নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী

শিরিন সুলতানা কেয়া: করোনাভাইরাস আতঙ্কে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনতে শুরু করেছেন ক্রেতারা। সৃষ্টি হয়েছে অতিরিক্ত চাহিদা। এই সুযোগে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন বিক্রেতারা। নগরীতে প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে প্রতিদিন। সকালে এক দাম, তো বিকালে আরেক দাম দেখা যাচ্ছে বাজারে। অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছেন ইচ্ছেমতো। এতে নাভিশ^াস উঠছে ক্রেতাদের।

এদিকে বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার বাজারে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে গিয়ে সাহেব বাজারের এক চালব্যবসায়ীকে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করে। কিন্তু তারপরেও ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছেন। গতকাল শুক্রবারও নগরীর মাস্টারপাড়ার দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। গোলাম মুর্তজা ও আরিফুল ইসলাম নামে দুই পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে ৫ হাজার করে মোট ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিজিৎ সরকার। তারপরেও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতিরিক্ত চাহিদার বিপরীতে আমদানি কম থাকায় যেমন পণ্যের দাম বাড়ছে। আবার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছেন।
গতকাল শুক্রবার নগরীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাছ ও সবজি থেকে শুরু করে দাম বেড়েছে বিভিন্ন মসলারও। এলাচ এক সপ্তাহ আগেও ছিলো কেজিতে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা। কিন্তু এক সপ্তাহের ব্যবধানেই এই দাম বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। দাম বেড়েছে জয়ত্রী মসলার। কিছুদিন আগেও কেজিতে দাম ছিলো ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু এখন দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায়। জিরার দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ২০ টাকা করে। দু দিন আগে দাম ৩৬০ টাকা থাকলেও এখন হয়েছে ৩৮০ টাকা। দাম বেড়েছে ডালেরও। নতুন মসুর ডাল ৯৫ টাকা থাকলেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়ে হয়েছে ১১৫ টাকা। পুরাতন মসুর ডালের দাম ৯০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০০ টাকা। কালাই ডালের দামও বেড়েছে কেজি প্রতি ৫ টাকা করে। এখন ১১৫ টাকা কেজিতে কালাই ডাল কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
বিভিন্ন মসলা ও ডালের মতো বাড়ছে চালের দামও। আটাশ চাল আগে কেজি প্রতি ৪০ থেকে ৪২ টাকা থাকলেও এখন দাম ৪৫ টাকা। মিনিকেট ৪৮-৫০ টাকা থাকলেও এখন ক্রেতাদের ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। দাম বেড়েছে আতব, স্বর্ণা ও বাসমতি চালের। আতব চাল আগে ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি করলেও এখন ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। স্বর্ণা এখন কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে ৩৫ টাকা হয়েছে। বাসমতি চাল আগে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজিতে পাওয়া গেলেও এখন যাচ্ছে না। বাসমতি চালের দাম এখন কেজি প্রতি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।
চাল ও মসলার মতো দাম বেড়েছে মাছেরও। মাছবিক্রেতারা জানান, এই সপ্তাহে মাছের আমদানি কম। কিন্তু চাহিদা বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা বেড়েছে। তেলাপিয়া মাছ একদিন আগেও ১৪০ টাকা কেজিতে পাওয়া গেলেও একদিনের ব্যবধানে দাম বেড়ে হয়েছে ১৬০ টাকা। রুই মাছের দাম বেড়ে হয়েছে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। বোয়াল মাছের দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ১০০ টাকা। বোয়াল মাছ ৪০০ টাকা থাকলেও এখন দাম বেড়ে হয়েছে ৫০০ টাকা। কালবাউস এখন ৫০ টাকা বেশি দিয়ে ৩৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। মাছের মতো এখনো বাড়তি দাম মাংসের বাজার। খাসির মাংস ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ টাকা হয়েছে। গরুর মাংসের দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ২০ টাকা। আগে ৫২০ টাকা থাকলেও দাম হয়েছে ৫৪০ টাকা।
বাড়তি দাম সোনালি মুরগিরও। এক সপ্তাহ আগেও দাম কেজিতে ১৮০ টাকা থাকলেও এখন হয়েছে ২১০ টাকা। মাংসের মতো কিছুটা বেড়েছে সবজিরও দাম। আলু একদিনের ব্যবধানে ৪ টাকা দাম বেড়ে কেজিপ্রতি হয়েছে ২০ টাকা। করলা ও পটলের দাম একদিন আগেও ৬০ টাকা থাকলেও ২০ টাকা দাম বেড়ে হয়েছে ৮০ টাকা। সবজির মতো দাম বেড়েছে পেঁয়াজ ও রসুনের। পেঁয়াজ ৩৫ টাকা কেজি থাকলেও এখন হয়েছে ৬০ টাকা। তেমনি রসুন ৬৫ টাকা থেকে এখন ৮০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
বাজার করতে এসেছিলেন গৃহিণী আমেনা বেগম। তিনি বলেন, সবকিছুর দামই বেড়ে গেছে। আমার মনে হয়, করোনার আতঙ্কেই দাম হঠাৎ বেশি হচ্ছে। অতিরিক্ত পণ্য কিনতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরুৎসাহিত করা হলেও আমেনা বেগম বলেন, গাড়ি চলছে না। সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কখন না জানি বলে ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না। তাই বেশি করে মাছ ও মাংস কিনলাম।
বিক্রেতা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সবকিছুর আমদানি আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। তাই দাম বেড়ে যাচ্ছে। লোকজন করোনার ভয়ে বাসা থেকে বের হতে চাচ্ছে না। আমাদের বের না হয়ে উপায় নেই। তাই বের হচ্ছি। করোনার আতঙ্ক কমে গেলে আমদানি বাড়বে। তখন দামও কমবে।
চাল কিনতে গিয়ে আবদুল কাইয়ুম নামে এক ব্যক্তি বলেন, করোনা আতঙ্ক নয়। বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় ব্যবসায়ীরা জনগণের পাশে না থেকে ব্যবসায়ীরাই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। বাজারে এখন সকাল-বিকাল দামের পার্থক্য দেখা দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এখন প্রতি মুহুর্তে বাজার মনিটরিং করা দরকার। তা না হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে বিভাগীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সভা করা হয়েছে। তারা বাজার স্বাভাবিক রাখার প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজারে প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। সেইসঙ্গে চলছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। কেউ দাম বেশি নিচ্ছেন এমন প্রমাণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে বাজারে গিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য না কেনার আহŸান জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, দেশে সব ধরনের পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত আছে। করোনার আতঙ্কে অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি করলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেবে।

শর্টলিংকঃ