করোনাকালের ১০০ বছর আগেও চুম্বনে জারি হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা

অনলাইন ডেস্ক: একটা মহামারীর তান্ডব মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বদলে দিয়েছে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ! কাকতালীয় ভাবে একশো বছর পর -পর এক একটা অতিমারীর বিষাক্ত ছোবল এসে মুহুর্তের মধ্যে ওলট-পালট করে দেয় সবকিছু। ঠিক যেমনটা বর্তমানে চলছে করোনা পরিস্থিতির কারণে। অদৃশ্য ব্যাধির থাবায় মাএ সাত মাসের মধ্যে পর্যদস্তু হয়ে উঠেছে জনজীবন। চারিদিকে শুধুই এাহি এাহি রব। যদিও সত্যিই কবে কাটবে এই করোনার কালবেলা তা বলা বেশ মুশকিল বটে।

তবে এই মহামারীর কারণে আমাদের জীবনে হঠাৎ করেই অনেক কিছুর পরিবর্তন এসেছে। পুরোনো ভুলে ধীরে-ধীরে ‘নিউ নর্ম্যাল’ জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। করোনার হাত থেকে বাঁচতে রয়েছে নানান স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সতর্কতা বিধি। লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাক্স, হ্যান্ড স্যানিটাইজরের ব্যবহার, হাতে গ্লাভস প্রভৃতি জিনিস গুলি যেন আমাদের জীবনে এখন ভাত-ডালের মতো আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। অবশ্য উদ্দেশ্য একটাই করোনাকে বশে আনা।

ঠিক আজ থেকে একশো বছর আগেও পৃথিবীতে দেখা দিয়েছিলো ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামের অজানা এক মহামারী। মারাত্মক এই ইনফ্লুয়েঞ্জা ঘটিত বৈশ্বিক মহামারীটি ১৯১৮ সালের জানুয়ারী থেকে ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এটি প্রায় ৫০ কোটি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল। যা ছিল সেই সময়ে বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ। আনুমানিক ১.৭ থেকে ৫ কোটি বা কোনও কোনও হিসেবে ১০ কোটির মত মানুষ এতে মারা গিয়েছিল। আর যে কারণে এটিকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক মহামারী হিসাবে উল্লেখ করা হয়। যদিও তারপর যতদিন গড়িয়েছে ততই গোটা বিশ্ববাসীই প্রত্যক্ষ করেছেন এক-একটা বিভীষিকাময় মহামারীর মারণ রুপ।

আর সেই সময়ও ছিল স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানা সতর্কতা বিধি। তখনকার দিনে এত ডিজিটাল মিডিয়া বা ইন্টারনেটের রমরমা না থাকায়, প্রিন্ট মিডিয়ার উপরই ভরসা ছিল সাধারণ মানুষের। কারণ সেকালে সংবাদ মাধ্যমই ছিল দেশ-বিদেশের খবর জানার একমাত্র মাধ্যম। ফলে বিংশ শতকে ঘরে ঘরে পৌঁছে যেত সংবাদপএ। আর তাতে সরকারের কাজকর্ম, সমালোচনা, বিরোধিতা যেমন থাকত আবার তেমন থাকত নানা রকম সরকারি গাইডলাইন। যেগুলি সেই সময়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মেনে না চললে সাধারণ মানুষকে পড়তে হত কড়া শাস্তির মুখে।

গত বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে প্রথমে চিন থেকে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ মহামারী যেভাবে এখনও গোটা বিশ্বে অব্যাহত রয়েছে, তাতে মারণ এই ভাইরসের প্রতিষেধক বের না হওয়া পর্যন্ত সাধারণের জন্য রয়েছে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সরকারি গাইডলাইন। নিজের এবং অপরের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে যা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ।

জানা গিয়েছে, আজ থেকে একশো বছর আগেও স্প্যানিশ ফ্লুর সময়ও ছিলো এই ধরণের সরকারি গাইডলাইন এবং নানারকম প্রোটোকল। যেখানে সাধারণ মানুষকে নির্দেশ দেওয়া হত, পাঁচ ফুটের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, সর্দি কাশি থাকলে করা যাবে না যৌন সম্পর্ক, ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত থাকাকালীন কাউকে চুম্বন করাও ছিল নিষিদ্ধ। ১৯১৮ সালের ‘ডেমোক্র্যাটিক ব্যানার’ নিবন্ধে সার্জন জেনারেল রূপ্ট ব্লু বলেছিলেন যে, এই অনিশ্চিত সময়ে লোকেরা – অন্য বিষয়গুলির মতো চুম্বনও এড়ানো উচিত।

এদিকে, কসমোপলিটন ডটকমের মতে, টমবস্টোন এপিটাফের ১৯১৮ সালের একটি নিবন্ধে বলা হয়েছিল ‘ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত থাকা অবস্থায় চুম্বন নিষিদ্ধ।’

প্ল্যাটসবার্গ সেন্ডিনেল নামে একটি নিউইয়র্ক পত্রিকায় ১৯১৮ সালের ২৩ আগস্ট লেখা হয়েছিল যে সর্দি-সর্দি ভাব থাকলেও লোকেরা তাদের বন্ধু, আত্মীয়স্বজন বা প্রিয় মানুষের সঙ্গে চুম্বন এড়ানো উচিত।

১৯১৮ সালের ২ নভেম্বরে প্রকাশিত সেই সময়ের একটি সংখ্যায় একটি লাইনে লেখা ছিল: ‘আজকাল চুম্বন বন্ধ করা উচিত। আপনি যদি আপনার স্নেহ প্রদর্শন করতে চান, গালে অথবা কপালে চুম্বন করুন, ঠোঁটে নয়।’

‘দ্য সিয়াটল স্টারের’ ১৩ জানুয়ারী ১৯১৯ সালের সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছিল যে, “১৮০০ দশকের শেষের দিকে, যখন ডঃ সাইরাস এডসন বলেছিলেন, চুম্বন ফ্লু ছড়ায় সেই কথা শুনে সাধারণ মানুষেরা হেসে ফেলেছিল। তবে স্প্যানিশ ফ্লু যেভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে তাতে তারা আর হাসছেন না।”

ওয়াশিংটনের পার্থের ২৬ মার্চ, ১৯৯১-এ ফ্লু চলাকালীন চুম্বনের বিষয়ে মতামত জানিয়েছিল, “চুম্বন একটি পবিত্র আচার হওয়া উচিত। চুম্বন তাদেরকেই করা উচিত যারা একে অপরের প্রতি গভীর এবং সত্যিকারের ভালবাসায় লিপ্ত রয়েছে ।”

করোনা মহামারীর মতো সেই সময়ও নিষিদ্ধ ছিলো যেকোনও ধরণের যৌন সম্পর্ক, চুম্বন, ডেটিং, সেক্সের মতো কাজকর্ম। যেগুলি থেকে এক দেহ থেকে অন্য দেহে দ্রুত ভাইরাস সংক্রমণ ঘটাতে পারে এমন সব কাজের উপর ছিলো সরকারি নিষেধাজ্ঞা। তারপরেও দু বছর ধরে চলেছিল স্প্যানিশ ফ্লুর তান্ডব। বলা বাহুল্য লকডাউন উঠতে ভারত সহ গোটা বিশ্বের মানুষ যেভাবে লাগামহীন জীবন যাপন করতে শুরু করেছে, তাতে করে পৃথিবী থেকে করোনার কালো ছায়া কবে ঘুচবে তা বলা বেশ শক্ত ব্যাপার।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ