করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘুরে দাঁড়িয়েছে চীন

সোনালী ডেস্ক: উহানের যে হাসপাতালগুলো করোনাভাইরাস আক্রান্তদের ভিড়ে গিজগিজ করতো, সেসব হাসপাতাল এখন ফাঁকা। নতুন এই ভাইরাস আক্রান্তদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দেয়ার মাধ্যমে সংক্রমন রোধের জন্য মাত্র ১০দিনে এসব হাসপাতাল তৈরি করেছিলো চীন। একে একে এসব হাসপাতাল এখন বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। বাকি বিশ্বে যেখানে আতঙ্ক বেড়েই চলেছে, সেখানে চীনজুড়ে করোনাভাইরাসে নতুন করে আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা কমছে, কমছে মৃতের সংখ্যাও।
করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানের অবস্থাও এখন অনেকটা স্থিতিশীল। দুই মাস ধরে একেবারে অচল থাকা উহানে বুধবার থেকে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান চালুর অনুমতি দিয়েছে সরকার। উহানের পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হওয়ায় প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং গত মঙ্গলবার সেখানে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছেন। তার এ সফর চীনের হতাশাগ্রস্ত জনগণের মধ্যে উৎসাহের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত চীনে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮১ হাজার। আর এতে মারা গেছে তিন হাজার ১০০ জনের বেশি। মারাত্মক সংক্রামক এ ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে গত ২৩ জানুয়ারি থেকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে উহান শহরকে। ঘরবন্দি উহানবাসীর মতো যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে হুবেই প্রদেশের আরো কয়েকটি শহরের বাসিন্দাদেরও। বিনা অপরাধে সেই বন্দিদশার দিন বুঝি শেষ হতে চলেছে। চীন সরকার গতকাল জানিয়েছে, উহানে কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরুর অনুমতি দেয়া হয়েছে।
জাপানের কার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হোন্ডা এরপর জানায়, তাদের উহানের কারখানায় কর্মীরা কাজে ফিরতে শুরু করেছেন। এ সপ্তাহেই কাজ শুরু করতে চায়, এমন প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে জাপানের আরেক প্রতিষ্ঠান নিশান। এ ছাড়া উহানভিত্তিক কার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান দংফেং মোটর করপোরেশনও শিগগিরই কারখানা চালু করতে চায়, যদিও তারা দিনক্ষণ জানায়নি। কিছু কোম্পানির পাশাপাশি মহামারি প্রতিরোধ ও জনসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কাজ শুরুর অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে স্কুলগুলো আপাতত বন্ধই থাকছে। হুবেই প্রদেশের যেসব জায়গায় মহামারি পরিস্থিতি মাঝারি কিংবা আরো কম ঝুঁকিপূর্ণ, সেসব জায়গায় যাত্রীবাহী বাস-ট্রেন-বিমান-জাহাজ-কার চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছে। সেগুলো হুবেইয়ের ভেতরেই চলবে, তবে উহান শহর এ আওতার বাইরেই থাকছে। আর যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার জন্য চালু করা হয়েছে ‘হেলথ কোড’ শীর্ষক বিশেষ ব্যবস্থা। যারা কোনোভাবেই করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে আসেনি, তাদের জন্য সবুজ সংকেত এবং যারা কোনোভাবে ওই ভাইরাসের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছে, তাদের জন্য হলুদ সংকেতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর অসুস্থ বা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য থাকছে লাল সংকেত। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সবাইকে যার যার জন্য প্রযোজ্য সংকেত দেয়া হবে। উহানে প্রেসিডেন্ট চিনপিংয়ের ঝটিকা সফরের পরদিনই হুবেই প্রদেশের ব্যাপারে সরকারের এসব পদক্ষেপের ঘোষণা এলো।
করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে চীনের এই লড়াই বিশ্বের মানুষের মধ্যে আশা জাগিয়েছে। ধন্যবাদ পাচ্ছে দেশটি। বলা হচ্ছে, তাদের প্রচেষ্টার কারণেই ভাইরাসটি আরও ভয়াবহ রূপে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। স¤প্রতি চীন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৫ সদস্যের একটি যৌথ বিশেষজ্ঞ দল বলেছে যে, চীনের অসামান্য উদ্যোগ ও পরিশ্রম এই ভাইরাসটি আরও ভয়াবহ আকারে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়া রোধ করেছে। হাজার হাজার এমন ঘটনা বিলম্বিতও করেছে। চীন নিজেদের মূল্যবান সময় নিয়ে বিশ্বকে এই ভাইরাস মোকাবেলার জন্য অভিজ্ঞ ও প্রস্তুত করতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। দলটির প্রধান ব্রæস এলওয়ার্ড বলেছেন, একটি রহস্যময় রোগ সংক্রমনকে বুঝতে এবং তা মোকাবেলার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে চীনের পদক্ষেপগুলো কাজে লেগেছে, বিশেষ করে সেই সময়, যখন পুরো বিশ্ব তটস্থ। তিনি আরও জানান, চীন ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং সম্ভবত অনেক মানুষকে সংক্রমন থেকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে, যা সত্যিই অসাধারণ।
তিনি বলেন, ‘উহানের মানুষের কাছে বিশ্ব ঋণী হয়ে রইবে। যখন এই রোগ পুরোপুরি নির্মূল হবে, হয়তো তখন আমরা উহানের মানুষকে তাদের অবদানের জন্য ধন্যবাদ দেয়ার সুযোগ পাবো।’ এর আগে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মহাপরিচালক টেড্রস আধানম গেবরি আয়সস বলেন, তারা এই ভাইরাস মোকাবেলায় চীনের পদক্ষেপ ও প্রচেষ্টাকে প্রশংসার নজরে দেখেন। কারণ দেশটি শুধু নিজের মানুষদের রক্ষার জন্যই কাজ করেনি, বিশ্বকেও এর মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত করতে কাজ করেছে। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তনিও গুতেরেস বলেন, চীন করোনাভাইরাসের অতিবিস্তার রোধ করতে সক্ষম হয়েছে, এই ভাইরাস সংক্রমনকে যথাসম্ভব নিজ ভূখÐে আটকে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। সে কারণেই চীনা জনগণ বিশ্বের জন্য বড় আত্মত্যাগ করেছে।

শর্টলিংকঃ