দুর্গাপুরের যুগীশো গণহত্যা/ শহিদ পরিবারগুলোর খোঁজ রাখে না কেউ

এম আর মিজান, দুর্গাপুর থেকে: দুর্গাপুর উপজেলার দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়নের যুগীশো পালশা গ্রামের একটি নির্জন বাঁশ ঝাড়ের নিচে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় মুক্তিকামী ৪২ জনেরও বেশি হিন্দু স¤প্রদায়ের লোককে হত্যা করা হয়। রাজাকার আলবদরদের সহায়তায় নৃশংসভাবে হত্যা করে ওই বাঁশ ঝাড়ের নিচে গণকবর দিয়ে রাখে পাকিস্তানি বাহিনী।
বর্তমানে এ ৪২ শহিদদের পরিবারের লোকজন মানবেতর জীবন যাবন করছেন। শহীদদের এখনও ৫জন জীবিত বিধবা স্ত্রীদের দিন কাটছে অর্ধাহারে অনাহারে। সেই সময়ে মুজিব সরকারের আমলে ১বানডিল টেউটিন ও ২টি করে কম্বলই জুটেছে এসব শহীদ পরিবারে। তারপর আর কেউ খোজ রাখেনি তাদের। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরে ২০০৬ সালের ৯ এপ্রিল জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ খনন করে শহীদদের বেশকিছু কঙ্কাল উদ্ধার করে। কিন্তু দীর্ঘদিন হলেও গনকবর সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি শহিদ পরিবারগুলো কোন শহিদ ভাতাও পায়নি। তারা শুধু পেয়েছে গণকবরের শহিদ স্বজনদের অচেনা কঙ্কাল। যাদের জীবনের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি সোনার বাংলা অথচ আগামী প্রজন্মের কাছে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিচ্ছে না কেউই।
সূত্র বলছে, ১৯৭১ সালের ২২ অক্টোবর দুপুর অনুমান সাড়ে ১২ টা। ঠিক সে সময় অতর্কিত ভাবে পাক-হানাদার বাহিনী ঢুকে পড়ে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার যুগীশো ও পালশা গ্রামে। পাক-সেনাদের সাথে থাকা শান্তি কমিটির ইউনিয়ন সমন্বয়কারী আব্দুল আজিজ সরকারের ডাকে সাঁড়া দিয়ে ওই গ্রামের সকল মানুষ এসে জড়ো হয় স্থানীয় একটি বাঁশ ঝাড়ের নিচে। এরপর পাক বাহিনী মুসলমান ও হিন্দু ব্যক্তিদের আলাদা করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মাটিতে উপোড় করে শুইয়ে দেয়। আর মুসলমানদের সেখান থেকে চলে যেতে বলে। এর কিছুক্ষণ পরেই মেশিন গান দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করা হয় সেখানে শুয়ে থাকা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের। এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাক বাহিনী চলে গেলে সেখানে ৪২ জন হিন্দু ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। এরপর সেদিন ওই বাঁশ ঝাড়ের নিচেই পাক-বাহিনীর হাতে শহিদ হওয়া ৪২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে গণকবর দেয়া হয়। আবেগ আপ্লুত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া নারকীয় তাÐবের বর্ণনা দিতে গিয়ে এমন বলেন সেদিনের সেই ঘটনায় নিহত যুগীশো গ্রামের শহীদ বিভারণ চন্দ্র প্রামাণিকের ছেলে বীরেন্দ্রনাথ প্রামাণিক।
এ গণকবরের যে সকল শহিদদের পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হলেন- যুগিশো গ্রামের জ্যোতিন সরকার, সুধীর চন্দ্র প্রামানিক, তারণ প্রামানিক, বিভারণ চন্দ্র প্রামানিক, নিবারণ চন্দ্র, কার্ত্তিক চন্দ্র, প্রান্ত সরকার, যুগীন্দ্রনাথ মন্ডল, রুপলাল প্রামানিক, নগেন কর্মকার, শীতল দাস, যুদুনাথ সরকার, রঘুনাথ সরকার, কালিরঞ্জণ সরকার, রামপ্রসাদ, রামেশ সরকারসহ ৪২জন হিন্দু লোকদের নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে নিভারণের স্ত্রী নিয়তী বালা, নিবারণের স্ত্রী শ্রীসুন্দর রাণী, নগেন কর্মকারের স্ত্রী যমুনা বালা ও শীতলের স্ত্রী পঞ্চমী এখন দিন কাটাচ্ছেন অর্ধাহারে অনাহারে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এসব বিধবা নারীর দেশ স্বাধীনের ৪৬ বছর পরও জোটেনি কোন সহযোগিতা।
জ্যোতিন সরকারের পুত্রবধূ অলোকা সরকার জানালেন, তার ৪টি কন্যা সন্তান রয়েছেন। এদের মধ্যে বড় মেয়ে বি.এ পাস চাকরি জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। বর্তমানে ৫ সদস্যর পরিবারে বোঝা তার বহন করতে হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার যথাযোগ্য মূল্যায়ন করলেও এসব শহিদ পরিবারগুলো যেন আজও অবহেলিত। তার পরিবারের লোকজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাবন করছেন তিনি।
সুধীর চন্দ্র প্রামানিকের ছেলে বীরেন্দ্র নাথ প্রামানিক জানান, বর্তমানে আর্থিক সংকটে আর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছেন। কেউ তাদের খোঁজ-খবর নিচ্ছে না। অর্থাভাবে খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন কাটছে। দীর্ঘদিন পরে শহিদদের স্বজনরা যুগীশো পালশার বাঁশ ঝাড়ের নিচে গণকবরে কঙ্কাল পেলেও তারা অদ্যবধি এ পরিবারগুলো এখনও পায়নি শহিদ ভাতা। অচিরেই যাতে কালের সাক্ষী গণকবরের স্মৃতি সংক্ষণের কাজ দ্রæত শুরু করা হয় এবং পরিবারগুলো শহিদ ভাতা পায় সে জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সুদৃষ্টি এবং হস্তক্ষেপ কামনা করেছে শহিদ পরিবারগুলো।

শর্টলিংকঃ