ইতিহাসের পাতায় ভয়ঙ্কর সেই বছরগুলো

  • 2
    Shares

অনলাইন ডেস্ক: করোনা মহামারি এবং তার ফলে বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক ধসের কারণে ২০২০ সালকে মানুষ যেমন ভবিষ্যতে বিপর্যয়ের একটা বছর হিসাবে মনে রাখবে, তেমনি ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যাবে এমন আরও ভয়ঙ্কর ও বিপর্যয়ের বছর মানুষ অতীতে প্রত্যক্ষ করেছে।

কোভিড-১৯ সংক্রমণের পরিসংখ্যান বলছে জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সংকলিত তথ্য অনুযায়ী বিশ্ব জুড়ে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ৭ কোটি ৪৫ লক্ষ মানুষ এবং মারা গেছে ১৬ লাখ। কিন্ত ইতিহাসে এর চেয়েও ভয়ঙ্কর মহামারির ঘটনা অতীতে ঘটেছে।

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারি ছিল বিউবোনিক প্লেগের প্রার্দুভাব। ১৩৪৬ সালে প্রথম প্লেগের প্রার্দুভাব ছড়াতে শুরু করে।

ব্ল্যাক ডেথ বা কালো মৃত্যু নামে ইতিহাসে পরিচিত ওই মহামারি পরবর্তী কয়েক বছরে কেড়ে নিয়েছিল শুধু ইউরোপেই আড়াই কোটি জীবন- সারা পৃথিবীতে ওই প্লেগে মারা যায় বিশ কোটি মানুষ। ইতিহাস বলে প্রায় অর্ধেক ইউরোপ উজাড় হয়ে গিয়েছিল ওই ভয়ঙ্কর মড়কে।

স্পেন ও পর্তুগাল থেকে ১৫২০ সালে অভিযাত্রীরা আমেরিকায় নিয়ে যায় গুটি বসন্ত রোগ। ওই মড়কে আমেরিকার আদি জনগোষ্ঠীর ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ উজাড় হয়ে যায়। এরপর ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু থেকেও পৃথিবীতে মারা গিয়েছিল পাঁচ কোটি মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ঘরে ফেরা সৈন্যদের থেকে এই ফ্লু ভাইরাস ছড়িয়েছিল। ওই মহামারিতে গোটা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩ থেকে ৫% প্রাণ হারায়।

এইচআইভি এইডস যখন মহামারি আকারে প্রথম ছড়িয়েছিল ১৯৮০র দশকে, তখন সেই মহামারিতেও প্রাণহানি ঘটেছিল তিন কোটি ২০ লাখ মানুষের।

রহস্যজনক কুয়াশা
যদিও এই ইতিহাস খুবই প্রাচীন, কিন্তু ঐতিহাসিক মাইকেল ম্যাকরমিক বলছেন ৫৩৬ সালে আঠারো মাস ধরে বিশ্বের বিরাট একটি অঞ্চলে আকাশ ছিল অন্ধকার। আমেরিকার হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগ বিষয়ে ইতিহাসবিদ এবং নৃতত্ত্ববিদ মি. ম্যাকরমিক বলছেন ঐ বছর একটা রহস্যজনক কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল ইউরোপ, মধ্য প্রাচ্য ও এশিয়ার অনেক জায়গার আকাশ।

যেসব দেশের আকাশে এই কুয়াশা নেমে এসেছিল সেসব দেশে ১৮ মাস একনাগাড়ে সূর্যের আলো দেখা যায়নি। সূর্যকে আঠারো মাস ধরে ঢেকে রেখেছিল ঐ কুয়াশার চাদর।

একজন ইতিহাসবিদ লিখেছেন ঐ ১৮ মাস সূর্যের আলো ছিল চাঁদের আলোর মত স্তিমিত ও ঠাণ্ডা।

মাইকেল ম্যাকরমিক বলছেন, সেটা সবচেয়ে ভয়াবহ ও দুঃস্বপ্নের সময় ছিল, বেঁচে থাকার জন্য এত খারাপ সময়” পৃথিবীর ওই দেশগুলো আর কখনও পার করেনি।

পৃথিবীর একটা বিস্তীর্ণ এলাকার আকাশ গ্রাস করেছিল ওই রহস্যজনক কুয়াশা। দীর্ঘ অতগুলো মাস সূর্য তাপ ছড়াতে না পারায় তাপমাত্রা নেমে যায়। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়, মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যায়। বিগত ২৩০০ বছরের মধ্যে সেই সময়টাই ছিল সবচেয়ে শীতল যুগ। এই শীতলতম যুগ ও রহস্যময় কুয়াশার কথা ইতিহাসবিদরা অনেক দিন থেকেই জানতেন। কিন্তু এর সঠিক কারণ জানা ছিল না।

মাইকেল ম্যাকরমিক বলছেন তাদের গবেষণা থেকে তারা ধারণা করছেন আইসল্যান্ড অথবা উত্তর আমেরিকার কোথাও একটি ভয়াবহ অগ্নুৎপাত থেকে সম্ভবত এই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। এই বিশাল অগ্নুৎপাতের ফলে আগ্নেয়গিরি থেকে উত্তর গোলার্ধে ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে ব্যাপক পরিমাণ ছাই।

গবেষকদের ধারণা আগ্নেয়গিরির ওই উদ্গীরণ থেকে সৃষ্ট কুয়াশা বাতাসের সাথে ছড়িয়ে গিয়েছিল ইউরোপে এবং পরে মধ্য প্রাচ্য ও এশিয়ার অনেকগুলো দেশে।

এর থেকেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আবহাওয়া ও শীতল যুগের বিপর্যয় নেমে এসেছিল দেশগুলোর ওপর।

অর্থনৈতিক ধস
করোনা মহামারি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কম বেশি অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করেছে। কোটি কোটি মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। কিন্তু বেকারত্বের ভয়াবহতা ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা বিশ্বব্যাপী ‘মহা মন্দা’কে এখনও ছুঁতে পারেনি।

এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল ১৯৩৩ সাল। বলা হয় আমেরিকায় দেড় কোটির মত লোক এ মন্দার কবলে বেকার হয়ে পড়েন। ওই অর্থনৈতিক মন্দার কারণে জার্মানিতে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন বেকার হয়েছিল। ওই বছরই সেসময়কার জনপ্রিয় রাজনীতিক ও তখন দেশটির চান্সেলার অ্যাডল্ফ হিটলার জার্মানির ক্ষমতায় আসেন।

মহা খরা ও মনুষ্য জাতি
ইতিহাসের পাতায় আরেকটি সময় বিশেষ করে এই করোনা মহামারির বছরে সামনে এসেছে। সেটি হল চলাচল নিষিদ্ধ করে মানুষকে এক জায়গায় আবদ্ধ রাখার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আমাদের পূর্ব পুরুষরা গিয়েছিলেন বলে নৃতত্ত্ববিদরা মনে করেন।

সেটি ছিল এক লাখ ৯৫ হাজার বছর আগের ঘটনা। তখন এমন এক ঠাণ্ডা ও শুষ্ক যুগের শুরু হয়েছিল ইতিহাসের পাতায় যে যুগের উল্লেখ আছে ‘মেরিন আইসোটোপ স্টেজ সিক্স’ নামে।

নৃতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কার্টিস ম্যারিয়ান এবং আরও কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন আবহাওয়ার ঐ বিপর্যয়কর পরিস্থিতির ফলে যে মহা খরা দেখা দিয়েছিল তা মানবজাতিকে প্রায় নিশ্চিহ্ণ করে দেবার মত পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

অধ্যাপক কার্টিস ম্যারিয়ান বলছেন সেসময় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে মনুষ্য প্রজাতির বহু মানুষ একসঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল আফ্রিকার একেবারে দক্ষিণ উপকূলে সমুদ্রের ধারের সম্ভবত কোন এক গুহায়।

সেখানে তারা আবদ্ধ অবস্থায় যে জায়গায় একসঙ্গে ছিলেন সে জায়গায় তার নাম কালক্রমে দেয়া হয় ‘ইডেনের উদ্যান’। মানুষ প্রজাতি তখন সামুদ্রিক প্রাণী খেয়ে জীবন ধারণ করতে শেখে বলে বলছেন অধ্যাপক ম্যারিয়ান। এবং মানুষ প্রজাতির এই মানুষগুলোকে সেসময় বাঁচানো না গেলে মানবজাতি সেসময় পুরো বিলুপ্ত হয়ে যেত।

বিস্ফোরণ বিপর্যয়
এবছর অর্থাৎ ২০২০য়ে বৈরুতের বন্দরে অবৈধভাবে মজুত রাখা ২,৭৫০টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরিত হয়ে যে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে, তাতে মারা যায় ১৯০জন এবং আহত হয় ৬ হাজারের বেশি মানুষ। এই ঘটনার পর ইতিহাসের ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা সামনে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলেন বৈরুতের এই বিস্ফোরণ ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে ভয়াবহ অপারমাণিক বিস্ফোরণ।

তারা বলছেন, এই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরকের ক্ষমতা ছিল এক কিলো টন টিএনটি বিস্ফোরকের সমান যা হিরোশিমা বোমার শক্তির বিশভাগের এক ভাগ। তবে ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতের ভোপাল শহরে মার্কিন কীটনাশক কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুকে আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা বলে অভিহিত করা হয়।

ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী ঐ দুর্ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই মারা যায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ এবং এ পরবর্তী বছরগুলোতে ঐ দুর্ঘটনা থেকে ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় আরও ১৫ হাজারের বেশি মানুষের।

রাসায়নিক থেকে বিষাক্ত যে ধোঁয়া সৃষ্টি হয়েছিল তা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে শহরের আবহাওয়ায় ছড়িয়েছিল। ঐ বিষাক্ত ধোঁয়ার প্রভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে এখনও জীবন কাটাচ্ছে বহু মানুষ, বিধ্বস্ত হয়ে গেছে বহু মানুষের জীবন।

সবশেষে আরেকটি অন্য ধরনের বিস্ফোরণের কথা। সেপ্টেম্বর ১৯২৩ জাপানে একটি বড় ধরনের ভূমিকম্পের ফলে একটা বিধ্বংসী আগুনের ঝড় সৃষ্টি হয়েছিল এবং তার থেকে এমনকি ভয়ঙ্কর একটা অগ্নি-ঘূর্ণিঝড় বয়ে গিয়েছিল টোকিও আর ইয়োকোহামা শহরের মধ্যে। আর এতে মারা গিয়েছিল এক লাখ ৪০ হাজার মানুষ। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

 

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ