করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা কী তোষামোদের ফল!

মেরিনা মোকাদ্দেস মুক্তা:

‘..সাধারণ জনগণ হিসেবে অন্তত এবার উচিত ছিল আমাদের নিজেদেরও সরকারি বিধি-নিষেধ মানা। কিন্ত তা আমরা মানতে পারিনি। এদেশের মানুষের পেটে ক্ষুধা, মনে ক্ষুধা; এত ক্ষুধা নিয়ে কি ঘরে বসে থাকতে পারে তারা! তাই তো কেউ পেটের ক্ষুধার জ্বালায় বের হয়, আর কেউ মনের ক্ষুধার মানে টাকার ক্ষুধার জ্বালায় স্বেচ্ছায় নিজেদেরকে বের করে।’

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে সংক্রমণের ৫০তম দিন পার করছে গত গত ২৬ এপ্রিল। ৫০তম দিন পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৪১৬ জন। মৃত্যুবরণ করেছেন ১৪৫ জন। আর সুস্থ হয়েছেন ১২১ জন। তার মানে বাংলাদেশেই পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যে দেশের করোনায় সুস্থের চেয়ে মৃতের সংখ্যা বেশী।

গত ৮ মার্চ ৩ জন শনাক্ত হওয়ার পর দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয় ১৮ মার্চ থেকে। আর সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ছুটি শুরু হয় ২৫ মার্চ।তবে গণপরিবহনসহ সকল পরিবহন বন্ধ করতে আরও বেশিদিন সময় নেয় সরকার। বিমানের ফ্লাইটসমূহও পুরোপুরি বন্ধ করা যায় নি তখনও। এরই মধ্যে গত ৪ ও ৫ এপ্রিল পোশাক কারখানা খুলবে বলে লাখো শ্রমিক সারাদেশ থেকে ঢাকামুখী হয়।

দেশের নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সঠিকভাবে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এরই মাঝে উঠে এসেছে স্বাস্থ্য বিভাগের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর সক্ষমতার অভাব। আর ত্রাণ চুরির যেন নতুন এক সুযোগ পেয়েছিল কিছু মানুষ নামের অমানুষ। এরই মধ্যে দেশের সকল জেলার সাথে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সে ছিল তোষামোদি। কারণ সেই কনফারেন্সগুলোতে প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কষ্টের কথা তুলে ধরতে ভুলে গিয়েছেন।

বাড়িভাড়া, দোকানভাড়া, মেসভাড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে দ্বি-পাক্ষিক সমঝোতার বিষয়ে আসেনি কোনো আলোচনা। এরই মধ্যে ৪০ টাকার চাল হয়েছে ৫০ টাকা, ৭০ টাকার মোটা মসুর ডাল ১০০ টাকা, ৭০ থেকে ৮০ টাকার ছোলা হয়েছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা। পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়েছে। আগুন লেগেছে মশলার বাজারেও। বেসরকারি চাকরিজীবীরা অনেকেই বেতন পাচ্ছেন না।

এদিকে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, সেনাবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবকরা মানুষকে সেবা দিতে গিয়ে তারা নিজেরাও করোনায় আক্রান্ত। তবুও তাদের জন্য মানসম্মত খাবারেরও ব্যবস্থা করার ব্যর্থতা! এরই মধ্যে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করলেও অনাহারী মানুষগুলো আজও ত্রাণের চাল গাড়ি থেকে লুট করে দোষী হচ্ছেন। এরই মধ্য মুসলিম অধ্যুষিত দেশে এসেছে মাহে রমজান।

৫০তম দিনের পর সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় খুলে দেয়া হলো, পোশাক কারখানা চালু হলো। এর জন্য আমাদের কী কোনো বড় মাসুল দিতে হবে? দেশের এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশী দায়িত্বশীল ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়ার কথা ছিল স্বাস্থ্যবিভাগের প্রধানের। যিনি পুরো বিষয়টি এবং এর ভয়াবহতা দেশের প্রধানমন্ত্রী ও সকলের কাছে তুলে ধরবেন।

আর সাধারণ জনগণ হিসেবে অন্তত এবার উচিত ছিল আমাদের নিজেদেরও সরকারি বিধি-নিষেধ মানা। কিন্ত তা আমরা মানতে পারিনি। এদেশের মানুষের পেটে ক্ষুধা, মনে ক্ষুধা; এত ক্ষুধা নিয়ে কি ঘরে বসে থাকতে পারে তারা! তাই তো কেউ পেটের ক্ষুধার জ্বালায় বের হয়, আর কেউ মনের ক্ষুধার মানে টাকার ক্ষুধার জ্বালায় স্বেচ্ছায় নিজেদেরকে বের করে।

পরিসংখ্যান কিন্তু দেখাচ্ছে ৫০ তম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রান্ত ছিল ৫ হাজার ১৮ জন। তবে কী কোনো এক অপ্রত্যাশিত, অশনিসংকেত আগামীতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে! বাংলাদেশে কী তবে দায়িত্বশীল ও বিচক্ষণ ব্যক্তির সত্যি সংকট দেখা দিলো? জানি শেষের এই প্রশ্নগুলো সবার মনেই আছে। তবে আমরা তা বলতে পারিনা, পারবো না।

সবকিছু রাজনৈতিক ভাবে দেখানো হয় বা বিশ্লেষণ করা হয়। যাতে করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভালো ইমেজ আসে। সে হোক আমলাদের বা রাজনৈতিক নেতাদের। আর এই কতিপয় সামান্য কিছু ব্যক্তির জন্য দেশের করোনা পরিস্থিতিতে বাস্তবিক অর্থে এক ধরনের ব্যর্থতা দেখা দিচ্ছে।

পরিতাপের বিষয় কেউই আত্মোপলব্ধি করছেন না।ভয়াবহতা কতটা ছড়িয়ে যেতে পারে। তবে কী বলতেই হয়- বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র তোষামোদের আড়ালে চাপা পড়ছে। তবুও প্রত্যাশা জনগণ, আমলা ও সরকার সকলে একসাথে এ মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হবো আমরা।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাবি

সোনালী সংবাদ/এইচ.এ

শর্টলিংকঃ