একটি ছোট নদীর দুঃখ

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

নদীটার নাম বারনই। এর প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ দিয়ে বয়ে গেছে দেশের একটি বড় নদী। নাম পদ্মা। অবশ্য পদ্মার সঙ্গে তার কোনো তুলনা হতেই পারে না, কারণ হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে পদ্মার উৎপত্তি হয়েছে। আর বারনইয়ের উৎপত্তি হয়েছে নওগাঁ জেলার আত্রাইয়ের একটি বিল থেকে। তানোর উপজেলার মধ্য দিয়ে শিবনদী নাম ধারণ করে পবা উপজেলার বাগধানী এলাকায় এসে সে বারনই নাম ধারণ করেছে। শুধু তা–ই নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত পদ্মার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮০ কিলোমিটার। গড় প্রস্থ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। বয়ে গেছে নয়টি জেলার ওপর দিয়ে।

আর বারনই মাত্র রাজশাহী থেকে নাটোরের আত্রাই নদে গেছে। বড়জোর দৈর্ঘ্য ৫০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১০০ মিটার হতে পারে। সুতরাং পদ্মার সঙ্গে সে নিজের তুলনা টানতে চায় না।

তবে একটা বিষয় বলার আছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে বলেছেন, ‘গতিশীল জলতলে পদ্মার মাটির বুক কোনো দিন কেহ দেখে নাই, চিরকাল গোপন হইয়া আছে’। এই গোপন রহস্য কিন্তু ফাঁস হয়ে গেছে। পদ্মার মাটির বুক এখন উদাম হয়ে গেছে। মানুষ দেখতে পায়। আর বারো মাস পানি থাকে বলে এই নদীর হয়েছে বারনই। এই নদী সম্পর্কে ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ-ভারতের মুখ্য পরিসংখ্যান কর্মকর্তা উইলিয়াম উইলসন হান্টার তাঁর স্টাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব বেঙ্গল গ্রন্থে বলেছেন, রাজশাহীর যে কয়টি নদীর নাব্যতা আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে নাব্য হচ্ছে বারনই। এই নদীপথেই বাংলার সুবাদার ইসলাম খান ১৬০৮ সালে নওগাঁয় এসেছিলেন।

যদিও এখন এ কথা মানুষকে বিশ্বাস করানো মুশকিল। তাই বলে এ নিয়ে নদীটার কোনো দুঃখ নেই।

রাজশাহী শহরের যত বর্জ্য সারা দিন বারনই নদীতে গিয়ে পড়ে। এই পানিতে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য ফেলা হয়, যা পুড়িয়ে ফেলার কথা। সেই সঙ্গে মনুষ্যবর্জ্যও গিয়ে মিশছে। এ জন্য নদীটাতে কোনো মাছ টিকতে পারে না। নদীটা মাছশূন্য হয়ে যাচ্ছে দেখে স্থানীয় সাংসদেরা বেশ কয়েকবার মাছ ছেড়ে দিয়েছিলেন।

সে মাছ নদীতে ছেড়ে দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মরে ভেসে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পানিতে কলিফর্ম, সালমোনেলা ও সিগেলা জাতীয় ভয়ংকর সব ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা ডায়রিয়া, আমাশয়, ক্রিমিসহ যাবতীয় পেটের পীড়ার জীবাণু বহন করে।

ব্যাকটেরিয়া সালমোনেলার হাত থেকে বাঁচার জন্য সারা পৃথিবীতে সুয়ারেজ ব্যবস্থা উন্নত করা হচ্ছে। অথচ এখানে এই অবস্থা। এ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো মাথাব্যথা নেই। এতেও নদীটার কোনো দুঃখ নেই, কারণ রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যেই সাংবাদিকদের বলা হয়, তারা তাদের বর্জ্য পানি শোধন করে নদীতে ফেলার ব্যবস্থা করবে। এসব কথা মঝেমধ্যেই পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়। সেই সঙ্গে নদীর নামটাও ছাপা হয়। এটা তো একটা খুশির ব্যাপার! বছর দুই আগে নদীটার ভাটিতে একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে। শুকনা মৌসুমে বাতাস দিয়ে এই ড্যামের পেট ফোলানো হয়। তখন পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। নদীটা একটা বদ্ধ খালে পরিণত হয়। এতে আটকে যায় যত সব বর্জ্য। যারা নদীর পানিতে ছোটবেলা থেকে গোসল করে বড় হয়েছে, তারা নদীতে গোসল না করলে থাকতে পারে না।

তাদের সে সময় ঘা-চুলকানি হয়। গন্ধযুক্ত পানি তারা মুখে নিতে পারে না। এমনকি গন্ধে নদীর ধারের মানুষের ঘুম আসে না। অবশ্য তাতেও নদীটার কোনো দুঃখ নেই। কারণ শুকনা মৌসুমের আটকানো পানি দিয়ে নাকি নদীর তীরবর্তী এলাকার চাষিরা স্বল্পমূল্যে জমিতে সেচ দিতে পারেন। তাতে ধানের ফলন নাকি ভূগর্ভস্থ পানির চেয়ে বেশি হয়। তাই নিজের জন্য নদী বারনইয়ের কোনো দুঃখ নেই। তবে পদ্মা একটি বড় নদী। তার কিছু হলে বারনইয়ের মন খারাপ হয়। যেমন ধনী প্রতিবেশীর কোনো দুঃসংবাদ শুনলে বাড়ির পাশের গরিবকে কেঁদে চোখ ভাসাতেই হয়। তার তো দেওয়ার কিছু নেই। তাই এইটুকু তাকে করতেই হয়।

গত কোরবানির ঈদে এক মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী চামড়ার বাজার বুঝতে না পেরে বেশি দামে অল্প কিছু চামড়া কিনেছিলেন। রাজশাহীতে বিক্রি করতে না পেরে পরের দিন সেই চামড়া নিয়ে নাটোরে যান। সেখানেও বিক্রি করতে না পেরে রাজশাহীতে ফিরে আসেন। মনের দুঃখে সেই চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলে দেন। টাকার শোকে লোকটা বোধ হয় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। তখন পদ্মার ভরা মৌসুম। চোখের পলকে চমড়াগুলো হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পার হয়ে যায়। অথচ লোকটা চামড়াগুলো ফেলতে ফেলতে বলছিলেন, ‘যা দেশের সম্পদ, ভারতে ভেসে যা।’ অথচ পানি ভারতের দিক থেকেই আসছিল। যাহোক, খবর পেয়ে একদিন পরে ছুটে যায় সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর।

যা-তা কথা নয়! চামড়া ফেলে দেশের বড় নদীর পানিদূষণ করা হয়েছে। শুধু শুধু তো কারও নামে মামলা দেওয়া যায় না। তাই এই চামড়া ফেলার কারণে কী মাত্রায় পদ্মার পানিদূষণ হয়েছে, তার পরীক্ষা করতে হবে। তারা নদীর তিন জায়গা থেকে তিন বোতল পানি তুলে তাদের প্রধান কার্যালয়ে পরীক্ষার জন্য পাঠাল। কিন্তু সে পানির আর পরীক্ষা হয় না। আর যা–ই হোক, পদ্মা দেশের একটি প্রভাবশালী নদী। পাড় ভাঙায় বিশ্বে তার জুড়ি নেই। এমন সম্ভ্রান্ত একটি নদীর পানি নিয়ে যে তামাশা করা হলো, এটাই বারনইয়ের বড় দুঃখ।

লেখক: আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ