উজাড় হচ্ছে পদ্মার চরের বন

স্টাফ রিপোর্টার: সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর এলাকায় পদ্মার চরে সরকারিভাবে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল একটি বন। স্থানীয় গ্রামবাসীকে উপকারভোগী করে বনটি গড়ে তোলা হয়। চরে ২০১০-১১ সালের দিকে লাগানো গাছের ছোট ছোট চারাগুলো এখন বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। এখন বনটিতে নজর পড়েছে স্থানীয় একাধিক চক্রের। রাতের আঁধারে গাছ কেটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করছে তারা। এতে বনটি উজাড় হতে চলেছে। স্থানীয়রা বনটিতে পাহারা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকার টনি, সোনারুল, উজ্জ্বল, কার্তিক, বাবু লালসহ স্থানীয় বেশকিছু ব্যক্তি বন থেকে গাছ কেটে নিয়ে যান। বনের আশপাশেই তাদের বাড়ি। এদের সঙ্গে বনের কিছু উপকারভোগীও জড়িত। শুধু তাই নয়, বন ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং বনবিভাগের কর্মীদেরও গাছ চোর চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। গত এক সপ্তাহ আগেও পুলিশ টনির বাড়ি থেকে বেশকিছু গাছের গুঁড়ি উদ্ধার করেছে। এ নিয়ে গতকাল বুধবার থানায় মামলা হয়েছে।
আগের দিন মঙ্গলবার বনটিতে সরেজমিনে গিয়ে গাছ কাটার চিহ্ন পাওয়া গেছে। কিছু কিছু গাছের গোড়া থেকে কেটে নেয়া হয়েছে। কোনটির আবার কাÐ থেকে কাটা হয়েছে। আবার কিছু কিছু গাছের গোড়ায় রয়েছে দা-কুড়ালের কোপ। স্থানীয়রা জানান, যে যার মতো গাছ কেটে সাবাড় করছে। এসব গাছ কেটে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন স’ মিলে। এছাড়া এলাকার ইটভাটাতেও বিক্রি করা হচ্ছে গাছ।

স্থানীয়রা আরও জানান, এক সপ্তাহ আগে টনির বাড়ি থেকে গাছ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হলেও এর আগেও তার বাড়ি থেকে গাছ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু তখন মামলা হয়নি। বনে থাকা পাহারাদার এবং কমিটির লোকজনের গাছ চোর চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকার কারণে চোরেরা নির্বিঘেœ গাছ কেটে নিয়ে যায় বলেও দাবি করেন তারা।
এর আগে সম্প্রতি কিছু গাছ বিক্রির জন্য টেন্ডার দেয়া হয়। তখনও বনবিভাগের কর্মীদের যোগসাজসে ঠিকাদারের লোকজন অতিরিক্ত গাছ কাটেন। নওগাঁর মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর গ্রামের মেসার্স নাজিম স’ মিল এর স্বত্বাধিকারী নাজিম উদ্দিন গাছগুলো নিলামে কিনেছিলেন। স্থানীয় লোকজন অতিরিক্ত গাছ কাটার বিষয়টি বুঝতে পেরে বাধা দেয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বনে গিয়ে অতিরিক্ত গাছ কাটার সত্যতা পান। এ সময় জাকির হোসেন নামে ঠিকাদারের এক প্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এখন স্থানীয় একাধিক চক্র বন থেকে গাছ কেটে কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে।
চোরদের সঙ্গে বন ব্যবস্থাপনা কমিটির লোকজনের জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বুধবার দুপুরে সভাপতি হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, এসব মিথ্যা কথা। এর তো প্রমাণ থাকতে হবে। কোনো প্রমাণ নেই। কয়েকদিন আগে আমরাই চোর ধরেছি। এখন বন কর্মকর্তার সঙ্গে থানায় মামলা করতে এসেছি।
বন থেকে গাছ চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা বন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, যেখানে সম্পদ থাকবে সেখানে চোরও থাকবে। তারপরেও বনবিভাগের কর্মীদের পাহারাদার হিসেবে রেখে আমরা চুরি ঠেকানোর চেষ্টা করছি। আর কারও বাড়িতে বনের গাছ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়। এখনও গাছ চুরির ব্যাপারে মামলা করতে থানায় আছি।
বন কর্মকর্তা জানান, টনির বাড়ি থেকে গাছ উদ্ধারের ঘটনায় প্রথমে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। পুলিশ সেটির তদন্ত করে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে। মামলায় আসামি হিসেবে টনির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত আরও দুইজনকে আসামি করা হয়েছে।
গাছ চুরির অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে টনির মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। তার স্ত্রী রোখসানা বেগম ফোন ধরে জানান, তার স্বামী বাড়িতে নেই। তাই এ ব্যাপারে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে ১ কোটি ৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ব্যয়ে গোদাগাড়ীর ফরাদপুর মৌজায় পদ্মার চরের ৯০ হেক্টর জমিতে এক লাখ ৩২ হাজার গাছ লাগিয়ে বনটি গড়ে তোলা হয়। বনের উপকারভোগী এলাকার ৫৪৯ ব্যক্তি। ২০১০-১১ অর্থবছরে ৫০ হেক্টর এবং ২০১১-১২ অর্থ বছরে সরকারিভাবে ৪০ হেক্টর জমিতে গাছ লাগিয়ে বনটি তৈরি করা হয়। বনে খয়ের, আকাশমনি, ইপিল ইপিল, ঝাউ, রেইন্টি কড়ই, বাবলা, শিশু, অর্জুন ও নিমসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ রয়েছে।

শর্টলিংকঃ