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে বান্দরবান-থানচি সড়কের পাশে এর অবস্থান। চিম্বুক পাহাড়ের দিকে যেতে দেখা মিলবে এই চমৎকার রিসোর্টের। নীলগিরি রোডে ওয়াই জংশন আর্মি ক্যাম্পের পাশেই সাইরু হিল রিসোর্ট’র অবস্থান হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে একদমই ভাবার অবকাশ নেই। যেকোনো ছুটির দিনে বন্ধু, আত্মীয়, পরিবার কিংবা প্রিয়জনকে নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন বর্তমানে দেশের সবচেয়ে সুন্দর ভিউসমৃদ্ধ এই রিসোর্ট থেকে। প্রায় ১৮০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় নান্দনিক ডিজাইন, প্রকৃতির ছায়ায় সাজানো গুছানো পরিবেশ, চারপাশে সবুজ পাহাড়ের সারি, চোখের সামনে ভেসে থাকা মেঘের আনাগোনা এই সবকিছুই আপনার সময়কে উপভোগ্য করে তুলবে। অত্যাধুনিক বিলাসবহুল এই রিসোর্টে আছে সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা।

আশেপাশের পাহাড়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পাহাড়টিতে গড়ে উঠা সাইরু হিল রিসোর্ট- এ যেকোনো ঋতুতে গেলেই ভালো লাগবে। যদিও ভ্রমণ করে এসেছেন এমন অতিথিদের মতে বর্ষাকাল হচ্ছে ‘সাইরু হিল রিসোর্ট’ ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময়। তবে, শীতকালেও সাইরু হিল রিসোর্ট’র সৌন্দর্য অসাধারণ। শীতের সময় এখানে গেলে মনে হবে কুয়াশার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে কেউ আপনাকে। ঠিক তাই, সকালে ঘুম ভেঙে বিছানায় বসেই দেখবেন টেরেসের দরজায় কেউ উঁকি দিচ্ছে। উঁকি দিচ্ছে একগুচ্ছ শুভ্র মেঘের বাহার যারা আপনাকে সাত সকালে শীতল করে দিতে হুড়মুড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে চাইছে। দরজা মেললেই তাদের সাথে হবে আপনার আলিঙ্গন। তারপর দেখবেন পুরো রুমজুড়েই মেঘদলের সাথে আপনার বসবাস।

‘সাইরু হিল রিসোর্ট’র নামকরণের পেছনের একটি গল্প আছে। দীর্ঘদিন আগে, বান্দরবান জেলার দূরবর্তী অঞ্চলে এক পাহাড়ি বংশের রাজার কন্যা ছিল যার নাম ছিল সাইরু। সে এক যুবক যে কিনা অন্য গোত্রের এক রাজপুত্রের সঙ্গে প্রেমে মগ্ন ছিল। প্রেম তো কোন সীমানা বা সীমাবদ্ধতা জানে না। অবশেষে প্রবীণরা এ ব্যাপারটি জেনে যায় এবং এতটাই ক্ষুব্ধ হয়ে যায় যে তারা এটাকে শেষ করার জন্য চরম পদক্ষেপ নিয়ে নেয়। তখন যুবকটি দ্রুত তার গোত্রের অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করে। এদিকে সাইরু এই ঘটনায় এতটাই কষ্ট পায় যে নিঃসঙ্গ সাইরু দুঃখে একদিন নির্জন জঙ্গলের পথে একা একা বেড়িয়ে পড়ে। বলা হয়, যে সাইরু সেখান থেকে আর কোনদিন ফেরেনি।

সাইরু হিল রিসোর্ট’র কাছেই মুকুট পাহাড় নামে পরিচিত একটি জায়গায় দুটি গাছ রয়েছে যা সাইরু আর ঐ যুবকের ভালবাসার স্মৃতি বহন করে চলেছে আজও। এখন সেই জায়গাটি সাইরু পয়েন্ট হিসাবে পরিচিত। রহস্যময় এবং অদ্ভুত প্রেমের এই গল্পের চরিত্রের নামেই ‘সাইরু হিল রিসোর্ট’র নামকরণ করা হয়। নিরিবিলি সময় কাটাতে চাইলে এর ছায়ায় বসে উপভোগ করতে পারেন প্রকৃতির সতেজতা।

সাইরু হিল রিসোর্ট’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হচ্ছে এর রেস্টুরেন্টের ‘ওপেন টেরেস’। নিমিষেই বেলা কাটিয়ে দেয়া যায় এখানে। এছাড়াও ভাল লাগে সুইমিংপুল এরিয়ার ক্যাফে করিডোরে সময় কাটাতে। সাঝবেলাতে পুরো রিসোর্টটা একবার ঘুরতে ভুলবেন না যেন। অদ্ভুত কিছু পাখির ডাক, ঝিঝি পোকার আওয়াজ মুগ্ধ করবে আপনাকে। দিনের বেলা অবশ্য আপনাকে মুগ্ধ করতে রয়েছে বাকবাকুম ডাক দেয়া অজস্র পায়রা।

নিজস্ব আর্কিটেকচার ফার্ম থাকায় স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য উদাহরণ ধরা যায় সাইরু হিল রিসোর্টকে। রেস্টুরেন্ট, অভ্যর্থনা স্থান এবং প্রত্যেকটি রুমের ডেকোরেশন এক কথায় মন ভুলানো। বিশেষ করে এক্সিকিউটিভ ও প্রিমিয়াম রুমের ইউনিক ডিজাইন এর বাথটাবসহ সুবিশাল বাথরুম সত্যিই রোমান্টিক করে তুলবে আপনাকে। আর টেরেস এর কথা নাইবা বললাম, এতোটা খোলামেলা আর সুন্দর পরিপাটি যে এখানে বসে এক কাপ চা চমৎকার এক মুহূর্ত তৈরি করবে নিশ্চিত। ভোরবেলা সূর্যোদয় আর সাঝবেলায় সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য আপনার চিরকাল স্মরণ থাকবে বৈকি।

সাইরুতে থাকার খরচ:

৪ ধরণের মোট ২০টি কটেজ রয়েছে। এখানে থাকা খাওয়ার জন্য আপনাকে একটু বড় অংকের টাকাই খরচ করতে হবে।

প্রিমিয়াম

খরচ ১৬০০০ টাকা।

সাইজ – ৬০০ স্কয়ার ফিট

কিং সাইজ বেড

প্রাপ্ত বয়স্ক ২ জন এবং অনূর্ধ্ব ৮ বছর বয়সী ২টি বাচ্চাসহ থাকা যাবে।

এক্সট্রা একটা বেড নেয়া যাবে। খরচ পড়বে ১৫০০ টাকা।

এক্সিকিউটিভ

খরচ ১৪০০০ টাকা

কিং সাইজ বেড

সাইজ – ৫৭০ স্কয়ার ফিটের রুম।

প্রাপ্ত বয়স্ক ২ জন এবং অনূর্ধ্ব ৮ বছর বয়সী ২টি বাচ্চাসহ থাকা যাবে।

সাঙ্গু ভিউ উইথ ট্যারেস

খরচ ১২০০০

সর্বোচ্চ ৩ জন

সাইজ – ৩৪০ স্কয়ার ফিট

১টি সিঙ্গেল ও ১টি বাঙ্ক বেড

সাঙ্গু ভিউ

খরচ ১০,০০০ টাকা।

সর্বোচ্চ ৩ জন।

সাইজ – ৩৪০ স্কয়ার ফিট

১টি সিঙ্গেল ও ১টি বাঙ্ক বেড

ডরমিটরি কটেজ

ভাড়া ২৫০০০ টাকা

১০ জন, ১০টি ফোল্ডিং বেড

সাইজ – ৭৫০ স্কয়ার ফিট

খাওয়া দাওয়া: ১ম দিন

সকালের নাস্তা: খিচুড়ি, ডিম ভুনা, চাটনি, চা, মিনারেল ওয়াটার অথবা পরটা, সবজি, ডিমের ওমলেট, চা, মিনারেল ওয়াটার।

দুপুরের খাবার: সাদা ভাত, রুই মাছ/মুরগির মাংস, ভর্তা, সবজি/শুটকি, ডাল, মিনারেল ওয়াটার।

রাতের খাবার: (ঐতিহ্যবাহী খাবার) বাতাবি রাইস, কোরাল মাছ, চিকেন চাটনি (বিশেষভাবে তৈরিকৃত মুরগী), গ্রীল্ড ভেজিটেবল, ডাল, মিনারেল ওয়াটার।

২য় দিন

সকালের নাস্তা: (বুফে নাস্তা) পরটা, সবজি, ডিম দুই প্রকার, বুটের ডাল, ফল, হালুয়া, কেক, ব্রেড, জেলি, বাটার, চা, কফি।

দুপুরের খাবার: (ঐতিহ্যবাহী ও দেশী খাবার-পাহাড়ী স্টাইল) (১৪ আইটেম), সাদা ভাত, আলু ভর্তা, টমেটো ভর্তা, বেগুন ভর্তা, শাকভাজি, পাহাড়ি সবজি, শুটকি, ব্যম্বু চিকেন, ছোট মাছ ফ্রাই, বড় মাছ ফ্রাই, ডাল গুগরি, সঞ্জি, পানি সরবর, সালাদ, মিনারেল ওয়াটার।

রাতের খাবার: পরটা (আনলিমিটেড), চিকেন বার-বি-কিউ, চিকেন উইথ ডাল, সফট ড্রিংকস, রাশিয়ান সালাদ, মিনারেল ওয়াটার।

সাইরুতে কীভাবে যাবেন এবং যাওয়া আসার খরচ:

১। ঢাকা থেকে সবচেয়ে সহজে বাসে যেতে পারেন সরাসরি বান্দরবান। যেখানে জনপ্রতি খরচ: নন এসি বাস (শ্যামলী/হানিফ/সৌদিয়া পরিবহন) (হিনো ২/২ সিট)- ৬২০ টাকা (ওয়ান ওয়ে)। নন এসি বিজনেস ক্লাস বাস (সেন্ট মার্টিন পরিবহন) (হিনো ১/২ সিট)- ৬৫০ টাকা (ওয়ান ওয়ে)। এসি ইকোনমি ক্লাস বাস (শ্যামলী/সেন্ট মার্টিন পরিবহন) (হিনো ২/২ সিট)- ৯৫০ টাকা (ওয়ান ওয়ে)। এসি বিজনেস ক্লাস বাস (শ্যামলী/সেন্ট মার্টিন/দেশ/হানিফ পরিবহন) (হুন্দাই/ভলভো ১/২ সিট)- ১৪০০/১৫০০ টাকা (ওয়ান ওয়ে)।

২। ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম যেতে পারেন তারপর সেখান থেকে সিএনজি তে বদ্দারহাট বাস টার্মিনাল এসে বান্দরবানগামী পুর্বাণী/পুরবী নন এসি বাসে সরাসরি বান্দরবান আসতে পারেন। আন্তঃনগর ট্রেনে ক্লাস ভেদে সর্বনিম্ন ৩৪৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১১৭৯ টাকা ভাড়া রয়েছে। সিএনজি জনপ্রতি ২০/৩০ টাকা। পুর্বাণী/পুরবী বাস জনপ্রতি ১২০ টাকা।

৩। ঢাকা থেকে বাই এয়ার চট্টগ্রাম যেতে পারেন তারপর সেখান থেকে রিজার্ভ এসি প্রাইভেট/মাইক্রোতে সরাসরি সাইরু রিসোর্ট যেতে পারেন। প্রাইভেট/নোয়াহ/হাই-এইস রিজার্ভ –৫৫০০/৬০০০ টাকা।

বাস বা ট্রেন ব্যবহার করে যারা আসবেন তারা বান্দরবান শহর থেকে যেভাবে যাবেন সাইরুতে: ২-৪ জন হলে সিএনজি নিতে পারেন- ভাড়া ৮০০-১০০০ টাকা (ওয়ান ওয়ে)। ৫-৭ জন হলে ল্যান্ড ক্রুইজার নিতে পারেন- ভাড়া ১৫০০-২০০০ টাকা (ওয়ান ওয়ে)। ৮-১৩ জন হলে মাহেন্দ্র খোলা জীপ নিতে পারেন- ভাড়া ২০০০-২৫০০ টাকা (ওয়ান ওয়ে)।

চাইলে নিজস্ব গাড়ী নিয়ে সাইরু হিল রিসোর্ট এ ভ্রমণ করতে পারেন সেক্ষেত্রে ডিজেল চালিত ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ী হওয়া উচিত এবং অবশ্যই পাহাড়ী রাস্তায় চালানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে নতুবা নিজস্ব গাড়ীতে না আসাই নিরাপদ।

পাশাপাশি দর্শনীয় স্থান

নীলগিরি

চিম্বুক

বগালেক

নীলাচল

স্বর্ণমন্দির

 

সোনালী/এমই

 

শর্টলিংকঃ