ক্যাপাসিটি পেমেন্টের কারণেই বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম

সোনালী ডেস্ক: ক্যাপাসিটি পেমেন্টের কারণেই বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। সরকারি হিসেবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৩ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু গ্রীষ্মে চাহিদা হতে পারে সর্বোচ্চ ১৩ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র বেশি রয়েছে। ওই কেন্দ্রগুলো না চালালেও ঠিকই ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পরিশোধ করতে হয়। এবার যে কারণে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট।
উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেয়ার কারণে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। তাতে করে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়েছে। পিডিবির হিসাবে চলতি বছরের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি হবে ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তার মধ্যে সরকার ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে সম্মত হয়েছে। বাকি অর্থ গ্রাহকের কাছ থেকে দাম বাড়িয়ে তুলে দিচ্ছে বিইআরসি। জ¦ালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাড়তি খরচের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দেশের অদক্ষ সকল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার আদেশ দিয়েছে। পিডিবির অদক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্যই ৩১ বছর অতিক্রান্ত হলেও সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলছে। মূলত উৎপাদনে অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য খরচ বৃদ্ধির কারণেই বিইআরসি ওসব কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে বলেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি শেষ হওয়ার পর চুক্তি নবায়ন না করার পাশাপাশি কেন্দ্রগুলোকে অবসরে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিইআরসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর ২০ হাজার ৩১ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হবে। ইউনিট প্রতি ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হবে ২ দশমিক ৯৪ টাকা। ওই ক্যাপাসিটি পেমেন্টের একটি বড় অংশই বিদ্যুত কেন্দ্র না চালিয়ে কেন্দ্রগুলো নিয়ে যাবে। অথচ পরিকল্পিতভাবে কেন্দ্র নির্মাণ করলে বিদ্যুৎ খাত বিশাল ওই ঘাটতিতে পড়তো না। এখন যে দাম রয়েছে তাতে লোকসানের বদলে পিডিবি লাভে থাকতো।
সূত্র আরো জানায়, বিইআরসি আদেশ পিডিবির কাছে বরাবরই গুরুত্বহীন। ইতিপূর্বে ২০১৭ সালে কমিশন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির আদেশের সঙ্গে ১৪০ মেগাওয়াটের চারটি বিদ্যুত কেন্দ্র বন্ধের আদেশ দিয়েছিল। কিন্তু পিডিবি ওই আদেশ বাস্তবায়ন করেনি। কেন্দ্র চারটি হচ্ছে ভেড়ামারা-৬০ মেগাওয়াট, সৈয়দপুর-২০ মেগাওয়াট, রংপুর-২০ মেগাওয়াট এবং বরিশাল-৪০ মেগাওয়াট। কারণ বছরের বেশিরভাগ সময় ওই চারটি কেন্দ্র কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। তাছাড়া ওসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বেশি। তারপরও কেন্দ্রগুলো অবসরে দেয়া হচ্ছে না।
এদিকে অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ না করা প্রসঙ্গে পিডিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, ওসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে যারা চাকরি করছেন তাদের কি হবে ওই বিবেচনা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করা হচ্ছে না। অদক্ষ ওসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার বিষয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হলেও ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে পিডিবি। বিষয়টির সঙ্গে পিডিবির শ্রমিক রাজনীতি সম্পৃক্ত। পুরাতন বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে পিডিবির এক শ্রেণীর কর্মকর্তা নানাভাবে ব্যবসার হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করে। কারণ একটি পুরাতন কেন্দ্র ওভারহোলিং বা সংরক্ষণের জন্য বছরে যে পরিমাণ ব্যয় দেখানো সম্ভব, নতুন কেন্দ্রের জন্য তা সম্ভব নয়। কেন্দ্রগুলো সংস্কারের কথা বলে বছরে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়া খুবই সহজ। সঙ্গত কারণেই ওই কেন্দ্রগুলো বন্ধ হলে পিডিবির শীর্ষ কোনো কোনো কর্মকর্তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। সেজন্যই তারা ওই পুরাতন কেন্দ্রগুলো বন্ধ করতে চায় না।
অন্যদিকে এক হাজার ২৯৪ মেগাওয়াট সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়ে দেখা গেছে ওসব কেন্দ্রের বয়স ৩১ বছর পেরিয়ে গেছে। তারপরও কেন্দ্রগুলো চালানো হচ্ছে। ওসব কেন্দ্রের মধ্যে ঘোড়াশালের চারটি ইউনিট রয়েছে। চারটি সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫৩০ মেগাওয়াট। চারটি ইউনিটই সিম্পল সাইকেল। চারটি ইউনিটের মধ্যে ঘোড়াশাল-১ এবং ২ নাম্বার ইউনিটের আয়ুস্কাল বহু আগে শেষ হয়েছে। ফলে ইউনিট দুটিকে অবসরে পাঠানো উচিত বলে মনে করছে কমিশন। এর বাইরে অন্য ৩ এবং ৪ নাম্বার ইউনিট রিপেয়ারিং বা সংস্কার করে কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তর করা হচ্ছে। এর বাইরে আশুগঞ্জের ৫টি বিদ্যুৎ ইউনিট রয়েছে। ওই কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ পর্যায়ক্রমে ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ হবে। কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ শেষ হচ্ছে যথাক্রমে ১৭ ডিসেম্বর ২০২১, ৫ এপ্রিল ২০২২ এবং ২১ মার্চ ২০২৩। কমিশন বলছে ক্রয় চুক্তি শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রগুলোকে অবসরে পাঠাতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বিইআরসি চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল জানান, কমিশন স্পষ্টভাবেই বলেছে, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর নতুন করে তা নবায়ন করা যাবে না। তাছাড়া কমিশন যেখানে গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে তরল জ¦ালানি নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ না করার পরামর্শ দিয়েছে।

শর্টলিংকঃ