ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সচেতনতায় যথেষ্ট

আম্বিয়া অন্তরা

আমাদের দেশে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাবে না এমন পরিবার এখন বিরল। এ রোগকে বলা হয় নীরব ঘাতক। কারণ ডায়াবেটিস শরীরে জায়গা করে নিলে হার্ট, কিডনি, চোখ ইত্যাদিকে নীরবেই আঘাত করে।

বিভিন্ন স্বাস্থ্যজটিলতা সৃষ্টি করে এ রোগ। গ্রামাঞ্চলে আগে বিভিন্ন জটিল রোগে বিশেষ করে অন্ধত্বে ভুগলে বলা হতো পেঁচুই ধরেছে ইত্যাদি। দীর্ঘ সময় দেশে এবং প্রবাসে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কাজ করেছি এবং এই করোনাকালীন নিউইয়র্কে স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত ছিলাম।

দেশে এবং বিদেশে, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার উপর স্বল্পমেয়াদি ট্রেনিংও করেছি। এই ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেসব রোগের সঙ্গে বসবাস করি অথচ জানি না তার ভেতরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ডায়াবেটিস। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই ডায়াবেটিস রোগ একবার শরীরে বাসা বাঁধলে সারা জীবনের জন্য বয়ে বেড়াতে হয়।

এই রোগটি উপলব্ধি বা এই বিষয়ে সচেতনতা আমাদের খুব কম, কারণ উপলব্ধি করেছি আমার পরিবারে ডায়াবেটিস বয়ে বেড়িয়েছে আমার মা, বোন কিন্তু তা জানতে আমার সময় লেগে গেছে। ভয়ঙ্কর তথ্য হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে অন্ধত্ব, কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদির পেছনে একটি বড় কারণ এই ডায়াবেটিস।

এছাড়া আমরা এই রোগগুলোর সঙ্গে খুব পরিচিত; ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, অতিরিক্ত প্রস্রাবের কারণে শরীরের পানি বেরিয়ে তেষ্টাও পায় প্রবল। এটা ঘটে রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়লে তাকে শরীর থেকে বার করে দেয়ার জন্য কিডনির ওপর চাপ পড়ে। আবার আমাদের শরীরের কোনো ঘা বা ক্ষত সহজে শুকাতে চায় না, চোখে ঝাপসা দেখি, অল্পতেই দুর্বল হয়ে পড়ি। হঠাৎ ওজন কমে যায়, হাত-পা কিংবা হাত-পায়ের কোনো আঙুল অবশ হয়ে পড়া, শরীরের ঘা সহজে শুকাতে চায় না।

এগুলো সবই ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিন্তু আমরা অনেকেই তা জানি না বা জানার চেষ্টা করি না। তাছাড়া গ্রামাঞ্চলের মানুষদের ধারণা এটা শুধু বড় লোকের রোগ যারা অলস অফিসে বসে কাজ করেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এখন সব বয়স আর সব শ্রেণির মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রতি দু’জন প্রাপ্তবয়সী মানুষের মধ্যে একজন এখনো জানতে পারছে না যে তার ডায়াবেটিস রয়েছে। বর্তমানে সব বয়সী মানুষের মধ্যেই এ রোগের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এমনকি শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও এই রোগের প্রকোপ বেড়েছে। এর কারণ প্রাপ্তবয়স্ক যেসব মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ মধ্যে আমাদের মতো নিম্ন আয়ের দেশের। কারণ এখানের অর্থনৈতিক সমস্যা এবং সচেতনতার কারণে দ্রুত খাদ্যাভাসের পরিবর্তন ঘটছে (ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের জরিপ অনুযায়ী)

প্রকাশিত একটি গবেষণার মতে, বাংলাদেশের ৭.১ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। ২০৪০ সালে এর সংখ্যা ১৩.৬ মিলিয়ন হবে বলে ধারণা করা হয়। ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে ডায়াবেটিস নিয়ে আমাদের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বা ৫১.২ শতাংশ মানুষ খবর রাখেন না এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন না।

বিশ্বে যে হারে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এই বৃদ্ধি পাওয়া রোগীদের জন্য ইনসুলিন জোগানের সংকট সৃষ্টি হবে বলে এক গবেষণায় ভবিষ্যদ্বাণী এসেছে। যেহেতু এটা খাদ্যাভাস এবং নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাত্রার সঙ্গে জড়িত তাই ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কিংবা নিয়ন্ত্রণে পারিবারিক সচেতনতার বিকল্প নেই। সব বয়সী লোকের কিন্তু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ছে।

jagonews

একটি বিষয় মনে রাখতে হবে ডায়াবেটিস কোনো রোগ নয় যদি নিয়ম মেনে চলা যায়। এজন্য আমাদের উচিত আমাদের পরিবারের কারো ডায়াবেটিস হলে তাকে কিছুতেই ভেঙে পড়তে দেয়া যাবে না। তার জীবন শেষ হয়ে গেছে, কিছুই আর হবে না-এই মনোভাব থেকে তাকে দূরে রাখতে হবে। তাকে আশ্বস্ত করতে হবে এটা খুব স্বাভাবিক বিষয় শুধু জীবনযাত্রার মান সামান্য পরিবর্তন করতে হবে তাছাড়া আর কিছুই না।

পরিবারের সবাই সচেতন হয়ে তার খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনার জন্য তাকে সহযোগিতা করতে হবে। তার জন্য সঠিক ডায়েট চার্ট তৈরি করে দেয়া। বিশেষ করে দাদা-দাদি নানা-নানি বয়স্কদের ক্ষেত্রে তাদেরকে সময় দেয়া বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়ামের জন্য তাকে পারিবারিক কাজের বাইরে দৈনিক অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় বের করে সাহায্য করা।

সবাই মিলে কোথাও ঘুরতে গেলে অথবা পরিবারের উৎসবগুলোতে তার খাবাবের ব্যাপারে একটু সচেতন থাকা। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তরুণীরা প্রথমে খুবই ঘাবড়ে যান, ইনসুলিন নিতে ভয় পান ও সন্তানের সুস্থতা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাদেরকে সাহস দিতে হবে সাধারণত সন্তান প্রসবের আগে মায়ের যত্ন বেশি থাকে আবার সন্তান জন্মের পর সবাই যখন নবজাতককে নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন তখন মায়ের কথাটা ভুলে গেলে চলবে না।

যেহেতু বাচ্চাদেরও ডায়াবেটিস হচ্ছে এজন্যই শৈশব থেকেই আমাদের শিশু-কিশোরদের খাবারের প্রতি যত্নবান হতে হবে। সব ধরনের সংরক্ষিত খাবার কেনা, ফাস্টফুড ও কোমল পানীয়, কৃত্রিম জুসে যেন অভ্যস্ত না হয়ে পড়ে সেদিকে নজর রাখতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত এই খাদ্যাভাস ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আর আমাদের খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে বাড়িতে শুধু তাই নয়, শৈশব থেকে খাবারের পছন্দ-অপছন্দও গড়ে তোলে পরিবারই।

মনে রাখতে হবে হোম-মেডই হলো সবচেয়ে ভালো খাবার। পাশাপাশি আমাদের উচিত ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলা, সাইক্লিং করা, সাঁতার কাঁটা আর এই কায়িক তথা শারীরিক শ্রম আমাদের শিশু-কিশোরদেরকে অভ্যস্ত করতে হবে তাদের সুস্থ জীবনযাপনের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারের অবহেলা একজন ডায়াবেটিস রোগীকে নানা জটিলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আমাদের সবার সচেতন হওয়া উচিত কেননা খাদ্যাভাস জীবনযাত্রা, দৈনন্দিন ব্যায়ামের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক নিবিড় আর এই বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পারে পরিবার। যেহেতু ডায়াবেটিস একবার হয়ে গেলে সম্পূর্ণরূপে সেরে যাবে সে নিশ্চয়তা নাই তাই নিয়্ন্ত্রণে রাখলে সুস্থ জীবন যাপন করা যাবে।

লেখক: স্বাস্থ্যকর্মী, নিউইর্য়ক

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ