দূষণের কবলে পড়ছে পদ্মা

  • 56
    Shares


স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর পাশ দিয়ে তীব্র স্রোতে বয়ে চলা পদ্মা নদীও এখন দূষণের কবলে পড়ছে। নদীতে শহরের কঠিন ও তরল দুই ধরনের বর্জ্যই ফেলা হচ্ছে নির্দিধায়। এসব বর্জ্য গিয়ে মিশছে নদীর পানিতে। রাজশাহীতে যারা নদী নিয়ে গবেষকরা করছেন তারা শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, এখনই নদী দূষণ আর দখল থামাতে না বাড়লে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপনে এর প্রবল প্রভাব পড়বে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাড়ি ঘরের ভাঙা টাইলস, পরিত্যক্ত কংক্রিটের টুকরোর মতো শক্ত আর্বজনাও ফেলা হচ্ছে নদীর পাড় ধরে। এ ধরনের শক্ত উচ্ছিষ্ট জিনিস ফেলার পেছনে কাজ করছে নদী দখলের মনোবৃত্তি। এই দৃশ্য আরও স্পষ্ট শহর রক্ষা বাঁধ জুড়ে। ইতোমধ্যে শহর রক্ষা বাধে বেশ কিছু স্থাপনা তৈরি হয়ে গেছে।

শহরের ভেতর পদ্মার পাশের এলাকাগুলোর বাসাবাড়ি থেকে প্রতিদিনের গৃহস্থালি সব ময়লা-আর্বজনা নির্বিবাদে পদ্মা নদীতে ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে শহরের বুলনপুর, কেশবপুর, শ্রীরামপুর, কুমারপাড়া, সেখের চক, পঞ্চবটি, তালাইমারী ও শ্যামপুর এলাকা শহর রক্ষা বাঁধ ও নদীসংলগ্ন হওয়ায় বসতবাড়ির গৃহস্থালি সব ময়লা-আর্বজনাই পদ্মা নদীতে ফেলা হয়। এছাড়া পাঠানপাড়া, দরগড়াপাড়া, বড়কুঠি ও শ্রীরামপুরসহ শহর রক্ষা বাঁধের নানা স্থানে বিভিন্ন ধরনের রেঁস্তোরা গড়ে উঠেছে। এসব রেস্তোরাঁর সব ধরনের প্লাস্টিক ও পলিথিন এবং বর্জ্য সরাসরি পদ্মা নদীতে ফেলা হয়। এছাড়া শহরের পাঁচটি স্লুইস গেটের মাধ্যমে শহরের তরল বর্জ্যও পদ্মা নদীতেই পড়ে।

এসব বিষয় নিয়ে পরিবেশ অধিদফতরের অবশ্য মাথাব্যাথা দেখা যায়নি। অবশ্য ‘পরিবেশ দূষণের’ একটি ঘটনায় পদক্ষেপ নিতে চাইলেও গত তিন মাসে দুই বোতল পানিও পরীক্ষা করতে পারেনি সরকারি এই দপ্তরটি। গত আগস্টে কোরবানির ঈদে এক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মনের দুঃখে সেই চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলে দেন। খবর পেয়ে পরদিন পরে ছুটে যায় পরিবেশ অধিদপ্তর। চামড়া ফেলে তিনি পরিবেশের দূষণ করেছেন বলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু কতটুকু পরিবেশের ক্ষতি করেছেন তা জানতে ওই দুই বোতল পানি সংগ্রহ করা হয়। পানিটুকু বগুড়ায় পরীক্ষার কথা ছিল। এরপর বিভিন্ন সময় এই প্রতিবেদক পানির পরীক্ষার ফল জানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পরিবেশের অধিদফতরের স্থানীয় কর্মকর্তা বার বার জানিয়েছেন পানি পরীক্ষার সেই ফল তারা এখনও পাননি।

পরিবেশ অধিদফতরের যখন এই অবস্থা তখন শহরের পাশে নানা কারণে পানি দূষণ চলছে। নগরীর কুমারপাড়া এলাকার সুবাসী দাশ বলেন, সিটি করপোরেশনের ভ্যান কোনোদিন আসে সন্ধ্যার দিকে, কোনোদিন আসে রাত আটটার পর, আবার কোনো কোনো সময় ভ্যান খুঁজেই পাওয়া যায় না। এছাড়া গলির ভেতরে সিটি করপোরেশনের ভ্যান না ঢোকায় বাসাবাড়ির সব ময়লা পদ্মা নদীতে ফেলা হয়।

কেশবপুর পুলিশ লাইনের সামনের টি-বাঁধেও অবাধে ময়লা ফেলা হয়। বাঁধ জুড়ে পড়ে আছে প্লাস্টিকের কাপ, বোতল ও পলিথিন। এই বাধেই ১০ বছর ধরে বাঁধের ওপর পান বিড়ির দোকান করছেন গোলাম রসুল। তিনি জানান, অনেক দিন ধরেই পদ্মা নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এর আগে সিটি করপোরেশন ময়লা পরিস্কার করত মাঝে মাঝে। মাস ছয়েক ধরে করপোরেশনের লোকজন আর আসে না। আগে তবু পরিষ্কার করতো। এখন প্লাস্টিকের কাপ, বোতল ও পলিথিন ও কাগজের ঠোঙ্গা সব পদ্মা নদীতেই ফেলা হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান জানান, শহরের মধ্যে থেকে স্লুইস গেটের মাধ্যমে যে তরল বর্জ্য পদ্মা নদীতে পড়ে তার মধ্যে দরগাপাড়া এলাকায় তরল বর্জ্যের মধ্যে ক্ষতিকর উপাদান বেশি পাওয়া গেছে। এসব বর্জ্যের ফলে পদ্মা নদীর পানি দূষণ বাড়ছে। এর ফলে পদ্মায় জলজ জীবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। কারণ ইতিমধ্যে দেখা গেছে রাজশাহীর আরেক নদী পবা উপজেলার বারনই নদীতেও শহরের তরল বর্জ্য পড়ে ওখানকার জলজ জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে ফেলেছে। বারনইয়ের মাছসহ জলজ প্রাণী বহুলাংশে কমে গেছে।

সেভ দ্য ন্যাচারের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, পদ্মা নদীর জন্য সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিনের ব্যাগ। এসব নদীর পানির দূষণ বাড়াচ্ছে। পদ্মা নদীর জীবৈচিত্র্য কমিয়ে দিচ্ছে। আমরা পলিথিনের ব্যবহার কমানোর আন্দোলন করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আমি কয়েকবছর আগে পদ্মা নদীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইস গেটের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের যে তরল বর্জ্য যাচ্ছে তা গবেষণা করে দেখেছি তাতে দূষণের মাত্রা ব্যাপক। আর এটা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এর আগে যেমন পদ্মা নদীতে শুশুক দেখা গেলেও এখন আর দেখা যায় না। মাছের পরিমাণও বহুলাংশে কমে গেছে। এছাড়া পদ্মা নদীর পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। কারণ গবেষণা দেখা গেছে, পদ্মা নদীর পানি কৃষি কাজে ব্যবহারের ফলে কৃষি জমিতে ধাতব পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তিনি মনে করেন, এইজন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানার দূষক পরিশোধনকারী প্ল্যান্ট থাকা উচিত যা রাজশাহীতে নেই।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ জানান, পাঁচটি স্লুইচ গেটের মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনের তরল বর্জ্য পদ্মা নদীতে পড়ে। তবে বর্ষাকালে পদ্মা নদীর পানি বেড়ে গেলে তখন গেট বন্ধ থাকে যাতে পদ্মার পানি শহরে প্রবেশ না করে। শহর রক্ষা বাধের সবচেয়ে বেশি দখলের ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় বুলনপুর থেকে শ্যামপুরে। এই অংশে শহর রক্ষা বাঁধ দখল করে নানা স্থায়ী স্থাপনা যেমন গড়ে উঠেছে বাঁধেও ভ্রাম্যমাণ অস্থায়ী স্থাপনাও বাড়ছে দিনকে দিন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু বলেন, নদীতে সলিড কিংবা লিকুইড কোনো বর্জ্য ফেলা উচিত না। এটা আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ লিকুইড বর্জ্য পানিতে মিশে বায়োলজিক্যাল অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি করে। এতে জলজ প্রাণী মারা যায়। আর সলিড বর্জ্য ফেলা হলে প্রাকৃতিক পরিবেশ আর স্বাভাবিক থাকে না। তাই অতি দ্রুত এসব বন্ধ করা দরকার।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ