একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি: বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন

  • 367
    Shares

উপাধ্যক্ষ কামরুজ্জামান

মানুষের যেমন জীবন আছে, তেমনি রাষ্ট্রের আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য। এই ইতিহাস, ঐতিহ্যের আবার কালো-সাদা, জয়-পরাজয়, ভাল-মন্দ, উত্থান-পতনের রূপ/গল্প থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আছে বিজয়ের রূপ, এগিয়ে যাওয়া, বীরত্ব আর সফলতার কাহিনী, তেমনি আছে কাপূরুষতার, ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর কাহিনী। আছে কালো অধ্যায়ের একটি বড় পর্ব।

কাছাকাছি সময়ে সফলতার, বিজয়ের, ত্যাগের ইতিহাস হলো ২৩ বছরের লড়াই সংগ্রাম আর ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম তথা মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে স্বাধীন করা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই স্বাধীনতার সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষাতো ছিলই, হারাতে হয়েছে ৩০ লক্ষ মানুষকে, সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে সাড়ে চার লক্ষ মা-বোনকে।

কালো অধ্যায়? হ্যাঁ, পাকিস্তানবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে, মুক্তিযুদ্ধকে ভুল প্রমাণ করতে, বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বানাতে এই কালো অধ্যায়। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে কালো অধ্যায়ের সূচনা। কালো অধ্যায়ের এই যুগে জেলের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয়েছে জাতীয় চার নেতাকে, প্রণয়ন করা হয়েছিল ইনডেমনিটি নামের ঘৃণ্য আইন। যে আইন দেখিয়ে জাতির পিতা বা চার নেতার খুনীদের বিচার রহিত করা হয়েছিল। বাঙালির এই কালো সময়টিতে খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল, জয়বাংলা নিষিদ্ধ ছিল, রাজাকার-আলবদর-যুদ্ধাপরাধীদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র ছিল।

’৭২-র সংবিধানকে নির্বাসনে পাঠিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র এই চার মূলনীতিকে সংবিধান থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বুদ্ধিজীবী, সৈনিক, হত্যা করা হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারাও রেহায় পাইনি। এক অর্থে আওয়ামীলীগ নিষিদ্ধ ছিল। প্রথমে জাতির পিতার কন্যা, আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে প্রথমে দেশে আসতে দেয়া হয়নি, পরে দেশে আসলেও ৩২- নম্বর বাড়িতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি, যখন প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছে তারপর ১৯ বার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এই কালো অধ্যায়ে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি চালু করা হয়েছে, রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছে, গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দিয়ে দেশটিকে রাজাকার, আল বদর, আল শামস্ ও তাদের দোসরদের অভয়ারণ্য করা হয়েছে।

অন্যদিকে ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করবার চক্রান্ত করেছিল ঐ কালো অধ্যায়ের স্রষ্টারা। গ্রেনেড হামলা, চার বার দূর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, ১০ ট্রাক অস্ত্র, হাওয়া ভবন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্রমাবনতি, বাংলা ভাইয়ের সৃষ্টি, রাজাকারদের আস্ফালন, প্রগতিশীল মানুষদের হত্যা, শিক্ষক হত্যা, খাদ্য ঘাটতি, কৃষক হত্যা, বিদ্যুতের-পানির জন্য হাহাকার আর মানুষ হত্যা এগুলো ছিল ব্যর্থ রাষ্ট্র পরিণত করবার কাজ, প্রক্রিয়া। হেনরি কিসিঞ্জারের তলাবিহীন ঝুড়ির বাস্তবায়ন আর কি! মুক্তিযুদ্ধকে অপমান, ব্যর্থ করতেই এই প্রক্রিয়া।

কালো অধ্যায় থেকে বাংলাদেশকে আলোর পথে আনবার প্রথম কাজটিই হলো শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১০১ জন প্রথিতজসা বাঙালিদের নিয়ে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন। ১৯৯২ সনের ২৬ মার্চ গণ আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কালো যুগের নায়কদের মুখোশ উন্মোচন ও জয়বাংলার অগ্রযাত্রা শুরু হয়। হূমায়ন আহমেদের নাটকে পাখির মুখে “তুই রাজাকার” শব্দটি র্র্নির্মূল কমিটি গঠনের পর মানুষের মুখের বুলিতে পরিণত হলো। বাঙালির ঐতিহ্য ‘সাহস’ সঞ্চারিত হলো, ঐক্যবদ্ধভাবে তারা প্রতিরোধ, প্রতিবাদে গর্জে উঠল।

বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে কি থাকবে? কেমন হবে এর চেহারা? অর্থনীতি? মানবিকতা! বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আইনের শাসন থাকবে। সেখানে ’৭২-র সংবিধানের মূল চারনীতি গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র থাকবে। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত চিন্তা প্রকাশের সর্বোত্তম পরিবেশ সমৃদ্ধ, পরমত সহিষ্ণু, যুক্তি ও জ্ঞান নির্ভর সমাজ, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যকে লালন-পালন, শ্রদ্ধা প্রদর্শন। ভাত-কাপড়-চিকিৎসা, বাসস্থান, কর্মের নিশ্চয়তা, শিক্ষার সার্বজনীন অধিকার, আইনের শাসন, জীবন ও কর্মের নিরাপত্তা। ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠি, ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ হবে সবার আর সমঅধিকারের। কোন ধরণের সাম্প্রদায়িকতার স্থান বঙ্গবন্ধুর বাংলায় হবে না। জ্ঞান, বিজ্ঞান, সভ্যতায় আমরা এগিয়ে যাব। এই রূপ আলোকিত বাংলাদেশই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ, হাজার বছরে গড়ে ওঠা বাঙালির বাংলাদেশ, সহমর্মিতা আর সৌহার্দ্যের বাংলাদেশ। আমাদের মানবিক বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর সেই বাংলাদেশ বিনির্মাণের একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি অকুতোভয় সংগঠন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অর্জন নির্মূল কমিটির। রাষ্ট্রের বিশেষ প্রয়োজনে, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক রক্ষার্থে, চেতনার বিকাশে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি, ইতিহাসের প্রতি যে কোন কটুক্তিতে, অশ্রদ্ধায় প্রথম প্রতিরোধ-প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে হুমকি-কটুক্তিতে গর্জে উঠেছিল এই সংগঠন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পর শাহরিয়ার কবির, প্রফেসর ড. মুনতাসির মামুন, কাজী মুকুল, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীসহ একঝাক বিদগ্ধ ব্যক্তি ও শহীদ পরিবার শক্তভাবে এই সংগঠনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজে লাগাচ্ছে। তাদের নিরলস পরিশ্রমে, বুদ্ধি বৃত্তিক চর্চায় তরুণ সমাজও এগিয়ে এসেছে, আসছে।

উল্লেখ্য একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনের ফলেই ১৯৯৬ সনে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন সম্ভব হয়েছিল। একইভাবে ২০০৮ এর নির্বাচনে জয়লাভের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল নির্মূূল কমিটির যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্দোলন। আবার ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রেও যুদ্ধাপরাধিদের বিচার প্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

এই কমিটির অঙ্গীকার ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক বাংলদেশ। যা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশকেই ধারণ করে। দিন শেষে এটাই সত্য বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশ বির্নিমাণই একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন। আর এই আন্দোলন অনেকাংশেই সফল হয়েছে, বাকি পথও আমাদেরকে সফল হতেই হবে।

নির্মূল কমিটির আন্দোলনের সাথে থেকে, পাশে থেকে, নেপথ্য থেকে, যিনি গ্রহণ করেন, নির্দেশনা দেন, তিনি আর কেউ নয় বঙ্গবন্ধুর জৈষ্ঠ্য কন্যা, বাঙালির আশা-ভরসার স্থান, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কান্ডারি জননেত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে তার প্রতি স্যালুট!

লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ