‘জীবন এতো সুন্দর আগে বুঝিনি’

রিমন রহমান: জীবনের সৌন্দর্য্য বোঝার বয়স হওয়ার আগেই অন্ধকার জগতে পা বাড়ান আল-আমিন। তারপর দশ বছর কেটেছে বন-জঙ্গলে। প্রকাশ্যে বাড়ি যাওয়ার সাহস ছিলো না তার। রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে বাড়ি যেতেন, রাতেই বাড়ি ছাড়তেন। সেই অন্ধকারের জগৎ ছেড়ে আল-আমিন এখন স্বাভাবিক জীবনে।

আত্মসমর্পণ করা চরমপন্থী আল-আমিন। ছবি: সোনালী সংবাদ

এখন জীবনের সৌন্দর্য্য বোঝার মতো বয়সও আল-আমিনের হয়েছে। ২৫ বছরের এই যুবক বলছেন, জীবন এতো সুন্দর তা আগে বোঝেননি। এখন খোলা আকাশের নিচে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারেন। নিজেকে আর অপরাধী মনে হয় না। ভাবেন, তিনি এখন এ সমাজেরই অংশ। সবাইকেই এখন আপন মনে হয় তার।

আল-আমিনের বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কিশমত গণকৈড় ইউনিয়নের আড়ইল গ্রামে। তার বাবার নাম আবদুল কুদ্দুস। আল-আমিন আগে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এমএল লাল পতাকার সদস্য ছিলেন। গেল বছরের ৯ এপ্রিল পাবনায় এ অঞ্চলের আরও ৫৯৫ জন চরমপন্থী সদস্যের সঙ্গে তিনিও আত্মসমর্পণ করেন। এরপর স্বাভাবিক জীবনে। এখন জীবন তার কাছে অনেক সহজ।

আত্মসমর্পণের পরই সরকারের তরফ থেকে তিনি এক লাখ টাকা অনুদান পান। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছেন আরও ৫০ হাজার টাকা অনুদান। সোমবার রাজশাহী জেলা পুলিশ লাইন্সে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা আল-আমিনের হাতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অনুদানের চেক তুলে দেন। এ দিন রাজশাহী মহানগরী, জেলার বাগমারা, পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলার মোট ৫৭ জনকে অনুদান দেয়া হয়।

সে অনুষ্ঠানেই আল-আমিন জানান, ২০০৮ সালে যখন তার বয়স ১৩ বছর তখনই জড়িয়েছিলেন চরমপন্থী দলের সঙ্গে। চরমপন্থী দলে তার কাজ ছিলো পত্রবাহক। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চিঠি নিয়ে যেতেন। বিষয়টি গোপন থাকেনি। তার কার্যক্রম জানতে পেরে হন্য হয়ে খুঁজতে থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আত্মগোপনে যান আল-আমিন। এভাবেই কাটছিল জীবন। তারপর সুযোগ পেয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

আল-আমিন বলেন, যখন তিনি এলাকার এক বড় ভাইয়ের হাত ধরে চরমপন্থী দলে যুক্ত হন তখন তিনি স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় সবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছেন। ওই সময় তাদের এলাকায় অনেকেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দেখতেন, যারা চরমপন্থী দলে যুক্ত তাদের এলাকায় খুব দাপট। তাদের ভয়ে কেউ কিছু বলত না। আল-আমিনের দাবি, চরমপন্থীরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করত। সেটি তার ভালো লাগত। আর সে কারণেই তিনি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। কিন্তু পরবর্তীতে বোঝেন ভুল পথে পা বাড়িয়েছেন তিনি।

আল-আমিন বলেন, যেহেতু আমি ছোট ছিলাম তাই সরাসরি আমি কোনো হত্যাকাণ্ড বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আমাকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হয়নি। তবে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল চিঠিপত্র বহনের। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চিঠি নিয়ে যেতাম। এ কাজটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চরমপন্থীরা মোবাইল ফোনে কথা বলত না। আমাকে বিশ্বাস করত বলেই এই কাজটা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব করতে গিয়েই আমার জীবনটা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায়। ফেরার পথ খুঁজছিলাম। পাচ্ছিলাম না। শেষে সরকার আত্মসমর্পণের সুযোগ দিলে রাজশাহীর আরও ৫৬ জনের সঙ্গে আমিও আত্মসমর্পণ করি। এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে, জীবন অনেক সুন্দর। এটা আগে কখনও বুঝিনি।

আল-আমিন জানান, আত্মসমর্পণের পরই এক লাখ টাকা অনুদান পান। সেই টাকায় পুকুর করছেন। নতুন করে পাওয়া ৫০ হাজার টাকা হাতেই রেখেছেন। আরও একটা পুকুর নিতে চান। মাছ চাষ করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান। সমাজের আর দশজন মানুষের মতো তিনিও বাঁচতে যান।

রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শহিদুল্লাহ বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে এক সময় চরমপন্থীদের ব্যাপক তৎপরতা ছিলো। কয়েক বছর ধরে তারা অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। কারণ, তখন তারা ভুল পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ খুঁজছিলেন। তারপর আত্মসমর্পণের সুযোগ দিলে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। এখন সবাই ভালো আছেন। সরকারের সহায়তায় তারা দেশের উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করছেন।

সোনালী সংবাদ/আর.আর

শর্টলিংকঃ