করোনায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

তৈয়বুর রহমান: করোনা মহামারিতে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ছুটি বেড়েই চলেছে। ক্লাসে যেতে না পারায় হাঁপিয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। একদিকে করোনা সংক্রমণ অপরদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত তারা। এ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা।

কবে করোনা যাবে, কবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে, সেটা কেউই বলতে পারছেন না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকতে চায় না শিক্ষার্থীরা। তারা ক্লাস করতে চায়। কিন্তু দিনের পর দিন স্কুল-কলেজে যেতে না পেরে হতাশ শিক্ষার্থীরা। সব মিলিয়ে করোনায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

মহামারি করোনার কারণে চলতি বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। ফলে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অটোপাস দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিগগিরই এ সংক্রান্ত ঘোষণা আসতে পারে বলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিও) থেকে জানা গেছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে আগামী ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন করে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে এ বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আশা নেই।

করোনাভাইরাসের কারণে এবারের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) বা সমমানের পরিক্ষার্থীদের আটোপাস দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এইচএসসির মূল্যায়নের কাজটি করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি আবার বাড়ানোর ফলে আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সঙ্কট আরও বেড়ে গেছে। সাধারণত প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি ও এপ্রিলে এইচএসসি পরীক্ষা হয়। এসএসসির শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের কাজ হয়ে থাকে নভেম্বরে। আর ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের একই কাজ হয়ে থাকে।

ছুটি বাড়ানোর কারণে এ দুটি কাজ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে আগামী বছরের পরীক্ষা দুটিও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রাক-নির্বাচনি এবং নির্বাচনি উভয় পরীক্ষা বাতিল হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এসব পরীক্ষার্থীর একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষাও হয়নি। একাদশ শ্রেণিতে কলেজ পর্যায়ে নেয়া বিভিন্ন ক্লাস টেস্ট আর অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে তাদের ‘অটোপাস’ দেয়া হয়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক জিয়াউল হক বলেন, এ সময়ে শিক্ষা বোর্ডগুলো পরবর্তী এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে কাজ করে থাকে। নতুন ছুটির বিষয়টি সামনে আসায় আসন্ন বছরের এ দুটি পরীক্ষা নিয়ে নতুনভাবে পরিকল্পনা করা হবে। এক্ষেত্রে তাদের অসম্পূর্ণ শ্রেণিকাজ, লেখাপড়া, বিভিন্ন পরীক্ষা ইত্যাদি বিবেচনায় আসবে। পরীক্ষা পেছানো হবে কিনা সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো চিন্তা করা হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পর এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

এদিকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মশিউজ্জামান বলেন, যৌক্তিক কারণেই এসএসসি ও এইচএসসির সিলেবাস-শিক্ষাক্রম কমানোর সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে গোটা পাঠ্যবই শেষ করেই পরীক্ষা হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে এই করোনার মধ্যে ক্লাস না হওয়ায় এখন সিলেবাস শেষ করতে কতদিন লাগবে তা বলা যাচ্ছে না। তবে সেটা হয়তো স্কুল-কলেজ খোলার পর জানা যাবে। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পর শিক্ষার্থীদের অধ্যয়ন এবং মূল্যায়ন শেষে পরীক্ষা বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে জানালেও দিনক্ষণ বলতে পারেননি। কিন্তু অনলাইনে ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের সিলেবাস শেষ করা যাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।

এ সম্পর্কে রাজশাহী জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও তেরখাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক লিয়াকত কাদির কুমকুম বলেন, স্কুল-কলেজ বন্ধ। কবে তা খুলবে এ নিয়ে প্রতিনিয়তই শিক্ষার্থীদের চাপ বাড়ছে। তারা স্কুল খোলার কথা বলছে। দীর্ঘদিন ক্লাসের বাইরে থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার প্রতি অমনোযোগিতা বাড়ছে। ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। নানা ধরনের শ্রমের সাথে যুক্ত হচ্ছে। করোনা প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়লেও তাদের ঘরে রাখা যাচ্ছে না। করোনা সংক্রমণ থেকেও রক্ষা করা যাচ্ছে না। এ নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজ দুশ্চিন্তায় আছেন। এ অবস্থায় বিকল্প হিসেবে শিক্ষার্থীদের শিফটিং করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস নেয়া যেতে পারে। চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খণ্ডকালীন চালু রেখে পাঠ্যক্রম চালানো যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এতে যেমন শিক্ষার্থীরা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে, শিক্ষা কার্যক্রমও চালু রাখা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া যেতে পারে।

রাজশাহী কলেজের মাস্টার্স-এর রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান মৌ বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এতে শিক্ষার্থীদের লেখা-পড়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। করোনায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি আবার বেড়েছে। বহুদিন ক্লাস করতে পারিনি। সহপাঠিদের এক সাথে থাকার, ক্লাস চলাকালীন শিক্ষকের আলোচনা, ক্লাসের উৎসবমুখর পরিবেশের আনন্দ উপভোগের সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হচ্ছি আমরা। সারাদিন বাইরে ঘোরা আর বাড়িতে টেলিভিশন দেখা এসব কিছু ছাত্রদের কাছে একঘেয়েমি হয়ে উঠেছে। এসব কিছু আর ভাল লাগে না। এরপরও করোনার ঝুঁকি নিয়েও সবাই এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী হতে চান। তিনি আরও বলেন, করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীরা কি ঘরে বসে থাকছে, নাকি লেখা-পড়া করছে ? করে না। বরঞ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর তারা এদিক সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে, খেলে বেড়াচ্ছে। এভাবে কী করোনারোধ করা যাবে? যাবে না। এর জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ার চাপ বাড়িয়ে দিতে হবে। এর জন্য শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা দরকার। ষষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের লেখা-পড়ায় মনোযোগী করতে অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটা একটা সামান্যতম ইতিবাচক দিক। এটা হয়তো শিক্ষার্থীদের কিছু সুফল বয়ে আনলেও অন্য ক্লাসের ছাত্রদের জন্য কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশা বলেন, করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এ সমস্যা উত্তরণের বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষক ও শিক্ষা অধিদপ্তরের মধ্যে। ইতোমধ্যে টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে অনলাইনে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অ্যাসাইনমেন্ট শিক্ষাকার্যক্রম চলছে শিক্ষার্থীদের। এতে হয়তো অনেক শিক্ষার্থী লাভবান হবে। বিশেষ করে শহরের শিক্ষার্থীরা। এতে হয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক খোলা থাকলে যতটুকু অর্জন হবার কথা তা হয়তো হবে না তবে শিক্ষা ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যাবে। ক্লাসে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীরা যে শিক্ষা পেয়ে থাকে অনলাইনে সে শিক্ষা হয়তো পাবে না এটাই বাস্তবতা। তবে পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে শিক্ষা অধিদপ্তর। যারা ভাল ছাত্র তারা সব সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস করতে চায়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে দেশের সে অবস্থা না থাকার কারণে সাময়িকভাবে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে অনলাইন বা অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম চালু হয়েছে। এটি কোন সমাধান নয়। আসল সমাধান হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে, শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে উপস্থিত হয়ে ক্লাস করবে, পাঠদান প্রক্রিয়া চালু রাখা।

মসজিদ-ই-নূর-দাখিল মাদরাসার সুপারিনটেনডেন্ট শরিফুল ইসলাম বলেন, করোনায় অনলাইন ও অ্যাসাইনমেন্ট শিক্ষা কার্যক্রম একটি সাময়িক কার্যক্রম। এটা দীর্ঘ কোন শিক্ষা কার্যক্রম নয়। করোনা মহামারি আরও দীর্ঘস্থায়ী হলে কি কি শিক্ষা কার্যক্রম নেয়া যেতে পারে সে সম্পর্কে চিন্তা করাও জরুরি।

 

সোনালী/এমই

 

শর্টলিংকঃ