একের পর এক গুজব

শিরিন সুলতানা কেয়া: চারদিকে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক। সতর্ক পুলিশ-প্রশাসন। এতো সতর্কতার ভেতরও করোনা থেকে সুরক্ষার নামে রাজশাহীতে ছড়িয়ে পড়ছে একের পর এক গুজব। ফ্রিজ ভাঙা, মাটির নিচে সুরমা এবং চায়ের সঙ্গে গোলমরিচ খাওয়ার মতো গুজব সৃষ্টি হয়েছে গত তিন দিনে। শুধু তাই নয়, খবরের কাগজের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে বলেও গুজব ছড়ানো হয়েছে। পুলিশ-প্রশাসন বলছে, এসব গুজব রটনা করা হলে নেয়া হবে আইনগত ব্যবস্থা।
আর চিকিৎসকরা বলছেন, করোনা থেকে সুরক্ষা থাকার একমাত্র উপায় সচেতন থাকা। সাবধানতা অবলম্বন করা। ভিত্তিহীন এসব গুজবে কান না দেয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা । তারপরেও অনেকেই গুজবে কান দিচ্ছেন। এ অবস্থায় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে গুজবের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন জেলা প্রশাসক হামিদুল হক।
জানা গেছে, খবরের কাগজের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ায় এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে কয়েকদিন আগে। ফলে অনেক পাঠক পত্রিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। অথচ সংবাদপত্রের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়ায় না। তিন দিন আগে রাজশাহী অঞ্চলে প্রথম গুজব ছড়ানো হয় যে, ফ্রিজে রাখা মাছ-মাংস থেকে করোনাভাইরাস ছড়ায়। তাই প্রশাসন ফ্রিজ ভেঙে ফেলছে। কিন্তু এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তারপরও আতঙ্কে অনেকে ফ্রিজ খালি করতে শুরু করেন। একজন আরেকজনকে ফোন করে ফ্রিজ খালি করার পরামর্শ দিতে শুরু করেন। কিন্তু ফ্রিজ ভাঙার মতো কোনো ঘটনা কোথাও ঘটেনি।
ফ্রিজের গুজব শেষ হতে না হতেই আসে সুরমা গুজব। বাড়ির দরজার পাশ খুড়লেই পাওয়া যাবে সুরমা এবং তা ব্যবহার করলে করোনা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে এমন গুজব প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে রাজশাহীর গ্রামে গ্রামে। অনেকেই মাটি খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেন। গ্রাম থেকে এ গুজব চলে আসে শহরেও।
নগরীর ভদ্রা জামালপুর এলাকায় অনেককেই সুরমার সন্ধান করতে দেখা যায়। মাটির নিচে কয়লার মতো কালো কিছু পেলেই তা সুরমা মনে করে চোখে দিতে শুরু করেন অনেকে। বৃদ্ধ থেকে শিশুদেরও দেয়া হয় এগুলো। অথচ এগুলো কোনো সুরমা নয়। নেই কোনো ঘ্রাণও। তারপরেও গুজবে কান দিয়ে এগুলো ব্যবহার শুরু করেন অনেকে। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ছড়াতে থাকে গুজব।
সুরমার গুজব শেষ হতে না হতেই গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, কে যেন স্বপ্নে দেখেছে চায়ের সঙ্গে গোলমরিচ খেলে করোনাভাইরাস স্পর্শ করতে পারবে না। এরও কোনো ভিত্তি নেই। তারপরেও অনেকে গোলমরিচ চা পান শুরু করেন। বাইরে বের হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেকে চা, চিনি আর গোলমরিচ কিনতে বের হন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বোঝায় এটি নিতান্তই একটি গুজব।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, এসব গুজবের কোনো ভিত্তি নেই। মাটি খুড়লে সব জায়গাতেই কিছু না কিছু কালো পদার্থ পাওয়া যায়। এটা সুরমা নয়। পঁচা কাঠ। এসব চোখে দিলে চোখের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর চায়ের সঙ্গে গোলমরিচ খেলে ভাইরাস সংক্রমণ করবে না এরও কোনো ভিত্তি নেই। ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে হলে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। বার বার সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুতে হবে।
এদিকে গুজব রটনাকারিদের বিরুদ্ধে তৎপর রয়েছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে গুজব ছড়ানোয় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। গুজব রটনাকারীদের পুলিশে দেয়ার নির্দেশও দিয়েছেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে তিনি এই নির্দেশনা দেন।
জেলা প্রশাসক ফেসবুকে লিখেন, ফ্রিজে খাবার রাখা যাবে না মর্মে কোনও নির্দেশনা সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। কেউ গুজব ছড়ালে আটক করে নিকটস্থ থানায় খবর দিন। আর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম বলেন, আমরা করোনা নিয়ে গুজবের বিরুদ্ধেও মাঠে নেমেছি। স্পেশাল রেসপন্স টিম গঠিত হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে কাজ করছে। যারা গুজব ছড়িয়ে মানুষকে নানাভাবে আতঙ্কিত এবং বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শর্টলিংকঃ