করোনাকালে হার্টের প্রতি আরও যত্মশীল থাকুন

  • 10
    Shares

অধ্যাপক ডা. এম এ খালেক: বর্তমান বিশ্বে হৃদরোগ মৃত্যুর এক নম্বর কারণ। হৃদরোগ বলতে মূলত: হার্ট এটাক ও উচ্চ রক্তচাপজনিত হার্টের অসুখকে বুঝায়। এছাড়াও উন্নয়নশীল দেশেগুলোতে বাতজ্বর-জনিত ভাল্বের হৃদরোগও একটি বড় সমস্যা। হৃদরোগ একটি অসংক্রামক ব্যাধি। উচ্চ রক্ত চাপজনিত হৃদরোগ, ব্রেনস্টোক, ডায়াবেটিস হচ্ছে অসংক্রামক ব্যাধি সমূর্হের অন্তর্ভুক্ত। ২০২৫ সালের মধ্যে ২৫ ভাগ বৈশ্বিক অসংক্রামক ব্যাধি মৃত্যুহ্রাসের জন্য ২০১২ সালে ওয়াল্ড হার্ট ফেডারেশন ((World Heart Federation) বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নানাবিধ প্রোগ্রাম, কার্যক্রম গ্রহণ করে যাচ্ছে এবং ফি বছর ২৯ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব হার্ট দিবস পালনের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি কল্পে হৃদরোগ বিষয়ক বিভিন্ন আলোচনা ও অনুষ্ঠান আয়োজন, সামাজিক মাধ্যম, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরছে। এবারের হার্ট দিবসের বুলি হচ্ছে Use (heart) to beat (cvd) অর্থাৎ হার্টকে হৃদরোগের মধ্যে চালু রাখুন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে আমরা জানি ভ্রুণের ৫-৬ সপ্তাহে হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন শুরু হয়ে যে জীবনের যাত্রা শুরু তার পরিসমাপ্ত বা জীবন মৃত্যু হয় হার্টবিটের স্তব্ধতা দিয়ে। সেই প্রাসংগিকতায় এবারের বিশ্ব হার্ট দিবসে হার্টবিটকে মূল্যায়িত করেছে, তাকে যেন আমরা হৃদরোগ প্রতিরোধে যত্মশীল, সচেতনতাশীল হয়ে হৃদকম্পনকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারি- Use heart to beat in cardiovascular disease (cvd) ।

কোভিড বৈশ্বিক মহামারিতে মানব-সভ্যতা একটি নজিরবিহীন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। করোনা মহামারী আলোকছটার মত দেখিয়ে দিচ্ছে বিশ্ব ও জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কত ভঙ্গুর, দূর্বল, কত অবহেলিত, কত অমানবিক। সে সাথে কত নজিরবিহীন, অবহেলা নিজ স্বাস্থ্যের প্রতি ও কত অরক্ষিত সামাজিক স্বাস্থ্য। হাজার বিলিয়ন বিনিয়োগ যুদ্ধাস্ত্র তৈরি শক্তিধর সে সব দেশও আজ ধরাশায়ী অদৃশ্য ঘাতক ব্যাধি কোভিড করোনায়। আমরা এখনও দিশেহারার মতো।এই কোভিড হৃদরোগীদের মৃত্যুর মিছিলে সয়লাব করছে আশঙ্কাজনকভাবে। ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্টোক, হার্টঅ্যাটাক, শ্বাসকষ্টজনিত রোগী সুলতা, ধুমাপান মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়েছে কোভিড সংক্রমণ।

কোভিড মহামারির মধ্যে অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি বেশি হার্টের প্রতি যত্মশীল থাকুন। হৃদরোগীরা বিশেষভাবে হার্টঅ্যাটাক, হার্টফেলিউর, উচ্চরক্তচাপ যাদের আছে তারা যেন নিয়মিত ওষুধ সেবন ও চিকিৎসকের পরামর্শ যত্নের সাথে পালন করেন এবং যথাসম্ভব জনসমাগম এলাকা এড়িয়ে চলেন, মাদকবিহীন চলবেন, যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানুন নিরাপদে ও সতর্ক থাকুন। কোভিড নিউমোনিয়া ও কোভিড হার্টঅ্যাটাক মৃত্যুঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। হার্টঅ্যাটাকের কয়েকটা রকমের মধ্যে কোভিড হার্টঅ্যাটাক হচ্ছে টাইপ দুই হার্টঅ্যাটাক যার জটিলতা টাইপ-১ (এথেরোস্কেরোটিক atherosclerotic) হার্টঅ্যাটাকের চেয়ে বেশি। আপনার হার্টকে আরও শক্তিশালী করুন আরও Beat ev Pace করুন করোনা কোভিড সংক্রমণ জটিলতা প্রতিরোধে।

আপনি আপনার রক্তচাপকে জানুন, ব্লাড সুগার ও রক্তের চর্বির মাত্রা জানুন ও স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করুন। আপনার ওজন মাপ জানুন ও ধূমপান পরিত্যাগ করুন। আপনার রক্তচাপের স্বাভাবিক মাত্রা হলো সিস্টোলিক চাপ ১১০-১৩০ মি:মি: পারদ আর ডায়াস্টোলিক ৬-৮০ মি:মি: পারদ। উচ্চ রক্তচাপে ব্রেন স্টোক, হার্টঅ্যাটাক, হার্ট ফেলিউর, কিডনী ফেলিউর, চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। নিয়মিত হাঁটুন, পুষ্টিকর খাবার, শাকসবজী ফলমূল খাবেন। গরু, খাসির মাংস, ঘি, মাখন, ডালডা, অতিলবণ পরিহার করুন। সামগ্রিক চাপ ও দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করুন। ধর্মীয় চিন্তা ও পালনে নিমগ্ন হোন যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খুবই সহায়ক। ধূমপান পরিহার করুন। দৈনিক বা সপ্তাহে ৫ দিন ৫০-৬০ মি: মধ্যম গতিতে হাঁটুন যেন কপালে বা দেহে ঘামের ভাব আসে। সকাল বা বিকাল যে কোন সময় এ হাঁটা হতে পারে তবে সকালে হাঁটার সুযোগ নেয়ায় ভালো। সকালের হাঁটার পর স্নান সেরে এক কাপ লাল চা দারুন উপভোগ্য হতে পারে সাথে মনের সজীবতা বৃদ্ধি করে।

বায়ূ দূষণ-হার্র্টঅ্যাটাক, হৃদরোগ, স্টোক ঝুঁকি মৃত্যু বাড়ায়। আমরা বাংলাদেশিরা একেবারে অসচেতন। সুক্ষèকনা ২.৫ মাউক্রোন ঢ়স ২.৫ (pm 2.5 (Fine Partialate matter-2.5 micron)- ১২ মাইক্রোগ্রাম/প্রতিঘণ মিটার বাতাসে থাকলে সেটাকে বায়ূদূষণ বলছে আমেরিকান এনডাইরোলমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি এই দূষণে হৃদরোগ, হার্টঅ্যাটাক ও ব্রেন স্টোকের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়ায়। পরিবেশ উন্নয়নে এখনই সময় আমাদের সচেতন হতে হবে এবং পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম তৎপরতা বৃদ্ধি আপনার রক্তের কোলেস্টেবল নিয়ন্ত্রণে রাখুন। স্বাভাবিক মাত্রা ও উৎস জানুন। স্বাভাবিক মাত্রা হচ্ছে পূর্ণমাত্রা (Total) ২০০ মি:গ্রা: প্রতি ডেসি মিটার এইচডিএল (ভাল) কোলেস্টরল ৩৫ মিগ্রা:/প্রতি ডেসিলিটার, এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল ১৩০ এবং ট্রাইগ্লি-সারাইড (খারাপ) কোলেস্টরল ১০০ মি:গ্রা/ প্রতি ডেসিলিটার। বিশেষ-ভাবে এলডিএল এবং ট্রাই গ্লিসারাইড স্বাভাবিক মাত্রার বেশি হলে তাকে আমরা ডিজলিপি ডিমিয়া (Dyslipidimia) বা লিপিড abnormality বলা হয়। এর কারণে রক্তনালীতে চর্বি বা কোলেস্টরল আবরণ পর্দা পড়ে রক্তনালী বন্ধ হয়ে যায় এবং রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং হার্ট এটাক, ব্রেন স্টোক, পেরিফেরাল আর্টারী ডিজিজ হয়। এই খারাপ কোলেস্টেরলের উৎস হচ্ছে প্রাণীজ চর্বি-গরু, খাসীর মাংস, ঘি, মাখন, দুধের সর ইত্যাদি। খাদ্য তালিকায় এসব কম থাকাই ভাল। এখনকার জাংক ফুড (junk food) সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। বেশী পরিমাণে সবুজ শাকসব্জী, শষ্যদানা, বাদাম খেতে হবে। কায়িক শ্রম রক্তের চর্বি কমাতে ভূমিকা রাখে।

বিশ্বে প্রতি বছর হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণে প্রায় ১৮ মিলিয়ন জীবন অবসান ঘটে যার অধিকাংশ মৃত্যু ব্যক্তির স্বাস্থ্য সচেতনতার দ্বারা প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই হার্ট সুস্থ রাখতে স্বাস্থ্যকর জীবন-যাপন এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। আমরা সবাই হৃদরোগের ঝুঁকিসমূহ সম্পর্কে সচেতন হই, হার্টের সুরক্ষায় স্বাস্থ্যসম্মত সুষম খাবার খাই, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য বর্জন করি। নিয়মতি শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম করি, হৃদরোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলি। হৃদরোগের চিকিৎসা এবং এর প্রতিরোধে আমরা আছি আপনার পাশে।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (কার্ডিওলোজি), ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ