দুর্নীতিতে জড়িতরা আবারও পাচ্ছেন পশ্চিম রেলের কাজ

  • 25
    Shares

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন কাজ মানেই ঠিকাদার আফসার বিশ্বাস-আশরাফ বাবু। আফসার বিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করেন ঠিকাদারদের একটি সিণ্ডিকেট। আশরাফ বাবু নিয়ন্ত্রণ করেন বাকি অংশ। আফসার বিশ^াসের একক দৌরাত্ম নিয়ে গত বছরের ২০ অক্টোবর রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। আর বছর খানেক আগে আশরাফ বাবু সিণ্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেছিলেন পশ্চিম রেলের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলী।

দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ থাকা এসব ঠিকাদাররাই আবারও নয়টি কাজ পেতে যাচ্ছেন। এ দুই সিণ্ডিকেট নয়টি কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। তাদের কাজ দিতে টেন্ডার কমিটির সুপারিশ পাঠানো হয়েছে রেলওয়ের মহাপরিচালকের দপ্তরে। এখন আফসার সিন্ডিকেটকে কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। রেল মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার নির্দেশে পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রধান প্রকৌশলী কারসাজি করে এদের কাজ দিচ্ছেন বলে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য ঠিকাদাররা অভিযোগ করছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেলের জিকে শামীম খ্যাত ঠিকাদার আফসার বিশ^াসের একক দৌরাত্ম নিয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্যরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) শামসুজ্জামানকে ভর্ৎসনা করেছিলেন। কারণ, আফসার সিন্ডিকেটকে রেলের শত শত কোটি টাকার কেনাকাটা ও কাজ নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়ার একাধিক অভিযোগ সংসদীয় কমিটিতে জমা পড়েছিল। শুধু তাই নয়, কেনাকাটায় ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগও পড়েছিল কমিটিতে।

আফসারকে দেওয়া সব টেন্ডার পর্যালোচনা করে কমিটির সদস্যরা দেখতে পান, প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। আফসার নিজের ও আত্মীয় স্বজনের নামে গত কয়েক বছরে বাগিয়েছেন শত শত কোটি টাকার কাজ। ডিজির বন্ধু পরিচয়ে তার এই দৌরাত্ম নিয়ে সংসদীয় কমিটি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। অনিয়ম বন্ধে ব্যবস্থা নিতে রেল সচিব ও ডিজিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। করেছিলেন তদন্ত উপ-কমিটি। কিন্তু দুদকও অভিযোগগুলো অনুসন্ধান করছে। তবে এখনও বিশেষ কিছু হয়নি। এখনও আফসার সিণ্ডিকেটের সমান দৌরাত্ম পশ্চিম রেলে। বাগিয়ে নেন কোটি টাকার কাজ।
অন্যদিকে ব্যালাষ্ট (পাথর) সরবরাহে অনিয়মের দুদকের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে আশরাফ বাবু সিণ্ডিকেটের ব্যাপারে। এই সিণ্ডিকেটও এবার পেতে যাচ্ছেন অন্তত পাঁচটি কাজ। রেলের ঠিকাদারদের একটি অংশ বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাজ না করেই বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে দুদকে। এরপরও দুনীতিতে জড়িত একইসব প্রতিষ্ঠানকে নয়টির মধ্যে পাঁচটি গ্রুপের কাজ ভাগাভাগি করে দেওয়া হয়েছে। রেল কমকর্তারাও ইজিপিতে কারসাজিতে জড়িত আছেন।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম রোববার (৪ এপ্রিল) সকালে বলেন, কেনাকাটার দুর্নীতির বিষয়টি দুদকের প্রধান কার্যালয় অনুসন্ধান করছে। এছাড়া পাথর সরবরাহে অনিয়মের যে অভিযোগ হয়েছিল সেটিরও অনুসন্ধান করছে প্রধান কার্যালয়। অনুসন্ধানের অগ্রগতি বিষয়ে তিনি জানেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি পশ্চিম রেলের ইজিপি টেন্ডারে গুরুতর কারসাজির মাধ্যমে আফসার বিশ^াসের বিশ^াস কনষ্ট্রাকশানকে প্রায় ৪ কোটি টাকার ব্যালাষ্ট (পাথর) সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়েছে । আরও প্রায় দুই কোটি টাকার আরেকটি কাজ দেওয়া হয়েছে আফসার সিন্ডিকেটের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল হাইটেক ইঞ্জিনিয়ারিং নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে। অথচ ই-জিপি টেন্ডারে আফসার টেন্ডারের আবশ্যিক শর্তাবলী পূরণ করেননি। রেলের পশ্চিমাঞ্চলের বঙ্গবন্ধু পূর্ব থেকে টাঙ্গাইলের মহেড়া পর্যন্ত রেল ট্র্যাকে বালাষ্ট সরবরাহের ১ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার টাকা (টেণ্ডার কোড নম্বর-৫৩৩৫২৬) এবং লালমনিরহাট-কাউনিয়া রেল ট্র্যাকে বালাষ্ট সরবরাহের ১ কোটি ৬০ লাখ ৮০ হাজার টাকার (টেণ্ডার কোড নম্বর-৫৩৩৫২১) দুটি কাজ আফসার বিশ^াসকে দেওয়ার সুপারিশ করেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের টেণ্ডার কমিটি।

অন্যদিকে সান্তাহার-তালোড়া পর্যন্ত ট্র্যাক সংস্কারে ব্যালাষ্ট সরবরাহের জন্য ১ কোটি ৯০ লাখ টাকার (টেন্ডার কোড নম্বর-৫৩৩৫২৩) দেওয়া হয়েছে আফসার সিণ্ডিকেটের আরেক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল হাইটেক ইঞ্জিনিয়ারিংকে। অভিযোগ মতে, এসব প্রতিষ্ঠান টেন্ডারের আবশ্যক শর্তাবলী পুরণ করতে না পারলেও অদৃশ্য তদবিরের কারণে এই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সুপারিশ দিয়েছে টেন্ডার কমিটি।

অভিযোগে আরও জানা গেছে, ইজিপি টেন্ডারে কারচুপির সুযোগ না থাকলেও টেন্ডার কমিটি আফসার সিন্ডিকেটকে যোগ্য উল্লেখ করে সুপারিশ দিয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, ইজিপি টেন্ডারের নিয়মানুযায়ী এসব কাজের জন্য আফসারের বিশ^াস কনষ্ট্রাকশান নিম্নদর দিলেও টেন্ডারের আবশ্যিক শর্তানুযায়ী অন্যান্য নথিপত্র ও নির্দিষ্ট টাকার অভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতার সনদসহ সহায়ক সার্টিফিকেট অনলাইনে সংযুক্ত করেননি। বিশেষ করে অনুরূপ কাজের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট অংকের কাজ সম্পাদনের অভিজ্ঞতা, ব্যাংক সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন নথিপত্র ই-জিপি পদ্ধতির এই টেন্ডারে সংযুক্তির কথা বলা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টেন্ডারের শর্তাবলী অনুযায়ী যে কোন একটি নথি অনলাইনে জমা না করলেও সেই দরপত্রদাতার প্রস্তাব সরাসরি বাতিল বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু পরবর্তীতে কেউ চাইলেও আর কোনভাবেই অনলাইনে বা সরাসরি মাধ্যমে বাদপড়া নথিপত্র দরপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারেন না। ইজিপির কোড নম্বর দিয়ে অনলাইনে প্রবেশ করে অংশগ্রহণকারী সকল ঠিকাদার পরস্পরের দেওয়া দর ও দাখিলকৃত নথিপত্র চেক করে দেখতে পারেন। ইজিপিতে একবার নথিপত্র জমা করলে তা দ্বিতীয়বার সংশোধনেরও সুযোগ থাকে না। কিন্তু টেন্ডার কমিটি ইজিপির শর্তাবলী লঙ্ঘন করে তিনটি কাজ আফসার সিন্ডিকেটকে দেয়ার সুপারিশ দিয়েছে।

বিশ^াস কনষ্ট্রাকশানের সত্ত্বাধিকারী আফসার বিশ^াস অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, তিনি রেলের একজন স্বনামধন্য ঠিকাদার। তিনি রেলের ইঞ্জিনও সরবরাহ করেছেন। ব্যালাষ্টের যে দুটি গ্রুপের কাজ তিনি পেয়েছেন সেগুলোর মতো সাধারণ কাজের যোগ্যতা তার আছে। রাজশাহী রেলভবন কেন্দ্রীক একটি ঠিকাদারি সিণ্ডিকেট নিজেরা সব কাজ নিতে চেয়েছিল ভাগাভাগি করে। সেটা করতে না পেরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম ফিরোজী বলেন, এই টেন্ডারগুলোর প্রক্রিয়া তিনি যোগদানের আগেই সম্পন্ন হয়েছে। সুতরাং তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না। এদিকে টেন্ডার কমিটির সদস্য বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (পাকশী) শহিদুল ইসলাম বলেন, ইজিপি টেন্ডারে কারসাজির সুযোগ নেই। নয় গ্রুপের এসব কাজ কাগজপত্র দেখে যাঁরা যোগ্য, তাঁদেরকে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ^াস কনষ্ট্রাকশানও দুটি গ্রুপের কাজে যোগ্য হয়েছেন। ফলে তাকে সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে টেন্ডার কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ব্রীজ) লিয়াকত শরীফ খান কথা বলতে রাজি হননি।

পশ্চিম রেলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আল-ফাত্তাহ মোহাম্মদ মাসউদুর রহমান এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেল সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক। অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিশ^াস কনষ্ট্রাকশানের বিরুদ্ধে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ক্ষোভের বিষয়টি তিনি জানেন না। আর ইজিপিতে তাঁর নথিপত্রে কোন ঘাটতি ছিল না। অন্যরাও যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ পেয়েছে।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ