কয়েদি থেকে প্রধানমন্ত্রী

  • 1
    Share

অনলাইন ডেস্ক: সরকারি কর্মকতাকে গুম করার অপরাধে সাড়ে ১১ বছরের জেল হয়েছিল। কয়েকদিন আগেও ছিলেন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। কিন্তু সেই তিনিই আজ কিরগিজস্তানের প্রধানমন্ত্রী। বলা হচ্ছে বুধবার দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়া সাদির জাপারভের কথা। কয়েদি থেকে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খবরে রীতিমত অবাক হয়েছেন দেশটির রাজনীতি বিশ্লেষকরা। কেউই ঠিক বুঝতে পারছেন না ঠিক কিভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন।

বির্তকিত জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের দাবিতে হওয়া বিক্ষোভের সময় কারাগারের ফটক ভেঙে জাপারভ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি আলমাজবেগ আতামবাহেবকে বের করে আনে বিক্ষোভকারীরা। একই সময় পার্লামেন্ট ভবনের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তারা। ওই বিক্ষোভে একজন নিহতের পাশাপাশি আহত হয়েছিল শতাধিক।

অভিযোগে উঠেছে, এই বিক্ষোভের পেছনে জাপারভের হাত আছে। তিনি ক্ষমতার মসনদে বসতেই তার সমর্থকদের দিয়ে দেশে এমন অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন। কিরগিজস্তানের শিক্ষাবিদ আছেল ডোলোতকেদিএভা বলছেন, ‘আমি মনে করি, কেউই বলতে পারবে না যে ঠিক কিভাবে জাপারভ কয়েদী থেকে হঠাৎ দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেল। কিভাবে এটি সম্ভব? কেউ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না, এটা আসেলে সবার জন্য একটা রহস্য হয়ে থাকল।’ অধ্যাপক আছেল বলেন, ‘আমরা জানি না, আদতে এটা জাপারভের সমর্থকের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের ফলাফল ছিল কিনা? নাকি এই বিপ্লবের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের ফায়দা লুটতে চায়?’

আছেলের সঙ্গে সূর মিলিয়ে একই কথা বলছেন দেশটির রাজনীতি পর্যক্ষেকরা। তারা বলছেন, ‘একজন অপরাধী ও নিম্ন পর্যায়ের একজন রাজনীতিবিদকে ক্ষমতার মসনদে বসানোর পেছনে নিশ্চিতভাবে কেউ পরোক্ষভাবে কলকাঠি নাড়ছে।’ তবে আছেল বলেছেন, জাপারভ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ (কুমটোর স্বর্ণ খনি) নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। তার দাবি ‘একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ অবশ্যই ওই দেশের জনগণের সম্পদ। আর যারা এই সম্পদকে বাচাঁতে চাইবেন তখন তার জনপ্রিয়তা অবশ্যই বাড়বে। এই বিষয়টিকে পুঁজি করে জাপারভ ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন। উত্তর থেকে দক্ষিণে এখন সর্বত্রই তার জনপ্রিয়তা।’

সাবেক রাষ্ট্রপতি কুরমানবেগ বাকিএবের সমর্থক হিসেবে ২০০৫ সালে দেশটির সংসদে নির্বাচিত হন জাপারভ। সেই সময় জাপারভ ‘কিরগিজস্তান দুর্নীতি বিরোধী’ সংস্থার কমিশনার ছিলেন। কিন্তু ব্যাপক আকারে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ২০১০ সালে পদত্যাগ করেন বাকিএব।

কুমটোর স্বর্ণ খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালীন এক রাজ্যর গভর্নরকে জিম্মি করার অপরাধে ২০১৩ সালে দেশটির আদালত জাপারভকে সাড়ে এগার বছর জেল দেয়। কিন্তু জাপারভকে গ্রেপ্তারের আগেই তিনি পাশ্ববর্তী দেশ কাজাখাস্তানে পালিয়ে যান। পরে ২০১৭ সালে তাকে কাজাখাস্তান-কিরগিজিস্তানের সীমানা থেকে আটক করে জেলে পাঠানো হয়।

জানা গেছে, পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার মিরলান বাকিরভ নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাপারভের নাম প্রস্তাব করেন। মিরলান মেকেনিম কিরগিজস্তান নামে একটি দলের সদস্য। দলটির সঙ্গে কুখ্যাত কিংমেকার রায়েমব্যাগ মাতরাইমভের সম্পৃক্ততা আছে।

এদিকে তার ক্ষমতা গ্রহণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দেশটির প্রেসিডেন্ট সুরুনবায় জিনবেকভ পদত্যাগ করেছেন। বৃহস্পতিবার বিতর্কিত পার্লামেন্টারি নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট সংকটের অবসান চান উল্লেখ করে এই পদত্যাগের ঘোষণা তিনি দেন।

প্রেসিডেন্টের কার্যালয় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জিনবেকভ বলেছেন, আমি ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চাই না। আমি চাই না নিজ দেশের জনগণকে রক্তপাত ও গুলির অনুমতি দেওয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে।

উল্লেখ্য, কুমটোর স্বর্ণ খনি মূলত কিরগিজস্তানের ইশিক-কুল অঞ্চলে অবস্থিত একটি উন্মুক্ত স্বর্ণ খনি। রাজধানী বিশেকেক থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার (২২০ মাইল) দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই খনিটি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার মিটার (১৪,০০০ ফুট) উঁচুতে তিয়ান সান পর্বতমালায় অবস্থিত কুমটোর স্বর্ণ খনি হচ্ছে পেরুতে অবস্থিত ইয়ানোকচা স্বর্ণ খনির পরে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্বর্ণের খনি।

কুমটোর এই খনিটির পূর্ণ মালিকানাধীন কানাডার সেন্টেরা নামে একটি খনি কোম্পানির। খনিটি ১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করে এবং ৩১ মার্চ ২০১৫ সালের মধ্যে ১ কোটি আউন্সেরও (৩১১০০০ কেজি) বেশি স্বর্ণ উৎপাদন করে। গেল ২০১২ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে কিরগিজ সংসদে প্রয়োগগত, পরিবেশগত, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং জনসাধারণের আদর্শমানের সাথে কুমটোরের সম্মতি পর্যালোচনা করার জন্য একটি রেজ্যুলিউশনের প্রস্তাব করে। তবে কুমটোর খনিকে জাতীয়করণের পক্ষে ভোট দিতে সামান্য বাধা ছিল। পরে সংসদ সদস্যরা সরকারকে সেন্টেরার সঙ্গে চুক্তিটি সংশোধন করার জন্য নির্দেশ দেয়। বর্তমানে, কিরগিজিস্তানের সেন্টেরার সাথে ৩২.৭% শেয়ার রয়েছে। তবে সেন্টেরা এই খনি এখন পর্যন্ত তাদের দখলে রেখেছে।

আল জাজিরা থেকে অনূদিত।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ