ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর ৫ দফা নির্দেশনা

সোনালী ডেস্ক: ৮ম জাতীয় এসএমই পণ্যমেলা ২০২০ উদ্বোধন করে দেশের সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি এই শিল্প খাতকে (এসএমই) এগিয়ে নিতে ৫ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমাদের এসএমই খাতে উৎপাদিত অনেক পণ্য বিশ্বমানের। এগুলোর সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জড়িত। কাজেই এই এসএমই খাত উন্নয়নে আমাদের বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে (কেআইবি) আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৯ দিনব্যাপী এই মেলার উদ্বোধন করেন। এসএমই পণ্যের (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) প্রচার এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের এক ছাদের নিচে নিয়ে আসার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ বছর ৮ম জাতীয় এসএমই পণ্য মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এসএমই খাতের উন্নয়নে করণীয় হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ৫ দফা নির্দেশনার উল্লেখ করে বলেন, আমাদের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের পাশাপাশি উন্নত বিশ্বে ভোক্তাদের চাহিদা-নির্ভর শতভাগ রপ্তানীমুখী পণ্য উৎপাদনে মনোনিবেশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশজ কাঁচামাল ব্যবহার করে ভারী শিল্পের পরিপূরক পণ্য এসএমই শিল্পের মাধ্যমে প্রস্তুত করতে হবে। তৃতীয়ত, এসএমই শিল্পের মাধ্যমে সুনীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে হবে। চতুর্থত, কেউ যাতে আমাদের আর সস্তা শ্রমের দেশ মনে না করে। সেজন্য আমাদের দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করতে হবে এবং উচ্চতর মূল্য সংযোজনের লক্ষ্য নিয়ে স্বল্প উৎপাদন খরচের সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির সংযোগ ঘটিয়ে গেøাবাল ভ্যালু চেইন’র অংশীদার হতে হবে।
প্রযুক্তি নির্ভর এসএমই খাত গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর নির্দেশনায় বলেন, আমাদের দেশীয় বিজ্ঞানী ও গবেষকগণ ডিজিটাল, বায়োলজিক্যাল ও ফিজিক্যাল উদ্ভাবনে এগিয়ে রয়েছেন। ভবিষ্যতে উদ্ভাবনী এই তিন ধারার সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে। দেশের মাটিতে তা করতে পারলেই আমরা আসন্ন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারব। শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আমির হোসেন আমু অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। শিল্প সচিব আব্দুল হালিম এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ৫ জন শিল্প উদ্যোক্তার মাঝে ‘এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার-২০২০’ প্রদান করেন। পুরস্কার বিজয়ীরা প্রত্যেকে এক লাক টাকা পুরষ্কারের অর্থের চেক, ট্রফি এবং সনদপত্র লাভ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এসএমই ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে সারাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ১৭৭টি ক্লাস্টার চিহ্নিত করেছে এবং উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এসব ক্লাস্টারের উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সুবিধাদি বৃদ্ধির জন্য যা যা প্রয়োজন সেসব ধরনের সহায়তাও তাঁর সরকার প্রদান করবে, বলেন প্রধানমন্ত্রী। ব্যাংক ঋণে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনাকেও গুরুত্বপূর্ণ আখ্যায়িত করে বিষয়টির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে আগামীতে নারী উদ্যোক্তাসহ এসএমইখাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তিতে সুবিধা হবে।
উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সরকারের বিনাজামানতে ব্যাংক ঋণ কর্মসূচির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে বিনাজামানতে সরকার নবীন উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা প্রদান করছে। এসএমই ফাউন্ডেশন থেকেও ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, নিজস্ব বাজার সৃষ্টি করতে হবে। সেই সাথে সাথে নতুন নতুন বাজার অন্বেষণ করতে হবে। কোথায় আমরা নতুন বাজার পেতে পারি, কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা বেশি সেটা খুঁজে বের করা এবং সেই ধরনের পণ্য উৎপাদন করা। সেই উদ্যোগ নিতে হবে। পণ্য বাজারজাতকরণে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধান করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজারজাত করা একটা সমস্যা। সে জন্য বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে কাঁচামাল প্রাপ্তি নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরা যে ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুলবো তার যে কাঁচামাল তার চাহিদা কিভাবে পূরণ হবে সেটা আমাদের দেখতে হবে, এই কাঁচামাল প্রাপ্তি ও নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাশন ডিজাইন এবং পণ্য উৎপাদনে ঋতু বৈচিত্রের বিষয়টি মাথায় রাখার ওপর ও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ-বিদেশে সবখানেই সবাই দক্ষ জনশক্তি চায়। সেই দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা ১৯৫৬ সালে বাণিজ্য, শিল্প, শ্রম ও ভিলেজ এইড মন্ত্রী ছিলেন। তিনি মাত্র আট মাস এ দায়িত্ব পালন করেন। তারপর মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলকে শক্তিশালী করার কাজে মনোনিবেশ করেন। তিনি বলেন, জাতির পিতা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প আইন (১৯৫৭) প্রণয়নে মুখ্য ভ‚মিকা পালন করেন এবং দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্বেই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন।
জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আওয়ামী লীগ সরকার দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে এসএমই শিল্প বিকাশে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

শর্টলিংকঃ