করোনায় রাজশাহীর হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায় ধস

মাহী ইলাহি: এ বছরের ৮ মার্চ কাজলায় ‘মিজানস’ নামে একটি রেস্তোরাঁ চালু করেছিলেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ওয়াসিকুল ইসলাম রমিত। বিভিন্ন বাহারি খাবারে অল্প কয়েকদিনে তার রেস্টুরেন্ট বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তার ব্যবসা হচ্ছিল ভালোই। কিন্তু বাধ সাধে করোনাভাইরাস। করোনার কারণে প্রায় চারমাস বন্ধ তার রেস্টুরেন্ট। জুলাই মাস থেকে তিনি আবারও রেস্টুরেন্ট চালু করেন। কিন্তু ব্যবসা জমে না ওঠায় আগস্টে তিনি আবারও রেস্টুরেন্ট বন্ধ করতে বাধ্য হন। ব্যবসা বন্ধ থাকলেও ভবন ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারী বেতন দিয়ে যেতে হচ্ছিল তাকে। ফলে মাসে মাসে গুণতে হচ্ছে লোকসান।

ওয়াসিকুল ইসলাম রমিত বলেন, জুলাই মাসে স্বাস্থ্যবিধি মেনে রেস্টুরেন্ট চালু করি। কয়েকদিন ব্যবসা ভালো গেলেও এরপর থেকে সেভাবে কাস্টমারের দেখা মিলেনি। আমাদের এই শহরের রেস্টুরেন্টগুলোর অধিকাংশ কাস্টমার শিক্ষার্থী। তাদের ওপর নির্ভর করে আমাদের ব্যবসা করতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মূলত ব্যবসা নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হলে আবারও রেস্টুরেন্ট চালু করবো।

রাজশাহী নগরীতে বছর পাঁচেক ধরে রেস্টুরেন্ট তৈরির একটি ট্রেন্ড চলছে যা করোনা সংক্রমণের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পাড়া-মহল্লায়, বিভিন্ন গলিতে গড়ে ওঠে অনেক রেস্টুরেন্ট। গত পাঁচ বছরে নগরীতেই অন্তত দুই শ রেস্টুরেন্ট গড়ে ওঠে। নতুন হওয়া এসব রেস্টুরেন্টগুলো মূলত দুই টাইপের। এক ধরনের রেস্টুরেন্ট ফাস্টফুড, চাইনিজ, থাইসহ বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারের। আধুনিক সাজসজ্জার এসব রেস্টুরেন্টের গ্রাহক মূলত তরুণ-তরুণীরা। আর অন্য ধরনের রেস্টুরেন্ট দেশিয় খাবারের। বিশাল জায়গা নিয়ে উন্মুক্ত পরিসরে খাবার ব্যবস্থা রয়েছে এসব রেস্টুরেন্টে।

রাজশাহী রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহীতে তাদের অর্ন্তভুক্ত রেস্টুরেন্ট রয়েছে ১৯৮টি। এদের মধ্যে করোনার কারণে এখনও বন্ধ রয়েছে ২০টিরও অধিক রেস্টুরেন্ট। সংগঠনের নেতারা জানান, আগে বন্ধ হওয়া রেস্টুরেন্টগুলো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে। তবে অধিকাংশ রেস্টুরেন্ট মালিককে লোকশান গুণতে হচ্ছে। রেস্টুরেন্ট মালিকদের দাবি, সরকার সব খাতে প্রণোদনা দিলেও হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতে দেয়নি। সংশ্লিষ্টরা যদি রেস্তোরাঁ ব্যবসার সুনজর দিতো তাহলে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যেত। একদিকে ব্যবসা নেই বললেই চলে, অপরদিকে কাস্টমার না পাওয়ায় প্রতিনিয়ত লোকসান হচ্ছে। যেভাবে ব্যবসা চলছে, তাতে দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল ও কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। অনেকেই দোকান ভাড়া দিতেও ব্যর্থ হচ্ছেন।

একই রকম হতাশার গল্প শোনালেন নগরীর এক রেস্টুরেন্ট কর্মী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ কর্মী বলেন, হোটেলের অবস্থা ভালো নয়। এরই মধ্যে কর্মী ছাঁটাই করেছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ১২ জন কর্মী কাজ করছে। তবে তাদেরও বেতন কমানো হয়েছে। বিক্রি নেই বললেই চলে।

নগরীর ব্যস্ততম এলাকা সোনাদিঘি মোড়ে অবস্থিত ‘নবাব কিচেন’। মুখরোচক খাবারে বেশ জনপ্রিয় ও মানুষের আস্থা অর্জন করেছিল অল্প সময়েই। রেস্টুরেন্টটির মালিক তরুণ উদ্যোক্তা জাকারুল্লাহ অনিক। তিনি বলেন, মার্চের প্রথম থেকেই আমাদের ক্রেতা কমতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে লকডাউন ঘোষণার আগেই আমরা রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেই। লকডাউন শেষে আবারও ব্যবসা চালু করি। কোরবানি ঈদের পর থেকে ব্যবসা একেবারে শূন্যতে নেমে এসেছে। যা ব্যবসা হচ্ছে তা দিয়ে রেস্টুরেন্টের খরচ মেটানোই সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিমাসে পকেট থেকে বড় পরিমাণ অর্থ দিতে হচ্ছে।

রেস্টুরেন্ট মালিকরা বলছেন, রাজশাহীর রেস্টুরেন্টগুলোর প্রধান ক্রেতাই মূলত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। করোনার কারণে এখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ফলে দীর্ঘদিন পর খুলেও ক্রেতা পাচ্ছে না রেস্টুরেন্টগুলো। এছাড়া করোনার কারণে পরিবার নিয়ে বাইরে খাওয়ার প্রবণতাও কমেছে। একান্ত বাধ্য না হলে কর্মজীবীরাও রেস্টুরেন্টমুখী হচ্ছেন না।

রেস্টুরেন্ট মালিকদের অভিযোগ, রাজশাহী নগরীতে গড়ে উঠছে ‘হোম কিচেন’ নামে খাবার ডেলিভারি প্রতিযোগিতা। মার্কেট যাচাই-বাছাই না করে অনেকে ঘরে বসেই খুলে ফেলছেন ‘হোম কিচেন’। গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে খাবারের দাম ও চটকদার বিজ্ঞাপনও তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়াচ্ছেন। এসব কারণে অনেক রেস্টুরেন্টেও এখন ব্যবসা নেই। ফলে তারা এই হোম কিচেন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

রাজশাহীর সকল হোম কিচেনকে একটি নীতিমালায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়ে রাজশাহী রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি রিয়াজ আহমেদ খান বলেন, হোম কিচেনের কারণে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাশাপাশি তাদের (হোম কিচেন) নেই কোনো ট্রেড লাইসেন্স। তাদের দিতে হচ্ছে না ভ্যাট-ট্যাক্স। এতে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। হোম কিচেনের নামে তারা ভাড়াটিয়া বাবুর্চি দিয়ে রান্না করছেন। চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অনেক ক্রেতাই ঠকছেন। তাই তাদের একটি নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ