ট্রাম্পের পরাজয় ব্যক্তিগত না আদর্শগত?

  • 35
    Shares

ড. শ্যামল দাস

একটা বড় প্রশ্ন নিয়ে সবাই আলোচনা করছেন। সেটি হলো, বাইডেন কেন জয়ী হলেন? তিনিতো ওবামার মতো ভালো বক্তা নন; বিল ক্লিনটনের মতো সুন্দর চেহারার অধিকারীও নন; রাজনৈতিক জীবনে একেবারে ক্লিনও নন তিনি। তাহলে কী এমন ঘটলো আমেরিকায় যে তিনি ট্রাম্পের মতো এমন প্রতাপশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করলেন? শুধু পরাজিত করা নয়; তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পপুলার ভোট পাওয়া প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন জানুয়ারির বিশ তারিখে।
কীভাবে হলো এটি? বাইডেনের থলেতে কী এমন বিশেষ কৌশল ছিল যা আমেরিকান সমাজের বড় একটি অংশকে তাৎপর্যপূর্ণভাবেই উল্টো রাস্তায় হাঁটালো চার বছর আগের সময় থেকে? আমি নিজে ভেবেছি বিষয়টি নিয়ে। আমি বুঝতে চেয়েছি কেন ২০১৬ সালের অনেক ট্রাম্প সমর্থক ২০২০ সালে পাল্টে গেলেন।

ঐতিহ্যগতভাবেই আমেরিকান ভোটাররা দু’রকমের। একটি গ্রুপ প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে না ভেবে দলীয় আদর্শকে ভোট দিয়ে থাকেন; আরেক অংশ আদর্শের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির যোগ্যতা এবং বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে তার ব্যক্তিগত অবস্থান প্রকাশের ধরনটিকে বিবেচনায় আনেন। এই দ্বিতীয় গ্রুপটিকেই এদেশে সুইং ভোটার বলে। এরা সংখ্যায় কম হলেও প্রায় সব নির্বাচনেই এদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য এবং প্রণিধানযোগ্য। এই ভোটাররা যতটা সামাজিক এবং বৈশ্বিক সমস্যার ব্যাপারে তাদের প্রেসিডেন্টের একটি শক্ত অবস্থান আশা করেন, ততটাই তারা চান প্রেসিডেন্ট নিজেকে একটি ইউনিফাইং নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠা করবেন। আমার ধারণা, ট্রাম্প এ জায়গাটিতে আমেরিকানদের আস্থা নষ্ট করেছেন অনেকটাই। এ ব্যাপারটি এবারকার নির্বাচনে ট্রাম্পবিরোধী ভোটের সংখ্যা এমনটাই বাড়িয়েছে যে, বাইডেন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।

একটি ব্যাপার আমার কাছে মনে হয়, আমেরিকানরা সব সময়ই এমন একজন প্রেসিডেন্ট চান যিনি তার কথা বার্তায়, চাল চলনে ‘একতার’ ব্যাপারটি তুলে ধরবেন। ট্রাম্প শুরু করেছিলেন ‘আমেরিকাই  প্রথম’ বা ‘আমেরকা ফার্স্ট’ এ শ্লোগান দিয়ে, কিন্তু তিনি আমেরকার ককেশিয়ান জনগোষ্ঠীকে হাতে রাখতে চেয়েছেন অনবরত দেশের কালো, হিস্পানিক, মুসলিম এবং অন্যান্য এথনিক সংখ্যালঘুকে অপমানজনক কথাবার্তা বলে, এবং এদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদগার করে। তিনি ভেবেছিলেন এক কার্ড বারবার খেলা যাবে। এই ধারণাটির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা তাকে বিপদে ফেলেছে।

আমেরিকায় বর্ণবাদ নেই—এমন কথা কোনও পাগলেও বলবে না, কিন্তু এখনকার মানুষ ঠিক ট্রাম্পের মাত্রায়  ডিভাইডেড বা বিভক্ত আমেরিকাকেও দেখতে চায় না। আমেরিকানরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিজেদের একটি গর্বিত ‘মেল্টিং পট’ ভাবতে পছন্দ করে, বিভক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কফির কাপ নয়। এর মধ্যে তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ব্যাপারটি অবশ্যই আছে, কিন্তু সেটি এভাবে ন্যক্কারজনক রাস্তায় প্রকাশ করাটাকে তারা কোনও কাজের মনে করে না। ট্রাম্পের ধরনটি এমনকি রিপাবলিকানরাও পছন্দ করেননি। এর বড় প্রমাণ হচ্ছে এই যে, ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান অঞ্চলগুলোর বাইডেনমুখী হওয়া। আমার নিজের কিছু বন্ধু যারা আদর্শগতভাবে রিপাবলিকান ধারার তারা আমাকে অনেকদিন ধরেই বলে আসছিলেন, ট্রাম্পের উচিত নয় এভাবে কথা বলা, ইসলামোফোবিয়াকে উসকে দেওয়া। এরা অবশ্যই মনে করেন, প্রচুর অবৈধ ইমিগ্রান্ট আসে এ দেশে, যাদের মধ্যে কিছু মানুষ হয়তো বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে যুক্ত থাকেন, কিন্তু এর জন্য আইন রয়েছে, এবং এ কারণে এ মানুষগুলোর এথনিক পরিচয়কে অতিসাধারণীকরণের মাধ্যমে লেবেলিং করাটা এরা পছন্দ করেননি।

মোটা দাগে আমার নিজের ধারণা, এবারকার নির্বাচনি যুদ্ধ ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে যতটা হয়েছে তার চেয়ে বেশি হয়েছে হয়েছে ট্রাম্প এবং ট্রাম্পবিরোধী এই দু’গ্রুপের মধ্যে। আমরা দেখেছি পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া এবং মিশিগানের ঐতিহ্যগতভাবে পরিচিত লাল কাউন্টিগুলো কীভাবে নীল রঙের হয়ে গেছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে সিনেটে কিন্তু রিপাবলিকানরা অনেক ভালো করেছেন, অথচ রাষ্ট্রপতি পদে ট্রাম্প সেভাবে এই জনগোষ্ঠীর সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছেন।

কতগুলো বিষয়ে সংখ্যালঘুতো বটেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরা বিরক্ত ছিলেন ট্রাম্পের ওপর। নিজে ‘ইউনাইটেড’ স্টেটসের প্রেসিডেন্ট হয়ে জাতিকে বারবার বিভক্ত করার মতো ন্যারাটিভের জন্ম দিয়েছেন তিনি; আচার আচরণে তা প্রমাণ করেছেন। বেশিরভাগ মানুষ অবৈধ অভিবাসীদের ওপর অনেকটা না বুঝেই বিরক্ত এবং রিপাবলিকান সমর্থকরা তো বটেই, অনেক ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের দেখেছি মেক্সিকান সীমান্তে দেয়াল তৈরিকে সঠিক মনে করতে। অথচ এই জনগোষ্ঠীই ট্রাম্পের ডাকার প্ল্যানের মতো অমানবিক কাজকে মানতে পারেননি। বারবার পুলিশ কর্তৃক কালো মানুষদের খুন করার মতো ঘটনাতে আকারে ইঙ্গিতে তার সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারটি ‘ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটারস’ নামের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি এদেশে কালচারাল কম্পিটেন্সি নামে সামাজিক ডাইভারসিটিকে উৎসাহিত করার সব ফেডারেল প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন; তার মতে এগুলো ‘রেসিস্ট’ বা বর্ণবাদী। এই যে নতুন নতুন ন্যারেটিভ সেগুলো শুধু কালোদের নয়, বেশিরভাগ সুইং ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পবিরোধী মনোভাবকে উসকে দিয়েছে মনে করি।

ট্রাম্পের আচার-আচরণের যে অংশটি মানুষকে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করেছে তা হলো বর্তমান প্যান্ডেমিকের সময় মানুষের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং এক ধরনের উন্নাসিকতা। তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, যত মানুষ মারা যাওয়ার কথা ছিল তত মানুষ মারা যায়নি! এই যে উন্নাসিক দৃষ্টিভঙ্গি এটি মানুষের কাছে হৃদয়হীন মনে হয়েছে। এই প্যান্ডেমিকে যারা চলে গেছেন এবং যারা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশই কালো এবং মাইনরিটি। সব মিলিয়ে কালোরা এবং মাইনরিটি জনগোষ্ঠী ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকাকে তাদের জন্য ক্ষতিকর ভেবেছেন। অনেক সময়ই ট্রাম্প হিস্পানিকদের লেবেল দিয়েছেন ড্রাগ এবং সেক্স ট্রাফিকার হিসেবে, ধর্ষক হিসেবে। মুসলিমদের তো তিনি অহরহই সন্ত্রাসবাদী ছাড়া কিছুই ভাবতেন না। আমেরিকান সমাজ বৈচিত্র্যের মাঝে একতার যে আদর্শ ধারণ করে সেটি তার এই নিত্যনতুন ন্যারেটিভের কারণে হুমকির মুখে পড়েছিল বলে এদের অনেকেই মনে করেছেন। এসবের প্রভাব পড়েছিল নতুন এবং সুইং ভোটারদের মনের ওপর। কালোরা তো বটেই, অন্যান্য সংখ্যালঘুও বাইডেনের উত্থানকে দেখেছে তাদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে। কয়েকটি এক্সিট পোলে এ ধরনের মতামত দিয়েছেন তারা।

আরও একটা ব্যাপার এবারকার নির্বাচনে ঘটেছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ এবারই প্রথম ভোট দিয়েছেন। ট্রাম্পের ইমিগ্র্যান্ট এবং মাইনরিটি বিরোধী ন্যারেটিভগুলো এই যুব সম্প্রদায়কে বিরক্ত করেছে; এরা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বাবা-মা বা দাদা-দাদি-নানা-নানির থেকে আলাদা। তারা সিস্টেমিক রেসিজমকে ঘৃণা করে। এ জিনিসটি একালে অনেক বেশি দেখা যায় যা এই পনের বিশ বছর আগেও এই মাত্রায় ভাবা যেতো না। এই যুব মানসের মননকে ট্রাম্প বুঝতে পারেননি বলেই আমার ধারণা। যার ফলে নতুন ভোটারদের ৭২% বাইডেনের দিকে গিয়েছেন বলে জরিপে প্রকাশ পেয়েছে।

ট্রাম্পের চরিত্রের একটি বিশেষ দিক হলো এই যে, তিনি শুধু বর্ণভিত্তিক সংখ্যালঘু নয়, সকল সংখ্যালঘুকে অপমান করেছেন বিভিন্নভাবে। এ কারণে দেখা যায় ককেশিয়ানদের মধ্যে অনেক বেশি হারে এবার বাইডেনকে ভোট দিয়েছেন মেয়েরা, অথচ ২০১৬ সালে ট্রাম্প এদের ভোট বেশি পেয়েছিলেন। একইভাবে সেক্স অরিয়েন্টেশন ভিত্তিক সংখ্যালঘুদের নিয়ে কুৎসিত কৌতুকপূর্ণ মন্তব্য আমেরিকার ইতিহাসে কোনও প্রেসিডেন্টকে করতে দেখা যায়নি। নতুন প্রজন্মের ভোটাররা এ ধরনের চিন্তাকে শুধু যে কুসংস্কার এবং প্রগতিবিরোধী মনে করে তাই নয়, এটিকে মানবতাবিরোধী একটি ধারা হিসেবেই বিবেচনা করে। ট্রাম্প পুরনো জেনারেশন এবং নতুনদের পার্থক্য বুঝতে পারেননি বলেই মনে হয়।

মোটা দাগে এখন একটি বড় প্রশ্ন রাষ্ট্র এবং সমাজবিজ্ঞানীদের সামনে এসে দাঁড়ায়। তা হলো, ট্রাম্পের  আদর্শ থেকে বাইডেনের দূরত্ব আসলে কতটুকু? একটি বড় ছাতার আড়ালে একটু ‘বেশি’ এবং ‘কম’ পুঁজিবাদী আদর্শের এই যে যুদ্ধ সেটি কতটুকু মার্কিনি এবং বিশ্ববাসীর জন্য ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এদেশে একেকটি নির্বাচনের পর নতুন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আসেন বটে, পরিবর্তন কিন্তু তেমন হয় না; এমনকি খুব জনপ্রিয় প্রেসিডেন্টরাও এটি পারেন না। এক্ষেত্রে বারাক ওবামার কথা বলা যায়। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও ওবামা কিন্তু ইমিগ্রেশান সংস্কারের কাজটি দুই টার্মে ক্ষমতায় থাকার পরও করতে পারেননি। যদিও বাইডেন বলেছেন, তিনি তার প্রথম একশ‘ দিনের মধ্যেই এ প্রস্তাবটি সিনেটে পাঠাবেন, আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে এ নিয়ে। এই একই ব্যাপার বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মার্কিনিদের নির্বাচনি জয় পরাজয়ে প্রতিবারই মানুষ আন্দোলিত হয়, নানান সমীকরণ কষেন বিশেষজ্ঞরা, কিন্তু এ বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটার বিশেষ লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না বলেই আমার ধারণা।

লেখক: অধ্যাপক, হোমল্যান্ড সিকিওরিটি, নর্থ ক্যারোলিনা, যুক্তরাষ্ট্র    

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ