ঢাকায় কেন শীত নেই

  • 10
    Shares

অনলাইন ডেস্ক: রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতুর পর কেরানীগঞ্জ উপজেলা শুরু। ব্রিজের পাশের ওই জনপদে সন্ধ্যা নামতেই কনকনে শীত অনুভূত হয়। অথচ ঢাকায় তার ছিটেফোঁটাও নেই।

পৌষ মাস এখন যায় যায় করছে। এক সপ্তাহ পরই শুরু হবে মাঘ। অথচ এখনই বসন্তের মতো গরম-গরম ভাব ঢাকায়। উত্তরের জনপদসহ দেশের গ্রামাঞ্চলে শীত থাকলেও রাজধানীতে দিনে প্রখর রোদ, রাতেও উষ্ণতা। এই পরিস্থিতিতে আবহাওয়া ও পরিবেশবিদরা রীতিমতো উদ্বিগ্ন। ঢাকায় তাপমাত্রা না কমার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তলিয়ে দেখছেন তারা। তাছাড়া এর অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে ঘনবসতি, প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প গাছগাছালি এবং যান্ত্রিক যানবাহনের কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবেশকে উষ্ণ করছে। এতে দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে ঢাকায় উষ্ণতা সব সময় বেশি থাকে। তাপমাত্রার বৃদ্ধি ঢাকা নগরীতে ক্রমেই অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

শীতের দেখা নেই : আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় শেষ কনকনে শীতের দেখা মিলেছিল ২০১৩ সালে। ওই বছরের ৯ জানুয়ারি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি। এরপর ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি সারাদেশে হাড়কাঁপানো শীত পড়লেও ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও হয় ৯ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কিন্তু বিশাল এই নগরে শীত এবার এর ধারেকাছেও নেই।উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় যখন শৈত্যপ্রবাহ চলছিল, তখনও ঢাকায় কনকনে শীত ছিল না। গত ১৮ থেকে ২৩ ডিসেম্বর এবং ২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ এবং যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। ১৯ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামের রাজারহাটে দেশের সর্বনিস্ন তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। ডিসেম্বরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে শূন্য দশমিক চার এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে শূন্য দশমিক এক ডিগ্রি সেলসিয়াস কম ছিল। তবে এবার ঢাকার তাপমাত্রা এখনও ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি। বরং রাজধানীর তাপমাত্রা বেড়েই চলছে। সর্বশেষ গতকাল বুধবার সকালে ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

যে কারণে উষ্ণতা :বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্রুততম বর্ধমান মেগাসিটি। এর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। ১৯৯০ সালে যা ছিল ৬০ লাখ। ২০০৫ সালে ছিল এক কোটি ২০ লাখ। ঢাকা মহানগরীর পরিবেশ, জনজীবন ও জনস্বাস্থ্য বিপর্যস্ত হচ্ছে মূলত অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী-খাল, জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল দখল ও ভরাট, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান দখল, মহানগরের চারপাশের নদীদূষণ, ভূগর্ভস্থ পানির অপরিকল্পিত উত্তোলন, বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের মনিটরিংয়ে দেখা যায়, গত ১০০ বছরে দেশের তাপমাত্রা ০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বাড়লেও ঢাকায় বেড়েছে ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আবহাওয়াবিদ আবদুর রহমান বলেন, অবকাঠামোগত কারণে ঢাকায় শীত অনুভূত হচ্ছে না। এ শহরে এখন মধ্যরাত পর্যন্ত প্রচুর যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। এসব যান থেকে প্রচুর ধোঁয়া বের হয়। শহরে গাছপালাও কমে গেছে। তা ছাড়া বড় বড় ভবনের কারণে বায়ুপ্রবাহ বেশ কম।

বিস, অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণার তথ্যমতে, ঢাকা শহরে গ্রীষ্ফ্ম ও বর্ষায় গ্রামের থেকে সাড়ে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেশি থাকে। ঢাকা শহরের দালানগুলো এমন ভাবে তৈরি যে, বাতাস যাতায়াতের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। নির্মাণ উপকরণ তাপ ফাঁদ এবং শীতল প্রযুক্তির উচ্চ ব্যবহারের ফলে অপরিকল্পিত অঞ্চলের তুলনায় গুলশান ও উত্তরার মতো পরিকল্পিত অঞ্চলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার হার বেশি।

নগর পরিকল্পনাবিদ মুসফেরা জাহান শর্মি বলেন, লকডাউনে ঢাকার অভিজাত আবাসিক এলাকায় এসির ব্যবহার না কমায় কার্বন নির্গমনের পরিমাণ বেড়েছে। বরং ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের তাপমাত্রা ২০১৯ সালের থেকে বেড়েছে।

সবুজ কমছে :একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় মোট আয়তনের মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ এখন সবুজ এলাকা হিসেবে টিকে আছে। বাকি ভূখণ্ড নানাভাবে ভরাট করা হয়েছে কিংবা নানা অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। শহরে মোট ২১৮টি মাঠ ও ১০৩টি ঘাস আচ্ছাদিত উন্মুক্ত এলাকা রয়েছে। স্বাধীনতার পর নগরের আয়তন বাড়লেও ঢাকায় রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো বড় সবুজ এলাকা বা উদ্যান আর তৈরি করা হয়নি। বরং একের পর এক জলাশয় ভরাট করে বসতি এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে।

পরিবেশ সংগঠন পবার এক জরিপ বলছে, ধানমন্ডি লেক এলাকার চেয়ে ঢাকার যে কোনো স্থানের তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি বেশি। কারণ ধানমন্ডি লেকে গাছ ও জলাশয় রয়েছে। এলাকাভেদে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা পাওয়া যায় পল্টন মোড়, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ১নং গেট, শাপলা চত্বর, নিউমার্কেট বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। এসব এলাকার তাপমাত্রা অন্যান্য এলাকার চেয়ে ১ দশমিক ৫ থেকে ৪ ডিগ্রি বেশি। ঢাকায় থার্মোমিটারে যে তাপমাত্রা পাওয়া যায়, বাস্তবে এখানে অনুভূত তাপমাত্রা তার চেয়ে ৩ থেকে ৮ ডিগ্রি বেশি।

পরিবেশবিজ্ঞানী ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, ঢাকার নগরায়ণের ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। এখানে দুই ভবনের মাঝখানে কোনো জায়গা রাখা হচ্ছে না। শহরটা কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। আগে ভবনগুলোর ছাদে ও জানালায় কার্নিশ দেওয়ার চল ছিল। এখনকার ভবনে তা উঠেই গেছে। ফলে বাইরের তাপ প্রতিটি ভবনকে একেকটি অগ্নিচুল্লিতে পরিণত করছে।

সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের চেয়ারম্যান ও নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, শহরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে পরিকল্পিত নগরায়ণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, শহরের সবুজ এলাকা ও জলাভূমি রক্ষায় আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা উচিত।

সোনালী/জেআর

শর্টলিংকঃ