টানা দশবার দেশসেরা রাবির সাবেক শিক্ষার্থী শিরিন

  • 37
    Shares

অনলাইন ডেস্ক: ‘তোকে দিয়ে কিছু হবে না। তুই অকর্মার ঢেঁকি, অমুকের মেয়ের পা ধোয়া পানি খা গিয়ে’- ছোট সময়ে মায়ের মুখ থেকে এ কথাগুলো শোনা মেয়েটি কে জানেন? শিরিন আক্তার, যিনি দেশের সব নারীদের মধ্যে বেশি জোড়ে দৌঁড়ান। একবার দুইবার নয়, টানা ১০ বার দেশের দ্রুততম মানবী হয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি মোটেও অকর্মার ঢেঁকি নন। এ মূহুর্তে দেশে ট্র্যাকে তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো নারী আছেন নাকি?

চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ থাকলে নাকি শিরিনেরই সবচেয়ে ভালো লাগবে, ‘চাই আমাকে পেছনে ফেলার মতো মেয়েরা উঠে আসুক। তাহলে দেশের অ্যাথলেটিকসেরই লাভ। তবে আমি নিজের অবস্থনটা সহজে ছাড়ব না। যতদিন পারি শ্রেষ্ঠত্বটা ধরে রাখার চেষ্টা করব।’ বোঝাই গেল ‘দ্রুততম মানবী’ খেতাবের আগে সংখ্যাটা আরও বাড়িয়ে নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সাতক্ষীরার এ যুবতি।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এ অ্যাথলেট ট্র্যাকে এক চেটিয়া প্রাধান্য দেখিয়ে হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসে এ সময়ের বড় তারকা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিরিনের অবস্থান কী? সে প্রশ্নটা বড় নয়। বড় হলো শিরিন তো ১৬ কোটি মানুষের দেশের নারীদের মধ্যে সেরা। শিরিন বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসের সুপারস্টার।

‘আমি শিরিন আপুর মতো অ্যাথলেট হতে চাই’- অসংখ্য নতুন মেয়েদের মুখ থেকে যখন কথাগুলো শোনেন দেশের দ্রুততম মানবী, তখন নাকি তার মায়ের ওই কথাগুলো মনে পড়ে যায়। বাংলাদেশের ট্র্যাকের রাণী বলছিলেন, ‘আমি কিছুই পারব না। আমার মা পাশের বাড়ির আরেকটি মেয়ের নাম ধরে বলতেন, দেখছিস ও কত কাজ করে। ওর পা ধুয়ে পানি খা। আমার মায়ের সেই ‘অকর্মা মেয়ে’ শিরিনের মতো এখন হতে চায় অনেকে। এটা যখন ভাবি আমরা মজাই লাগে।’

Shirin-2

শিরিনের চোখে সুপার হিরো তার কৃষক বাবা শেখ আবদুল মজিদ। এই শেখ আবদুল মজিদ আর আঙ্গুরা বেগম দম্পতির কোনো ছেলে নেই, চারটি মেয়ে। শিরিন দ্বিতীয়। তার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে এবং ছোট দুইজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একসময় শিরিনদের পরিবারে কিছুটা অস্বচ্ছল থাকলেও এখন ভালোভাবেই তিন কন্যাকে নিয়ে দিন চলছে শেখ আবদুল মজিদের। পরিবারের এ ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে শিরিনের অবদান আছে বলেই লম্বা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলছেন ১১.৯৯ সেকেন্ডে ১০০ মিটার দৌঁড়াতে পারা মেয়েটি।

২০০৭ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বেরিয়েছেন ২০১৪ সালে। এখন চুক্তিভিত্তিক চাকরি করছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) থেকে ইসলামী ইতিহাস থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে এখন ক্রীড়া বিজ্ঞানে মাস্টার্সে পড়ছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাঝে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করেছেন ১০ মাসের বিপিএড কোর্স।

বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান হলেও খেলার মাঠে দ্বিতীয় কমই হয়েছেন শিরিন। সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের দৌঁড় থেকে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ট্র্যাকে জাতীয় লড়াই- শিরিন প্রথম হবেন এটা যেন নির্ধারিত। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ কি সামার অ্যাথলেটিকস- ১০০ মিটার স্প্রিন্ট শেষে শিরিনের পাশে কখনও মেজবাহ, কোন আসরে হাসান, আবার কোন আসরে ইসমাইল দাঁড়িয়েছেন। ‘নতুন রাজার পাশে পুরোনো রানী’ কিংবা ‘পুরোনো রানীর পাশে নতুন রাজা’- গণমাধ্যমে এমন শিরোনামই তো হয়ে আসছে গত অর্ধযুগ ধরে।

২০১৪ থেকে ২০২০ সাল- মেয়েদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে শিরিনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সবাই হেরেছেন। ৭ বছরে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ ও সামার মিট মিলিয়ে হয়েছে ১০ আসর, ১০ বারই শিরিন সেরা। আঙ্গুরা বেগম এখন হয়তো বলবেন না তার মেয়ে শিরিন ‘অকর্মা।’

অ্যাথলেট হিসেবে শিরিনকে যে প্রতিষ্ঠান অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তৈরি করেছে সেই বিকেএসপিতে তার ভর্তির গল্পটা তো শুনতেই হয়। বাবা-মা, বোন, পাড়া-পড়শী, স্কুলের সহপাঠী আর শিক্ষক- সবার প্রবল নিষেধের মধ্যেও কিভাবে ১০-১১ বছরের একজন কিশোরী নিজের ঐকান্তিক ইচ্ছায় ভর্তি হয়েছিলেন দেশের খেলাধুলার সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে।

শিরিন আপনিই বলুন বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার ১৩ বছর আগের গল্পটি? প্রশ্ন পেয়ে স্মৃতির ঝাপি খুলে বসলেন দেশের টানা ১০ বারের দ্রুততম মানবী, ‘ছোটবেলা থেকেই উশৃঙ্খল টাইপের ছিলাম। অনেক সাইকেল চালাতাম। আমাদের তখন গরু ও ছাগল ছিল। সেগুলোর জন্য ঘাস আনতে দূরে চলে যেতাম। সাইকেলের পেছনে বেধে নিয়ে আসতাম। আসলে ঘাস আনা নয়, আমার উদ্দেশ্য ছিল সাইকেল চালানো। বাবা পছন্দ করতে না। বাবা ঘুমালে মায়ের কাছে বলে যেতাম।

প্রাইমারি স্কুলে অনেক খেলায় অংশ নিতাম। কোনোটায় প্রথম, কোনোটায় দ্বিতীয়। তবে দৌড়ে সবসময় প্রথম হতাম। স্কুলের মাঠে তো ১০০ মিটার হতো না। ৩০ থেকে ৬০ মিটারের মতো দূরত্ব থাকত। ১০০ মিটার স্প্রিন্ট কী? জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ কী? দ্রুততম মানবী কী? এসব কি তখন বুঝতাম? দৌড়ের সময় একটা নিয়ম ছিল যিনি প্রধান অতিথি তিনি প্রথম যে হবেন তাকে ধরবেন। আমি সবসময় প্রধান অতিথি বরাবর দাঁড়াতাম। সবার আগে গিয়ে আমিই প্রধান অতিথিকে ধরে ফেলতাম। প্রথম হয়ে পুরস্কার নেবো, পুরস্কার নেয়ার সময় স্কাউটদের মতো করে প্রধান অতিথিকে স্যালুট দেবো- এসবই আমার বেশি ভালো লাগত।

Shirin

আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় ৪ মাইল দূরে। ওই স্কুলের মাঠে গিয়ে খেলতাম। স্থানীয় একজন কোচ ছিলেন, আকবর আলী স্যার। তিনি মাঠে এসে আমাদের খেলা দেখতেন। তার কাছে বছর খানেক আমরা কয়েকজন খেলা শিখতাম। তবে প্রতিদিন খেলা হতো না। যেদিন ওই স্যার বলতেন সেদিন যেতাম।

তখন আমাদের ফোন ছিল না। স্যারকে ফোন দিয়ে কিভাবে জানব যে সেদিন বিকেলে খেলা হবে কি না। ১০ টাকা ছিল আমার কাছে। মোড়ে গিয়ে ফোনের দোকান থেকে এক মিনিট কথা বললাম স্যারের সাথে, ৭ টাকা মিনিট ছিল তখন। স্যার বললেন, তুমি এখন আসতে পাারবা? পারলে আসো। তো কিভাবে যাবো ৪ মাইল? ফোন করার পর কাছে যে ৩ টাকা ছিল ওই টাকা দিয়ে যতটুকু যাওয়া যায় ভ্যানে গেলাম। বাকিটা পায়ে হেঁটে।

গিয়ে দেখি বিকেএসপির ভর্তির জন্য টেস্ট হচ্ছে। ছেলেদের সঙ্গেই দৌড়ালাম। ভালো করলাম। তারপর সাভারের বিকেএসপিতে ৭ দিনের ট্রায়ালে টিকলাম। কিন্তু ভর্তি হতে পারব সেটা ভাবিনি কখনও। কারণ জানতাম বাবা কিছুতেই রাজি হবেন না। ট্রায়াল দিতেই এসেছিলাম একটি খেলায় অংশ নেবো বলে। বিকেএসপিতে এসে এখানকার পরিবেশ দেখে আমরা মধ্যে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছিল। মনে মনে ভাবছিলাম- খেলার জন্য এত সুন্দর জায়গাও আছে?

একদিন সকালে বাবার হাতে আমার নামে আসা চিঠি দেয় পোস্ট অফিস থেকে। বাবা সেখানেই খুলে পড়েন। বাড়িতে এসে কিছু বলেননি আমাকে। মায়ের কাছে আস্তে আস্তে বলছিল। শুনেই আমি কান্না শুরু করি। কারণ চান্স পেয়েছি, ভর্তি তো হতে পারব না। বাবা রাজি নন। চিঠি যেদিন পেয়েছি তার পরদিন ভর্তি শেষ দিন। বাবা মাকে বলছিলেন, শিরিন ছোট মানুষ, কিভাবে থাকবে? বিকেএসপিতে পড়ার দরকার নেই। বাড়িতে সবাই মিলে নুন-ভাত খাবো সেটাই ভালো।

আমি তো আর ভাত খাই না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। পাশেই নানা বাড়ি, আমার দুই মামা এলেন বাবাকে বুুঝাতে। সবার মধ্যে মিটিংয়ের মতো হলো। ভর্তি হতে হলে সকালের বিকেএসপিতে পৌঁছতে হবে। মামাদের চিঠি দেখিয়ে বাবা বললেন- অনেক কিছু কিনতে হবে। মামারা সিদ্ধান্ত দিলেন শিরিন ভর্তি হোক। ছোট মামা টিকিট কিনে আনলেন রাত সাড়ে ১০ টার সাতক্ষীরা-ঢাকার বাসের।

বাসে কখন বাবার কোলে ঘুমিয়েছি, কখনও জেগে থেকেছি। বাবা বুঝাচ্ছিলেন এই বলে যে, আমরা কিন্তু ঘুরতে যাচ্ছি। বিকেএসপি দেখে আবার চলে আসব। ভোরে সাভারের নবীনগর নেমে তারপর বিকেএসপি গেলাম। কিন্তু আমরা তো চিঠিতে উল্লেখিত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নেইনি। এখন? একজন কোচের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনিও সাতক্ষীরার। আমাদের বললেন ৭ দিনের সময় চেয়ে আবেদন করে বাড়ি যাও। সবকিছু নিয়ে ৭ দিন পর এসো। তাই করলাম।

বাড়িতে ফেরার পর আবার সবার নিষেধ। স্কুলে গেলাম টিসি আনতে, স্যাররা বললেন যাওয়ার দরকার নেই। পরে বাবাকে নিয়ে যাওয়ার পর টিসি দেয় স্কুল থেকে। সবকিছু কিনে আবার বাবাকে নিয়ে বিকেএসপি এলাম ভর্তি হতে। ভর্তি হওয়ার পর বাবা যখন আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন, তখন সব আনন্দ ভুলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। বাবা তখন প্রধান গেটের কাছে চলে গেছেন। আমি এক দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললাম আমিও বাড়ি যাবো। পেছনে পেছনে এক ম্যাডাম দৌড়ে এসেছিলেন। আমাকে ধরে বলেন কী হয়েছে? আমি বললাম, থাকব না। বাবার সাথে চলে যাব। ম্যাডাম আমাকে কোলে করে নিয়ে গেলেন ভেতরে। এভাবে বিকেএসপির পথচলা শুরু ছিল আমার।’-জাগোনিউজ

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ