ঘুষ কেলেঙ্কারির পর পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সাব-রেজিস্ট্রার

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী সদর সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। সদর সাব-রেজিস্ট্রার জামিনুল হক অতিরিক্ত টাকা ছাড়া দলিলে হাতই দেন না। অবশ্য একটি ঘুষ কেলেঙ্কারির কথা জানাজানি হওয়ার পর তিনি এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে তিনি অফিস করছেন না।
এরই মধ্যে গত ৫ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের একটি দল জামিনুলের অফিসে হানা দেয়। কিন্তু জামিনুল অফিসে ছিলেন না। সেদিন দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত বছরের ২৮ নভেম্বর থেকে জামিনুল অফিসে আসেননি। সেদিন অসুস্থতার অযুহাতে দরখাস্ত দিয়ে গেছেন তিনি।
এদিকে গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকেও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গিয়ে জামিনুলকে পাওয়া যায়নি। সেখানকার কর্মচারীরাও তার অনুপস্থিতির বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি। অফিসে জেলা রেজিস্ট্রার ইলিয়াস হোসাইনকেও পাওয়া যায়নি। তার দপ্তরের কর্মচারীরা জানিয়েছেন, রোববার থেকে তিনিও ছুটিতে। পুরো সপ্তাহ ছুটি কাটাবেন। আগামী রোববার থেকে তাকে অফিসে পাওয়া যাবে।
গত ৫ মার্চ অভিযানের পর দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত বছরের ২৭ নভেম্বর রাজশাহী মহানগরীর আলম ফিলিং স্টেশনের মালিক আজিজুল আলমের চারটি দলিল সম্পাদনে ৪৮ হাজার টাকা ঘুষ নেন সাব-রেজিস্ট্রার জামিনুল হক। ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি জানাজানি হলে পরের দিনই তিনি অসুস্থতার দরখাস্ত দিয়ে চলে যান। আর অফিসে আসেননি। তাকে দুদক খুঁজছে।
দুদক আরও জানায়, জামিনুল হক প্রতিদিন চার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে রাজশাহী পর্যটন মোটেলে ভিআইপি লাউঞ্জে অবস্থান করেন। বিমানে ঢাকায় যাতায়াত করেন। তিনি পর্যটন মোটেলেই কমিশনে দলিল সম্পাদন করতেন। আর পকেটে পুরতেন ঘুষের টাকা। এ বিষয়ে কথা বলতে জামিনুলের মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জামিনুল হক এর আগে ঢাকার ধানমন্ডির সাব-রেজিস্ট্রার ছিলেন। তারও আগে ছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায়। এসব এলাকাতেও তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে তাকে বার বার বদলি করা হয়। শেষে তিনি আসেন রাজশাহীতে। শ্রীপুরে থাকাকালে ঈদের বোনাস হিসেবে তিনি দলিল প্রতি ৭ হাজার টাকা করে ঘুষ দাবি করেছিলেন। দলিল লেখকরা রাজি না হলে তিনি দলিল সম্পাদন বন্ধ করে দেন। এর জের ধরে সেখানকার দলিল লেখকরা তাকে অবরুদ্ধ করে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ ঘটনায় জামিনুল হক থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেছিলেন। এরপরই তাকে শ্রীপুর থেকে ঢাকায় বদলি করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শ্রীপুরে থাকাকালে জামিনুল হক ফারুক হোসেন নামের একজন এক্সট্রা মেহরাবের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করেন। রাজশাহীতে টাকা আদায় করেন ফিরোজ, শামিম রেজা ও রহিদুল নামে তিন ব্যক্তির মাধ্যমে। টাকা ছাড়া তিনি কোনো কাজেই হাতে দেন না। দলিল লেখকদেরও জিম্মি করে হয়রানি করতেন তিনি।
অনিয়ম দুর্নীতি করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার জামিনুল হক। ঢাকার মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটিতে তার রয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ধানমÐিতেও আছে আরেকটি ফ্ল্যাট। আছে দামি গাড়ি। এছাড়া লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মধুপুর এলাকায় গোল্ডেন গেট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে তার একটি স্কুল রয়েছে। ঢাকার দুদক তার অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি তদন্ত করছে। এরই মধ্যে রাজশাহী দুদকও তার কার্যালয়ে হানা দেয়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে সাব-রেজিস্ট্রার জামিনুল প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে অফিসেই আসছেন না। এ অবস্থায় তার কাছে থাকা শতাধিক বালাম বহি আটকে আছে স্বাক্ষরের জন্য। এছাড়া ৩২৮টি দলিলও পড়ে আছে তার দপ্তরে। সার্টিফায়েড কপি না পেয়ে চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন জমির ক্রেতারা। তবে তার জায়গায় অন্য একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে এখন কাজ করাচ্ছেন জেলা রেজিস্ট্রার ইলিয়াস হোসাইন।
মোবাইলফোনে যোগাযোগ করে জামিনুলের অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা রেজিস্ট্রার ইলিয়াস হোসাইন বলেন, তিনি একদিন অফিসে এসে দুই সপ্তাহ ছুটির জন্য দরখাস্ত জমা দিয়েছিলেন। এক-দুই দিন হলে আমি ছুটি দিতে পারতাম। এতোদিন তো আমি ছুটি দিতে পারি না। কিন্তু ছুটির দরখাস্ত দিয়েই তিনি অফিসে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। সাড়ে তিন মাস ধরেই তিনি অনুপস্থিত।
তিনি কোথায় আছেন, কী করছেন বা কেন আসছেন না তা জানেন না জানিয়ে জেলা রেজিস্ট্রার ইলিয়াস বলেন, অফিসে অনুপস্থিত থাকার কারণে জামিনুলকে শোকজ করা হয়েছে। শোকজের জবাবও আসেনি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পলাতক সাব-রেজিস্ট্রার জামিনুলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ আছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সেগুলোর প্রমাণও পাওয়া গেছে। বিষয়টি কমিশনকে জানানো হবে। সেখান থেকে যে ধরনের নির্দেশনা আসবে সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শর্টলিংকঃ