ডিঙি নৌকা দুটিতে ছিলেন অতিরিক্ত যাত্রী

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে ডুবে যাওয়া বর-কনেবাহী নৌকা দুটি যাত্রী পারাপারের নৌকা ছিলো না। ছোট ছোট এই ডিঙি নৌকায় জেলেরা মাছ ধরেন। এমন দুটি নৌকাতেই বিয়েবাড়ির যাত্রীদের পারাপার করা হচ্ছিল। আর অতিরিক্ত যাত্রীর কারণেই নৌকা দুটি ডুবে যায় বলে ধারণা করছেন উদ্ধার কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এদিকে গতকাল রোববার নদী থেকে আরও এক নারী এবং এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে রাত ৮টা পর্যন্ত নববধূ সুইটি খাতুন পূর্ণিমার (১৬) লাশ পাওয়া যায়নি। পূর্ণিমা রাজশাহীর পবা উপজেলার ডাঙেরহাট গ্রামের শাহিন আলীর মেয়ে। দেড় মাস আগে পদ্মার ওপারে একই উপজেলার চরখিদিরপুর গ্রামের ইনসার আলীর ছেলে আসাদুজ্জামান রুমনের (২৬) সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কিন্তু তখন অনুষ্ঠান হয়েছিল না।
তাই গত বৃহস্পতিবার কনের বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বরপক্ষ কনেকে সেদিন চরে নিয়ে যায়। প্রথা অনুযায়ী, পরদিন শুক্রবার কনেপক্ষের লোকজন বর এবং কনেকে আবার কনের বাড়িতে নিয়ে আসছিলেন। তখন রাত ৭টার দিকে রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর এলাকার বিপরীতে মাঝপদ্মায় দুটি নৌকায় ডুবে যায়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্যমতে, দুটি নৌকায় কমপক্ষে ৫০ জন যাত্রী ছিলেন। নৌকাডুবির পর ছোট আরেকটি নৌকা এবং বালুবাহী একটি ট্রলার বরসহ ভাসমান
অন্য মানুষদের উদ্ধার করে।
এরপর মরিয়ম খাতুন (৬) নামের এক শিশুকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে নৌকাডুবির পর থেকেই নদীতে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। সে রাতে কাউকে পাওয়া না গেলেও পরদিন শনিবার একে একে পাওয়া যায় পাঁচটি লাশ। এদের মধ্যে ঘটনার পরই মারা যাওয়া মরিয়মের বাবা রতন আলীর (৩০) লাশও পাওয়া যায়।
রতন কনে পূণির্মার দুলাভাই। শনিবার অন্য যে চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয় তারা হলেন- কনে পূর্ণিমার চাচা শামীম হোসেন (৩৫), তার স্ত্রী মনি খাতুন (৩০), তাদের মেয়ে রশ্নি খাতুন (৭) এবং কনের খালাতো ভাই এখলাস হোসেন (২৮)। আর রোববার পাওয়া যায় কনের ফুফাতো বোন রুবাইয়া খাতুন স্বর্ণা (১৩) এবং খালা আঁখি খাতুনের (৩০) লাশ। আখির স্বামীর নাম আসাদুজ্জামান জনি। রাজশাহী নগরীর হড়গ্রাম পূর্বপাড়া মহল্লায় তার বাড়ি। আর রুবাইয়ার বাবার নাম রবিউল ইসলাম। রাজশাহীর আলীগঞ্জ মোল্লাপাড়া এলাকায় তার বাড়ি। স্বর্ণা অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশুনা করতো।
রুবাইয়ার লাশ ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে রাজশাহীর লালন শাহ্ মুক্তমঞ্চের সামনে পদ্মা নদীতে জেলেদের জালে তার লাশ উঠে আসে। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা লাশটি উদ্ধার করে। আর আঁখির লাশ ভেসে ওঠে নগরীর উপকণ্ঠ কাটাখালি এলাকায়। দুটি লাশই উদ্ধার করে স্বজনদের হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে রোববার সকালে পানির নিচ থেকে একটি নৌকা উদ্ধার করা হয়েছে। আগের দিন দুপুরে আরেকটি নৌকা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর দেখা যায়, দুটি নৌকায় ছিলো মাছ ধরা ছোট ডিঙি নৌকা। এসব নৌকায় নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে নম্বর বসানো আছে। নৌকাগুলোতে কয়েকজন বসতে পারেন। কিন্তু ছোট এসব নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হয়। আর এ কারণেই ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা যাত্রীদের ভাষ্যমতে, পুরনো নৌকা দুটিরই তলা ফেটে পানি উঠছিল। একপর্যায়ে সেগুলো ডুবে যায়।
কনে পূর্ণিমার লাশ উদ্ধার করতে নদীতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে ফায়ার সার্ভিস ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআইডবিøউটিএ) ডুবুরি দল, নৌ-পুলিশ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। কনের লাশ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে। উদ্ধার কাজ দেখতে এখনও অসংখ্য মানুষ পদ্মারপাড়ে ভিড় করছেন। রয়েছেন নিহতদের স্বজনেরাও। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু আসলামের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি।
জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে ডিঙি নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী তোলার কারণে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলবে তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, কনের লাশ এখনও উদ্ধার হয়নি। বাকি সবার লাশই উদ্ধার হয়েছে। কনের লাশ উদ্ধারের পর হয়তো তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে।

শর্টলিংকঃ