করোনার প্রতিক্রিয়া কি পরিবর্তন আনবে?

অদৃশ্য করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় সবকিছু যেন ওলোট-পালোট হয়ে গেছে। মানুষের মনোজগত থেকে শুরু করে সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটা টালমাটাল অবস্থা। এর পরিণতি নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনও আসেনি।

মাত্র ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে এমন প্রতিক্রিয়া নজিরবিহীন বলাটা যথেষ্ট নয়। সভ্যতার উন্নতি নিয়ে সব বড়াই একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে। মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকেও অসহায়ের মতো মৃত্যুর মিছিল মেনে নিতে হয়েছে। সব হম্বিতম্বি ছাড়িয়ে আত্মসমর্পণই বড় হয়ে উঠেছে। এতদিন যে মরণাস্ত্র ছিল ক্ষমতার উৎস এক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ অকার্যকর, এটাই আজকের বাস্তবতা।

অনেকেই বলেছেন, করোনা বিশ্বব্যবস্থাকে পাল্টে দেবে। একটা পরিবর্তন যে আসবে সেটা ঠিক। তবে সেটা কীভাবে, কতদূর তা পরিষ্কার না হলেও এর সম্ভাবনা বা আশঙ্কা কেউই অস্বীকার করতে পারছেন না। স্বীকার করাটাও কঠিন অনেকের জন্য। পরিবর্তনে নিজেদের অবস্থানটাই না পাল্টে যায়!

শুরুতে করোনা সংক্রমণ সবকিছুকে থমকে দিয়েছিল। আক্রান্ত হবার পাশাপাশি করুণ মৃত্যু মানুষকে এতটাই অসহায় করেছিল যে সমাজের চাকা থেমে গিয়েছিল। অর্থনীতিও থমকে দাঁড়িয়েছিল। লকডাউন মানুষকে ঘরবন্দী করেছে। যাদের সঞ্চয় ছিল তারা যেভাবে এ অবস্থা মেনেছে অন্যরা তা পারেনি। পারাটা সম্ভবও ছিল না। সবকিছুর ঊর্ধ্বে তো জীবন! জীবনের চাহিদাকে কে অস্বীকার করতে পারে ?

বেঁচে থাকার চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা না হওয়ায় একান্ত পেটের দায়েই ঘরের বাইরে না এসে পারেনি সাধারণ মানুষ। অদৃশ্য শত্রুর চেয়ে ক্ষুধার জ্বালা কত বড় সেটা না বুঝে মানুষকে দোষ দেয়ার বাতিক দেখা দিয়েছিল। তাদের অসচেতন বলে নিজেদের দায় এড়ানো বড় হয়ে উঠেছে। কারণটা খুঁজে দেখা গুরুত্ব পায়নি। তবে কর্মজীবী-শ্রমজীবীদের অসচেতনতার ফল তাদেরকে ততটা ভোগ করতে হয়নি যতটা করতে হয়েছে অন্যদের। যারা নিজেদের সচেতন ভেবেছেন। করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকায় মধ্যবিত্ত ও বিত্তবানদের সংখ্যাই বেশি। যারা জীবনকে উপভোগ করতে প্রকৃতি থেকে দূরে সুখের জীবন গড়ে তুলেছিল। অন্যদিকে যারা স্বাস্থ্যবিধি ও সুরক্ষা মানতে না পেরে রাস্তায় বেরিয়েছে, খেতে-খামারে রোদ-বৃষ্টি, মাটি-কাদায় কাজ করেছে তাদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হবার ঘটনা চোখে পড়ার মত কম। ওটা বড়লোকের রোগ বলে উপেক্ষাও করেছে তারা। তাই বলে করোনার প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করা যাবে না।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে কতো পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য মারা গেছে তার হিসাব নিলে দেখা যাবে, এভাবে হঠাৎ বিপর্যস্ত হওয়া পরিবারের সংখ্যা ও বিপদের ভয়াবহতা সমাজের অনিশ্চিয়তাকেই গভীর করেছে। করোনা চিকিৎসার দুর্ভোগ আর খরচ যোগাতে কত পরিবার বিপর্যস্ত হয়েছে, আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে সেটা জানা গেলেই পরিস্থিতি বুঝতে পারা যাবে।

করোনার আঘাতে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টির কথা বিভিন্ন গবেষণাতেও উঠে এসেছে। ১৭ শতাংশ পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ হারিয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর ছেড়ে অসংখ্য মানুষ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। করোনার আগে যা বলা হয়েছিল ২২ শতাংশ।

করোনায় আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যু নিয়ে সৃষ্ট আতঙ্ক পারিবারিক গণ্ডিতে আটকে থাকেনি, সামাজিক সঙ্কটে ছড়িয়ে পড়েছে। করোনা আক্রান্ত হবার খবরেই মানুষ দূরে সরে যায়। আত্মীয়-স্বজন এমনকি চিকিৎসকরাও কাছে আসতে ভয় পান। করোনায় মৃত ব্যক্তির দাফনেও বাধা দেয়ার ঘটনা কম নেই। করোনা রোগীদের ভাড়া বাসা থেকে উচ্ছেদ করাও হয়েছে। সময়মত সঠিক তথ্য না দেয়ায় ভীতি এতটাই ছড়িয়েছে যে করোনায় মৃত মাকে ফেলে পালিয়েছে সন্তানেরা। পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশাসন ছাপিয়ে এমন অমানবিকতার জন্ম হলো কীভাবে সেটা ভেবে দেখার বিষয়।

করোনা চিকিৎসা নিয়ে যে ভয়াবহ দুর্নীতির ঘটনা তোলপাড় সৃষ্টি করেছে সেটা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এমন অবস্থা যে এতদিন ঢাকা পড়ে ছিল এটা না বোঝার কারণ নেই। সিদ্ধান্তহীনতা, সমন্বয়হীনতা ও চিকিৎসাসেবায় বিশৃঙ্খলা প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। এতদিন সবই ছিল উন্নয়নের মুখোশের আড়ালে। করোনায় বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিপর্যস্তই হয়নি তার ভঙ্গুরতাও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। করোনা অবশ্য এর মধ্যেই আরও সব মুখোশ ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছে।

শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই নয়, বিপর্যয় অন্যত্রও। করোনায় দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনও বিপর্যয়ের শিকার। উচ্চ শিক্ষায় সেশনজট সৃষ্টি হলেও প্রাথমিকে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া আটকানোর সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। অনলাইনে ক্লাস চালুর উদ্যোগে ডিজিটালাইজেশনের যে চেহারা প্রকাশ পেয়েছে তা এতদিনকার সাফল্যের কথা ফুটো বেলুনের মতো একেবারে চুপসে দিয়েছে। এর ফলে শিক্ষার হার বৃদ্ধির গতি কতটা থমকে যাবে সেটা এখনই জানা কষ্টকর হলেও এই প্রতিক্রিয়া যে দীর্ঘস্থায়ী হবে এতে সন্দেহ নেই।

দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে সমাজ ও অর্থনীতিও। প্রবাসী শ্রমিকেরা ব্যাপকভাবে ফিরে আসায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নিশ্চয়তা হারিয়ে যেতে বসেছে। অন্যদিকে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের হিমশিম অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে প্রণোদনার মলম দিয়ে তার টিকে থাকার সমস্যাও প্রকট হবে। এর মধ্যেই দেশের শিল্প উৎপাদন তলানিতে এসে ঠেকেছে। এমন অবস্থায় একমাত্র কৃষিই সমানতালে এগিয়ে চলেছে। যা হয়তো দুর্ভিক্ষের হাত থেকে আমাদের বাঁচিয়ে দেবে এবারের মতো। এ থেকে আত্মনির্ভর জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার নির্দেশনা খুঁজে পাওয়া যাবে। বিদেশনির্ভর উন্নয়নের সাফল্যের কথা যত বড় গলায় বলা হোক না কেন তার প্রকৃত চিত্রটা প্রকাশ করে দিয়েছে করোনাই।

জানিয়ে দিয়েছে, চলমান উন্নয়ন ধারা, আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন বা সংষ্কার ছাড়া সামনে এগুনো কত কঠিন। এই সংষ্কার যে শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অপরিহার্য তাই নয়, সমাজ-রাষ্ট্র কাঠামোর অন্যত্রও সমানভাবে প্রযোজ্য।

করোনাকালে এই প্রতিক্রিয়া উপলব্ধি করতে না চাইলে আবারও জোরাতালির অবস্থাই ফিরে আসবে। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও পুরানো অবকাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ আসেনি, তাই জনগণের মুক্তিও অধরা থেকে গেছে। স্বাধীন দেশের উপযোগী বিধি-ব্যবস্থা বিনির্মাণ না করায় দেশ বারবার বিপদের শিকার হয়েছে। করোনা পরিবর্তনের যে সুযোগ সৃষ্টি করেছে তা কাজে লাগাতে না পারলে নতুন করে বিপদ মোকাবিলার অপেক্ষায় থাকা ছাড়া বিকল্প নেই সামনে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সোনালী সংবাদ।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ