থমকে নিয়োগ, বাড়ছে বেকার

অনলাইন ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর জুবায়ের হোসেন চার বছর ধরে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পরীক্ষা দিলেও চাকরি পাননি। আগামী বছরের জুনে তার বয়সসীমা শেষ হবে। গেল এক বছর অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন। কিন্তু করোনার কারণে একটিরও পরীক্ষা হয়নি। কবে হবে সুনির্দিষ্ট কিছু বলছে না সরকার। ফলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি।

করোনাসংকটে নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে থাকায় জুবায়েরের মতো উদ্বিগ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করা শরিফুল ইসলাম। চাকরিপ্রত্যাশী এই দুই তরুণ জানান, করোনা পরিস্থিতিতে তাদের নিয়োগ প্রস্তুতির পড়ালেখা লাটে উঠেছে। গত চার বছরের প্রতি মাসে আবেদনসহ আনুষঙ্গিক যে ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, তা বৃথা যেতে বসেছে। চাকরির বয়সসীমা শেষ হতে চলায় আশাও ক্ষীণ হচ্ছে। পারিবারিক ও মানসিক চাপে হতাশা বাড়ছে বলে জানান তারা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ হলেও যুব বেকারত্ব ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। করোনাভাইরাসে এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। আগস্টে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনায় বিশ্বে প্রতি ছয়জনে একজন বেকার হলেও বাংলাদেশে এই হার প্রতি চারজনে একজন (২৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ)। গত ফেব্রুয়ারি থেকে এই বেকারত্ব বাড়ছেই। করোনা সংক্রমণের আগে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্ব প্রতি ১০০ জনে ১২ জন থাকলেও এখন তা বেড়ে প্রায় ২৫ জন হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, করোনাসংকটের ছয় মাসে বাংলাদেশে প্রায় ১৭ লাখ বা ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী বেকার হয়েছেন। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, মহামারীতে বেকাররা তিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একদিকে ছাঁটাই হচ্ছেন। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চাকরিতে প্রবেশ ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে।

ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীরা সঙ্গে আলাপকালে জানান, কর্মবাজারে প্রবেশ করা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জের। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে থাকায় মানসিক চাপ বাড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাবির ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স করা এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বড় প্রতিষ্ঠানে পড়া মানে সবার মধ্যে প্রত্যাশা বাড়ানো ভালো চাকরির। কিন্তু দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়ায় বাড়ি যেতে পারি না। স্বজন ও প্রতিবেশীরা কটু কথা বলেন। বিসিএস দিয়ে ক্যাডার কিংবা অন্য ভালো চাকরি পাওয়া সহপাঠীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। ফলে বাড়তি চাপ ও গভীর হতাশা কাজ করে। করোনা এসে সব আশা শেষ করে দিচ্ছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অমিত মাহবুব বলেন, ‘সরকারি চাকরির চেষ্টা যারা করছেন, তাদের লড়াইটা একটু বেশি। পরিবার থেকে টাকা নিতে পারে না, টিউশনি করে চলতে হয়। তাও একভাবে জীবন চলে যায়। কিন্তু করোনায় সব বন্ধ। উল্টো বাড়ি ফিরে পরিবারের বোঝা হতে হচ্ছে, এটা কতটা কষ্টের বোঝানো সম্ভব নয়।’

প্রস্তুতিতে ধস, বয়সসীমা নিয়ে উদ্বেগ : চাকরিপ্রত্যাশীরা জানান, করোনাকাল দীর্ঘ হওয়ায় তাদের চাকরির প্রস্তুতির পড়ালেখায় ধস নেমেছে। বয়সসীমা শেষ হতে যাওয়া শিক্ষার্থীরা বেশি শঙ্কিত। যদিও মার্চে যাদের সরকারি চাকরি পাওয়ার বয়স শেষ হয়ে গেছে, করোনার কারণে তাদের পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।

ঢাবির ছাত্র শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘করোনা এতদূর গড়াবে, ভাবনাতেও আসেনি। ফলে বইপত্র না নিয়ে গ্রামে এসেছি। এই কয় মাসে পড়ালেখা বলে কিছু হয়নি। এখন ৪১তম বিসিএস কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালকের পরীক্ষা হলে অনেকেই টিকতে পারবে না।’ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বয়সসীমা শেষ হতে চলা শিক্ষার্থীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। করোনায় সব প্রস্তুতি ভেঙে পড়েছে। অনেকে বেসরকারি খাতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেখানেও মহামন্দা।’

অস্থির বেসরকারি খাত : চাকরির বাজার নিয়ে সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার প্রভাবে বাংলাদেশে চাকরির বাজারে ধস নেমেছে। গত বছরের মার্চের তুলনায় এ বছরের মার্চে চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে ৩৫ শতাংশ। এপ্রিলে এই হার ৮৭ শতাংশ। গত এপ্রিলে পোশাক ও শিক্ষা খাতে ৯৫, উৎপাদনমুখী শিল্পে ৯২ ও স্বাস্থ্য খাতে ৮১ শতাংশ কম চাকরির বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। তথ্য-প্রযুক্তিকে আগামী দিনের সম্ভাবনা ধরা হলেও সেখানে চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে ৮২ শতাংশ। আর এনজিওতে ৬৪ শতাংশ চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে। শিক্ষিতদের পাশাপাশি শ্রমজীবীদের মধ্যেও বেকারত্বের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। করোনায় তৈরি পোশাক শিল্পে লাখো শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, ‘ধীরগতিতে হলেও অর্থনীতির পুনর্জাগরণ থেমে নেই। ফলে সংকট অনেকটা কমে আসবে। এ জন্য বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বাড়াতে হবে।’

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ