ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে অনলাইন সাংবাদিকতার উত্থান

  • 3
    Shares

মাহমুদ মেনন

পঞ্চাশ বছরের বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার বয়স হাতের আঙুল গুনে সতের বছর। ২০০৪ সালের জুলাই-আগস্টে একটি সংবাদমাধ্যমের উদ্যোগ হয়, স্রেফ ব্যক্তি উদ্যোগ, যা সেপ্টেম্বর নাগাদ বাস্তবে রূপ পায়। এটি ছিল পূর্ণাঙ্গরূপে ইন্টারনেট ও কম্পিউটার প্রযুক্তিনির্ভর সংবাদমাধ্যম। অর্থাৎ খবর তৈরি হবে কম্পিউটারে। সে খবর প্রকাশিত হবে ইন্টারনেটভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্মে। একমাত্র যাদের কম্পিউটারে ইন্টারনেট কানেকশন রয়েছে তারাই এই খবর দেখতে পাবেন।

তবে এরও বছর পাঁচেক আগে সহস্রাব্দের প্রারম্ভে দেশের প্রধান দুটি সংবাদপত্র দ্য ডেইলি স্টার ও দৈনিক প্রথম আলো তাদের প্রিন্টভার্সন অনলাইনে প্রকাশ করতে শুরু করে। সে অর্থে ইন্টারনেটে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি ঘটে সহস্রাব্দের আগেই। আর সহস্রাব্দ নাগাদ দেশের প্রধান একটি বেসরকারি সংবাদ সংস্থা ইন্টারনেট ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছে খবর পাঠানোর প্রয়াস নেয়। তবে একটি ডিজিটাল ডিসপ্লে তৈরি করে, পাঠকের জন্য সেখানেই খবরের পসরা সাজানোর কাজটি বিডিনিউজ২৪.কম’রই প্রথম। সেটি ২০০৪ সাল।

সেভাবেই শুরু বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার যাত্রা। যার ছিল একটি ডোমেইন নেম। যা লিখে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে ব্রাউজ করে পাঠ করা যেতো নিউজপোর্টালটি। বর্তমানে বহুল পঠিত এবং দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের একটি এই বিডিনিউজ। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন স্বনামধন্য সাংবাদিক আলমগীর হোসেন। তবে দুই বছরের মাথায় ২০০৬ সালে একই ডোমেইনের নামে নতুন মালিকানায় হস্তান্তরিত হয়। এবং পরে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর হাত ধরে সুপ্রতিষ্ঠা পায়।

সৌভাগ্যই বলা চলে, দেশে প্রথম যাত্রা শুরু করা এই ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমটির প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মীদের একজন ছিলাম। এবং সে ছিল এক দারুণ অভিজ্ঞতা। খবর সংগ্রহে তখনও সনাতনী পদ্ধতিই ছিল। সংবাদকর্মীরা স্পট থেকে কিংবা তাদের সূত্র থেকে খবর সংগ্রহ করতেন। বার্তাকক্ষে ফিরে তা লিখে জমা দিতেন। বার্তাকক্ষ খবর সম্পাদনা করে আকর্ষণীয় শিরোনামে তা প্রকাশ করতেন। আর সে খবর পড়ে ফেলা সম্ভব হতো পৃথিবীর যেকোনও প্রান্ত থেকে। তবে সেই গোড়ার দিনগুলোতে আপলোড করলেই যে তা ওয়েবসাইটে দেখা যেতো, তেমনটি নয়। সার্ভার বসানো ছিল সিঙ্গাপুরে। সুতরাং আপলোড হলে তা সাইটে দেখতে কিছুটা সময় লেগে যেতো। আর সার্ভার ডাউন, এমন একটি কথা খুব কম শুনতে হতো না। তবে যখন একবার প্রকাশ হয়ে যেতো তা পড়ার সুযোগ তৈরি হয়ে যেতো পাঠকের নিজস্ব কম্পিউটারে।

প্রথম দিকে খবর থাকতো পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড। ধারণা ছিল সাবস্ক্রাইব করে পাঠক এখানে প্রকাশিত খবর পড়বে। আর প্রাতিষ্ঠানিক সাবস্ক্রিপশনও হতে পারে। তাতে পাঠকশ্রেণি তৈরি হতে সময় লাগলো। একপর্যায়ে অনলাইনে খবর পাঠ উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। এতে ক্ষণে ক্ষণে খবরের পাঠক বাড়তো। আর অনেক বেশি উত্তেজনা অনুভবের সেটাই ছিল কারণ। তাছাড়া পাঠকের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেত দ্রুত। একবার তো সে সময়ের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীকে নিয়ে দুর্নীতির এক্সক্লুসিভ খবর প্রকাশ করায় বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। একবার নির্ভরযোগ্য সূত্রে র‌্যাবের একটি ক্রসফায়ারের আগাম তথ্য পেয়ে খবর প্রকাশ করে, কর্তৃপক্ষের নজরে পড়লে রাতের ক্রসফায়ার থামিয়ে দেওয়া গেলো।

এসবই বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার গোড়ার দিকের গল্প। তবে আগেই বলেছি, দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো তাদের প্রিন্টেড কপি অনলাইনে প্রকাশ করতে শুরু করে আরও আগে। ২০০০ সালের দিকে এ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানার সুযোগ হয়েছিল দ্য ডেইলি স্টারের সে সময়ের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক প্রয়াত ফাহিম মুনয়েমের সঙ্গে। দেশের প্রথম ট্যাবলয়েড পত্রিকা দৈনিক মানবজমিনের মিডিয়া ওয়াচ পাতায় সে সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। আজও মনে আছে কতটা উত্তেজনা ছিল ফাহিম মুনয়েমের বক্তব্যে। সে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে ইন্টারনেটে খবর পড়বে আরও বেশি বেশি মানুষ। তা-ই সত্য হলো। দ্য ডেইলি স্টার এখন বেশি পরিচিত হয়ে উঠছে দ্যডেইলিস্টার.নেট নামে। দৈনিক প্রথম আলোর চেয়ে প্রায় শতগুণ বেশি পঠিত হচ্ছে প্রথমআলো.কম।

বিডিনিউজ২৪.কম-এর ধারাবাহিকতায় দেশে একের পর এক এলো সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক নিউজপোর্টাল। এসেছে বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, বাংলাট্রিবিউন.কম, সারাবাংলা.কম, অপরাজেয়বাংলা.কম- এমন ডজনখানেক প্রধান সারির এবং আরও অসংখ্য অনলাইন সংবাদমাধ্যম। আর দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলোর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, সমকাল, সংবাদ সব সংবাদপত্রেরই রয়েছে অনলাইন ভার্সন। এখন দেশের সব টেলিভিশন চ্যানেলেরও রয়েছে অনলাইন ভার্সন।

এগুলোর বিস্তৃতি কিংবা পাঠক-দর্শক কত সে নিয়ে ধারণা পেতে দেশের ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে একটু ধারণা নিয়ে রাখা যেতে পারে। ১৯৯৩ সালে ব্যক্তি উদ্যোগে খুব স্বল্প পরিসরে ই-মেইল ব্যবস্থা চালু হয়। আরেকটি বেসরকারি সংস্থা বুলেটিন বোর্ড সার্ভিস (বিবিএস) নিয়ে এলো ১৯৯৪ সালে। এতে ইন্টারনেট জনপ্রিয় হতে শুরু করে। তবে এতে সরকারি অনুমোদন পেতে সময় লাগে আরও দুই বছর। সরকার বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার সবার জন্য উন্মুক্ত করে ১৯৯৬ সালে। সেটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। ১৯৯৬ সালের ৪ জুন দেশে অনলাইন ইন্টারনেট সার্ভিস চালু হয়। একই দিনে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার-আইএসপি ও ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক (আইএসএন) কাজ শুরু করে। আর তার মাত্র দেড় মাসের মাথায় গ্রামীণ সাইবারনেট যাত্রা শুরু করে ১৯৯৬ সালের ১৫ জুলাই। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশে ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বিস্ময়কর হারে বেড়েছে। ইন্টারনেট ও তথ্য-প্রযুক্তিতে জনগণের প্রবেশাধিকার এবং ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু করে। ২০১০ সাল নাগাদ শেখ হাসিনার সরকার তার নির্বাচনি ইশতেহার মেনে নিজেকে ডিজিটাল সরকার ঘোষণা করে। যার ফল হিসেবে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি (১০০ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে যায়। আরেকটি হিসাব দেখিয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি এবং মোট জনসংখ্যার ৬২% ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। ২০০০ সালে বাংলাদেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১,৮৬,০০০, যা ২০০৯ সালে বেড়ে হয় ৬,১৭,৩০০, যা ছিল বাংলাদেশের জনসংখ্যার মাত্র ০.৪%।

পাঠক মাত্রই বুঝতে পারছেন, ইন্টারনেটের এই বিপুল বিস্তৃতি দেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে বিস্তার লাভ করার সুযোগ করে দিয়েছে। যা প্রধানত কল্পনাতীতই ছিল। আর দ্বিতীয়ত তা ইন্টারনেটের আশীর্বাদকে পুঁজি করে এর ইতিবাচক ব্যবহারের দিকটা সক্ষমাতীত হয়ে পড়ে। সে আলোচনায় পরে আসি। সত্যিই কি খবরের পাঠক বেড়েছে? সে প্রশ্নটি এখনই করে রেখে, ইন্টারনেটভিত্তিক সাংবাদিকতার প্রযুক্তিগত দিকটিতে আরও কিছুটা আলোকপাত করা যাক।

ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি বস্তুত এই অনলাইন সাংবাদিকতার ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল। অর্থাৎ ইন্টারনেটের ভূমিকা স্রেফ হকারের ভূমিকা মাত্র। সংবাদপত্রের জন্য যেমন হকার রয়েছে, টেলিভিশনের জন্য রয়েছে কেবল অপারেটর। তেমনি অনলাইন সংবাদপত্রের জন্য রয়েছে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার।

আমরা যখন ইন্টারনেটের অগ্রগতির গল্পটি শুনলাম ঠিক একই টাইমলাইন ধরে ঘটলো যোগাযোগ প্রযুক্তির আরেক বিস্ময়কর আবিষ্কার মোবাইল ফোনেরও অগ্রযাত্রা। ১৯৯৫ সালে বিটিটিবি দেশে প্রথম কার্ড টেলিফোন সেবা চালু করে। ১৯৯৬ সালে গ্রামীণফোন সেল্যুলার মোবাইল টেলিফোনের লাইসেন্স পায়। ১৯৯৮ সালে দেশে টেলিযোগাযোগ নীতি গৃহীত হয়। ২০০১ সালে টেলিযোগাযোগ আইন প্রণীত হয়। ২০০২ সালে আইসিটি নীতি গ্রহণ করা হয়। ২০০৪ সালে টেলিটক সেল্যুলার মোবাইল চালু হয়। ২০০৮ সালে বিটিটিবি পাল্টে গিয়ে হলো বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লি. (বিটিসিএল), যার শতভাগ শেয়ারের মালিকানা সরকারের। সে বছর সাবমেরিন কেবল কোম্পানি যাত্রা শুরু করে। ২০০৯ সালে ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিফোনি সার্ভিস প্রোভাইডার কাজ শুরু করে। ২০১২ সালে থ্রিজি মোবাইল সার্ভিস আনে টেলিটক। ২০১৪ সাল নাগাদ দেশের ৬৪ জেলায় থ্রিজি নেটওয়ার্ক পৌঁছে দেয় টেলিটক, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও রবি। ২০১৮ সালের দেশে আসে ফোরজি মোবাইল ফোন।

এ তো গেলো মোবাইল ফোন প্রযুক্তির উৎকর্ষতার দিক। এর ব্যবহার পরিসংখ্যানটিও কম আকর্ষণীয় নয়। সহস্রাব্দ শুরু নাগাদ দেশের ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষের হাতে মোবাইল ফোন পৌঁছায়। এর পাঁচ বছরের মাথায় ২০০৪ সালে এই সংখ্যা ২৭ লাখ ৮০ হাজারে উন্নীত হয়। এরপর জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে এই সংখ্যা। ঠিক এক বছরের মধ্যে ২০০৫ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ লাখে। ২০০৬ সালে তা ১ কোটি ৯১ লাখ হয়। ২০০৭-এ ৩ কোটি ৪৩ লাখ। তিন বছর পার করে ২০১০-এ দ্বিগুণ বেড়ে এই সংখ্যা হয় ৬ কোটি ৮০ লাখ। ২০১৫-তে হয় ১৩ কোটি ১৪ লাখ আর ২০১৯-এ এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৫৭ লাখ। এখন ২০২১ সাল নাগাদ দেশের প্রতি ১০০ জন মানুষের মধ্যে ১০১টি মোবাইল ফোন ব্যবহৃত হয়।

এই মোবাইল ডিভাইসটি এবং তার নেটওয়ার্কের উৎকর্ষতা সাংবাদিকতার জন্য নানা অর্থে আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়। সংবাদ সংগ্রহ, সংবাদ পরিবেশন ও সংবাদ পাঠ তিন ক্ষেত্রেই মোবাইল ফোন একটি কার্যকর ভূমিকা সারা বিশ্বেই রাখতে শুরু করে। বাংলাদেশ যার ব্যতিক্রম নয়। সংবাদকর্মীর জন্য খবর সংগ্রহ এখন অনেকটা ওয়ান কল অ্যাওয়ে। অর্থাৎ মোবাইল ফোন তুলে ডায়াল করলেই ওপাশে রিসিভিং ইন্ড থেকে তথ্য মেলে। খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রেও এখন প্রত্যেকটি অনলাইনের রয়েছে দুটি ভার্সন, ডেস্কটপ ও মোবাইল ভার্সন। পরিবেশনায় এই বিশেষ সংযোজন এই কারণে যে, এর মধ্য দিয়ে পাঠকের কাছে সহজে পৌঁছে যায়। কারণ, পাঠক নিজে এখন মিনি স্ক্রিনে অভ্যস্ত। সুতরাং সংবাদমাধ্যমটি যে ডিভাইসে বেশি পড়া হচ্ছে কিংবা দেখা বা শোনা হচ্ছে সেটিও একটি মোবাইল ফোন। এবং এই তিন কারণে বিশ্বে এখন সাংবাদিকতার অভিধানে আরেকটি নতুন জাগরণ যুক্ত হয়েছে- মোবাইল জার্নালিজম।

জার্নালিজম শব্দটি যখন এসেই গেলো, প্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামো নিয়ে আর নয়, আসুন অনলাইন সাংবাদিকতার দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। প্রথমেই একটি কথা স্বীকার করে নিই, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যখন অনলাইন সাংবাদিকতা পড়াতে যাই তখন প্রায়শই একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। প্রশ্নটি হচ্ছে, স্যার একটি অনলাইন পোর্টালে এমন একটা খবর পড়লাম। এমন করে ওদের লেখা কি ঠিক হলো? এসব প্রশ্ন। উত্তরে আমি বলি, ক্লাসে যে আলোচনা হবে সেটি সাংবাদিতার নীতি-নৈতিকতার দিক থেকে যা কিছু সঠিক তা। আর এখানে আমরা যে সাংবাদিকতার আলোচনা করবো তা এখনকার এই যুগে পৃথিবীতেই বিরল! শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়। নিজেও হতাশাগ্রস্ত হই। যুগপৎ সাংবাদিকতার শিক্ষক ও সাংবাদিকতার চর্চাকারী হিসেবে বলছি, সত্যিই ইথিক্যাল পয়েন্ট অব ভিউ থেকে আমরা শ্রেণিকক্ষে যা পড়াই, বাস্তবের সাংবাদিকতা চর্চায় তার অনেক কিছুরই অনুপস্থিতি দেখতে পাই। বিষয়টি ক্রমশ এত বেশি চাগাড় দিয়ে উঠেছে যে এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি দেওয়া যাবে। মোটা দাগে একটি কথা বলতে চাই, সাংবাদিকতার এই পরিণতির পেছনে অনলাইন সাংবাদিকতার অনিয়ন্ত্রিত ও অবাধ চর্চাই দায়ী। নিজে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রায় দেড় যুগ ধরে কাজ করার কারণে সে দায় নিজের ওপরও বর্তায়। এবং তা মাথা পেতেই নিচ্ছি।

আগেই বলেছি, ইন্টারনেটের আশীর্বাদকে পুঁজি করে এর ইতিবাচক ব্যবহারের দিকটা সক্ষমাতীত ছিল আমাদের দেশে। দেশে অনলাইন সাংবাদিকতার গতি প্রকৃতি এখন সচেতন পাঠকমাত্রই জানা। সুতরাং এই হতাশার কারণ ব্যাখ্যা খুব একটা জরুরি নয়। তবে সাংবাদিকতার চর্চার খাতিরে, সাংবাদিকতাকে তার হৃতগৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার খাতিরে বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার বর্তমানে চলমান কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করছি।

প্রধানত সংখ্যা। অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে নিবন্ধন করতে হবে, সরকারের এমন ঘোষণার পর ৮ হাজার আবেদন পড়েছে। তার মানেই হচ্ছে দেশে অন্তত ৮ হাজার মানুষ রয়েছেন, যারা নিজেদের সম্পাদক ঘোষণা করে অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের জন্য জমা দিয়েছেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, এরমধ্যে প্রায় দুই হাজার আবেদনকে স্ক্রুটিনি করা হয়েছে। মনে প্রশ্ন জাগে, কারা এই সম্পাদক? তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী? তবে এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চেষ্টা করাই বৃথা।

দ্বিতীয়ত কুম্ভিলকবৃত্তি। মানে কাট-কপি-পেস্ট। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমনই সাংবাদিকতা চলছে বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোতে। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এতে সাংবাদিকতার উৎকর্ষ কখনোই সাধন করা সম্ভব হবে না। বলা হয়, কনটেন্ট ইজ দ্য কিং। তো আপনি যদি কনটেন্ট তৈরিই না করেন, কেবল অন্যের কনটেন্ট কপি করে নিজের পোর্টালে পাবলিশ করেন, তাহলে পাঠক নতুন কনটেন্ট কোথায় পাবে।

তৃতীয়ত সুড়সুড়ির কনটেন্ট। সাংবাদিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অনলাইনগুলো এমন সব কনটেন্ট অনবরত প্রকাশ করে চলেছে, যার মান ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। যা অনুচিত। কিন্তু একশ্রেণির অনলাইন যেগুলো করেই চলেছে। ফলে সাংবাদিকতা সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চতুর্থত ডিসইনফরমেশন কিংবা মিথ্যা তথ্য দেওয়া। এটিও অনলাইন সাংবাদিকতায় খুব দেখা যাচ্ছে। সাংবাদিকতার কাজ হচ্ছে পাঠককে জানানো। কোনোভাবেই মিথ্যা জানানো নয়। এছাড়াও ফেইক নিউজ ফ্যাক্টরি, গুজব ছড়ানো এসবও ভীষণরকম বর্তমান বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতায়।

তবে মুদ্রার অপর দিকটিও রয়েছে। বিশ্ব পর্যায়ে মিডিয়া যখন ওইসব সুপারফাস্ট যোগাযোগ প্রযুক্তির হাতে এসে পড়লো, সাংবাদিকতা অনেক সহজ হয়ে উঠলো। চব্বিশ ঘণ্টার নিউজসাইকেলে পড়ে কিছুই আর পাঠকের জন্য অজানা থাকছে না। তথ্যই শক্তি। যা বাংলাদেশের পাঠকের জন্যও প্রযোজ্য। অতএব, বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার জয় হোক।

খবরের পাঠক কী বেড়েছে? এমন একটি প্রশ্ন আগেই করে রেখেছিলাম। সবশেষে তার উত্তরটি খোঁজার চেষ্টা করা যাক। দেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের পাঠক বাড়ছে না এ কথা বললে ভুল হবে। ‘সুড়সুড়ির’ কনটেন্ট কিংবা ক্লিক-বেইট জার্নালিজমের আওতায় তৈরি ভাইরাল কনটেন্ট তো মানুষ বেশ পড়ছে। কিন্তু সমস্যা শুদ্ধ, সঠিক, উন্নত সাংবাদিকতার চর্চার ক্ষেত্র। এই কনটেন্টে পাঠক টেনে আনা দায়। এলেও ধরে রাখা দুষ্কর। অনলাইনে তীক্ষ্ণ চোখ রেখে দেখবেন পাঠক কিংবা দর্শক নিউজ কনটেন্টের চেয়ে নন-নিউজ কনটেন্টে বেশি থাকছে। আর নন-নিউজের মধ্যে যা বিনোদনমূলক তার ক্ষেত্রে সস্তা বিনোদনে ঝোঁকটা বেশি। সুতরাং ভালো সাংবাদিকতা পাঠক ধরে রাখতে পারে না। এটা স্রেফ পাঠকের হারিয়ে যাওয়ার গল্প। কারণ খুঁজলে আঙুল যাবে সোশ্যাল মিডিয়ায়। পাঠক অনলাইনে ঢুকে স্যোশাল মিডিয়ার গহ্বরে তলিয়ে যায়। সেখান থেকেই যৎসামান্য নিউজ মিডিয়ায় আসে। তাও আবার সেসব কনটেন্টে যা হয়তো ফেইক নিউজ ফ্যাক্টরিতেই তৈরি করা। এ জন্য পাঠকের মিডিয়া লিটরেসির অভাবটাই সবচেয়ে বেশি দায়ী। আসুন আমরা পাঠককে মিডিয়া লিটরেটও করে তুলি। কারণ, সেটিও মিডিয়ারই দায়িত্ব।

লেখক: সম্পাদক, অপরাজেয়বাংলা

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ