দুই পা ছাড়াই জীবনযুদ্ধে পলাশ

  • 85
    Shares


স্টাফ রিপোর্টার: রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল কিশোর পলাশ। ঝড়বৃষ্টি ছাড়াই হঠাৎ তার ঘাড়ের ওপর ছিঁড়ে পড়ল বিদ্যুতের তার। এরপর তার জড়িয়ে পড়ল দুই পায়ে। পলাশের যখন জ্ঞান ফিরল তখন সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে। এ দুর্ঘটনায় পলাশ তার দুটি পা হারালো।

এসব ১০ বছর আগের কথা। এখন পলাশের বয়স ২২। দুটি পা হারিয়েও পলাশ এসএসসি পাস করেছেন ২০১৫ সালে। ২০১৯ সালে উত্তীর্ণ হয়েছেন এইচএসসি। পড়াশোনার মাঝেও কম্পিউটারের প্রশিক্ষণ নিয়ে কিছু দিন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেছেন। এক সপ্তাহ আগে যোগ দিয়েছেন ফুডপান্ডার রাইডার হিসেবে। দুই পা ছাড়াই পলাশকে নামতে হয়েছে কঠিন এই জীবনযুদ্ধে।

তার পুরো নাম জাহিদুল ইসলাম পলাশ। বাড়ি রাজশাহী মহানগরীর ধরমপুর আলমের মোড় বৌবাজার এলাকায়। বাবার নাম নাজির আলী। পেশায় তিনি রিকশাচালক। তিন ভাইয়ের মধ্যে পলাশ মেজ। বড় ভাই বিয়ের পর থেকে আলাদা। আর ছোটভাই এসএসসি পরীক্ষার্থী। অভাব-অনটনের সংসারে বাবাকে সহায়তা করতে জীবনযুদ্ধে নেমেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী পলাশ।

ফুডপান্ডার রাজশাহীর শিফট ম্যানেজমেন্ট এক্সিকিউটিভ রকিবুল হাসান রবিন বলছিলেন, ‘আমাদের অফিস চারতলায়। পলাশ একা একাই অফিসে উঠে এসে বলে- আমি রাইডিং করতে চাই। তার কথা শুনে তো আমি অবাক। আমি প্রথমে ধরেই নিই যে তার দ্বারা এটা কোনভাবেই সম্ভব না। কারণ, রাইডিং কাজটা মোটেও সহজ নয়। কিন্তু সে বলে, আমি পারবই। তার আত্মবিশ^াস দেখে আমি আমার সহকর্মীদের বোঝাই। তাকে কাজটা দেই। এখন সে অন্যদের তুলনায় খারাপ করছে না। অন্যরা যদি ১০টা অর্ডার ডেলিভেরি করে, পলাশ করে ৮টা।’

সম্প্রতি নিউমার্কেট এলাকায় একটি রেস্তোরাঁর সামনে পলাশকে পাওয়া যায়। কথা হয় সেখানেই। পলাশ জানালেন, দুর্ঘটনার পর তিনি হাসপাতালে সাতমাস ভর্তি ছিলেন। তার বাম পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়েছে। কাটতে হয়েছে ডান পায়ের তিনটি আঙ্গুল। এ পা কাজ করে না। কোন অনুভূতি নেই। আগে তিনি হুইল চেয়ারে চলতেন। পরে তৈরি করেন একটি ব্যাটারিচালিত ছোট ভ্যান। সেই ভ্যান নিয়েই তিনি হয়েছেন ফুডপান্ডার রাইডার।

পলাশ বলেন, ফুডপান্ডার রাইডারদের দেখতাম তারা খাবার নিয়ে ছুটে চলছেন। আমিও উৎসাহী হই। ফুডপান্ডার রাজশাহী অফিসে যাই। একজন আমাকে বললেন, তুমি পারবা না। যখন রেস্টুরেন্টে খাবারের অর্ডার হবে, তখন তুমি কী করে তিনতলা-পাঁচতলায় উঠবা? আমি বললাম যে, আমার অভ্যাস আছে। কোন প্রবলেম নাই। আমার কথা শুনে তিনি বললেন, আচ্ছা, তুমি পরে আসো। এ কথা শুনে আমার মনটা অনেক ছোট হয়ে গেল। হতাশায় পড়ি। পরে ম্যানেজার এসে বললেন, অবশ্যই তুমি পারবে। কেউ চাকরি না দিলেও তোমাকে আমি চাকরি দেব।

এরপর কাগজপত্র-ছবি জমা দেন। ফুডপান্ডার ব্যাগ, হেলমেট আর পোশাক নেয়ার জন্য ৭৫০ টাকা দিতে হয়। এই টাকা ছিল না পলাশের। বলেছিলেন, কাজ করে তিনি টাকা শোধ করে দেবেন। পলাশের মনোবল দেখে ফুডপান্ডার কর্মকর্তার মন গলে যায়। টাকা ছাড়াই তাকে পোশাক আর ব্যাগ দেন। শুরু হয় খাবার নিয়ে পলাশের ছুটে চলা। এক শিফটে তিনঘণ্টা করে কাজ করেন তিনি। প্রথম সপ্তাহে ৪৬টি অর্ডার ডেলিভেরি দিয়েছেন। পারিশ্রমিক পেয়েছেন ৮৫৭ টাকা।

পলাশ জানালেন, তাকে ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষ খুব সহযোগিতা করেছে। প্রতিটি রেস্তোরাঁয় বলে দেয়া হয়েছে তিনি গেলে যেন রেস্তোরাঁর কর্মীরা রাস্তায় খাবার নিয়ে এসে তার হাতে দিয়ে যান। পলাশকে রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকতে হয় না। অনেক সময় অন্য রাইডাররাও তাকে রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে খাবার এনে দেন। খাবার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পলাশ ছোটেন গ্রাহকের কাছে। প্রথম দিন মুঠোফোনের বিভিন্ন সেটিং বুঝতে সমস্যা হলেও এখন কোন সমস্যা নেই। চিনে ফেলেছেন শহরের সব অলি-গলি আর পথঘাটও। তাকে দেখলে গ্রাহকেরা খুব খুশিই হন।

পলাশ পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। নাম ‘আশার আলো প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা’। করোনাকালে এই সংগঠনের ৯০ জন প্রতিবন্ধী সদস্যকে খাদ্যসহায়তার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। পলাশ বলছিলেন, তিনি চান এই সংগঠনটিকে কেউ সহায়তা করুক। তাহলে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন হবে। পাশাপাশি নিজে ভাল কোথাও কাজ করতে চান বলে জানান।

কথায় কথায় সন্ধ্যা নেমে আসে। পলাশ মুঠোফোন দেখে বললেন, অর্ডার এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রেস্তোরাঁর কর্মী পলাশকে খাবার দিয়ে গেলেন। ব্যাটারির ভ্যান স্টার্ট দিলেন পলাশ। নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকার একটি ক্লিনিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। মুঠোফোনে কল দিলে একজন তরুণ এসে খাবারটি সংগ্রহ করলেন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক তরুণী। পলাশকে দেখে বললেন, ভাইয়া আপনার সঙ্গে একটা ছবি তুলতে চাই। পলাশ না করলেন না। ছবি তোলা শেষ হলে পলাশ আবার তার গাড়ি স্টার্ট দিলেন। হারিয়ে গেলেন ব্যস্ত রাস্তার ভিড়ের মাঝে।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ