উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অহেতুক বিদেশ সফর কেন?

  • 11
    Shares

মাহমুদ জামাল কাদেরী: জনগণের টাকায় (সরকার বা রাষ্ট্রের টাকা তো জনগণেরই) সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের এমন বহর আগে কমই দেখা গেছে। এখন এর কৃতিত্ব কার সেটা ভেবে দেখার বিষয়। অবশ্য এক হাজার কর্মকর্তাকে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশে পাঠাবার প্রস্তাব সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু এনিয়ে আলোচনার শেষ হয়নি ।

বাতিল হওয়া প্রস্তাবের পক্ষে একজন সিনিয়র সচিবের বক্তব্য ছিল এমনই- খিচুড়ি রান্না শিখতে নয়, পুরো ব্যবস্থাপনা দেখতেই কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে । মন্ত্রীসভায় স্কুল ফিডিং পলিসি পাস হবার পরই ১৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। দেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মিড ডে মিল চালু কীভাবে ম্যানেজ করা, সে ম্যানেজমেন্ট দেখতে এবং দেশে-বিদেশে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য একটি কম্পোনেন্ট রয়েছে সক্ষমতা অর্জনের জন্য। খিচুড়ি রান্না করার জন্য কোনো কর্মকর্তা বা আমরা বিদেশে যাচ্ছি না। এমন ‘যুক্তিপূর্ণ’ ব্যাখ্যা আমলে না নিয়ে প্রস্তাবটি বাতিল করা নিঃসন্দেহে উর্বর মাথার চিন্তা বাতিলের শামিল।

শুধু খিচুড়ি প্রকল্পই নয়, পুকুর-খাল-কূপ-নদী খনন, গরু প্রজনন, আলু ও ধান চাষ শেখা, লিফট দেখাসহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বাড়তে থাকায় তা গণসমালোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও অহেতুক বিদেশ সফর না করার নির্দেশনা দিলেও কাজ হয়েছে বলা যাবে না। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর যেন প্রতিযোগিতায় মেতেছে। তাই, তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সাথে বিদেশ সফরের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে আসা নিরুৎসাহিত হয়নি। এসবের কোনোটি অনুমোদিত হয়েছে, কোনোটি হয়েছে সংশোধিত আকারে আবার খিচুড়ির মতো কোনোটি বাতিলও হয়েছে। কিন্তু যাদের মাথা থেকে এমন সব প্রস্তাবনার জন্ম তাদের কি হয়েছে সেটা অজানাই থেকে গেছে।

প্রশাসনের উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিবর্গের নানাবিধ অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা একটু কঠিনই বলতে হবে । কারণ মেধা পরীক্ষা পাস করে মাঠ পর্যায় থেকে নানা রকমের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ভেতর দিয়েই আসতে হয় তাদের। দেশের ইতিহাস নিয়েও তাদের জ্ঞানের ঘাটতি থাকার কথা নয় । মিড ডে মিল নিয়েই বলি। বিষয়টা এ দেশে মোটেই নতুন নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এর প্রচলন নতুন বলা যাবে না।

সেই পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে সরকারি স্কুলে মিড ডে মিল চালু ছিল। তখন দিনাজপুর জেলা স্কুলে আমরা মজা করে খেতাম বুলগার হুইটের খিচুড়ি। এদেশে হুইট বা গমের প্রচলন ছিল না তখন। তাই সম্ভবত বুলগেরিয়া থেকে আনা গমের খিচুড়ি রান্না করে দুপুরে দেয়া হতো শিক্ষার্থীদের। পরে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় খিচুড়ির পাশাপাশি দেয়া হতো লুচি-বুন্দিয়া বা সবজির ঘাটি। এসব ক্ষেত্রে কাউকে প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য বিদেশ যেতে হয়েছে বলে শোনা যায়নি। এ ধরনের কথা চিন্তা করাও ছিল কঠিন ।

দেশের সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল-হোস্টেলের মিল বা খিচুড়ির ইতিহাসও কম দিনের নয়। এমন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর খাবার ম্যানেজ করার বিষয়টি আজকের সরকারি কর্মকর্তাদের অজানা থাকার কথা নয়। এর বাইরেও অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি-সামাজিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ভোজের ঘটনা নাই বা বলা গেল! এসব ক্ষেত্রেও কারও বিদেশ যাবার প্রয়োজন পড়েনি। তাহলে আজ বিদেশ যাবার উদ্দেশ্যটা কি?

গত বছর পুকুর খনন শিখতে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) তাদের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ব্যবস্থা করেছিল। একটি প্রকল্পের আওতায় ১৬জন কর্মকর্তার বিদেশ সফরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল এক কোটি ২৮ লাখ টাকা। অন্য এক প্রকল্পের আওতায় আরও ১৬ জন কর্মকর্তাকে ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় একটি দেশে পাঠেনোর খবরও প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকায়।

একইভাবে নদীর বাঁধ পুনরুদ্ধার, তীর রক্ষা ও নদী-খাল খননের অভিজ্ঞতা অর্জনে আমেরিকা, ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের একটি দল । সফর শেষে তাদের তিনজন অবসরে গেছেন যথাক্রমে ২০দিন, পাঁচ মাস ও একবছরের মধ্যেই। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবও ছিলেন । এ থেকে উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার বোঝা যায়। এদের বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর চিন্তা ছিল না। সরকারি টাকায় ভ্রমণটাই ছিল আসল!

গত বছর ডিসেম্বরে বোয়িং কোম্পানির একটা বিমান ডেলিভারি আনতে বাংলাদেশ বিমান ও মন্ত্রাণালয়ের ৪৫ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে যাবার ঘটনা নিশ্চয়ই সবাই ভুলে যাননি। একইভাবে আলুর চাষ দেখতে ইউরোপে, লিফট দেখতে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষক-কর্মকর্তার সুইজারল্যান্ড ও স্পেন এবং ফ্ল্যাট দেখতে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর যাবার খবরও সংবাদ মাধ্যমে ফলাও প্রচার পেয়েছিল। কিন্তু এসব থেকে কারও টনক নড়েছে, বোধোদয় হয়েছে বা সরকারি টাকার অপচয় বন্ধে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, এমন কিছু জানা যায়নি ।

সেই যে কথায় আছে না, সরকার কি মাল-দরিয়া মে ঢাল বা লাগে টাকা দেবে গৌরি সেন, এমন চিন্তা যে সরকারি কর্মকর্তা বা ক্ষমতাসীনদের মাথায় গভীরভাবে গেঁথে আছে এতে সন্দেহ কি? মুখে বা লেখায় জনগণের সেবার বিষয়ে যা-ই বলা হোক, বাস্তবে নিজের সেবা, ভোগ-বিলাসিতা, ধন-সম্পদ বৃদ্ধির দিকেই যে নজর থাকে এটা কি অস্বীকার করা যায়? এসব অভ্যাস পাল্টানোর প্রয়োজন পড়েনি কারও। তেমন ব্যবস্থারও দেখা মেলেনি । স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার কথা মুখে আর লেখাতেই সীমাবদ্ধ ।

সেই ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের নিয়ম-নীতি, বিধি-ব্যবস্থা অটুট থেকেছে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে। তাই স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, লুটপাট, পাচার অব্যাহত রয়েছে। উন্নয়নের সুফল বেশিরভাগই ক্ষমতা অনুযায়ী ভোগ করছে ওপরতলার মুষ্টিমেয় লোক। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অহেতুক বিদেশ সফরের বহর এর বাইরে তেমন কিছু বলা যাবে কি?

লেখক: সাংবাদিক।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ