ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ করবেন যেভাবে

অনলাইন ডেস্ক: রক্তে উচ্চ মাত্রার ইউরিক অ্যাসিড একজন ব্যক্তির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা হ্রাস করতে পারে। ইউরোপীয় জার্নাল অব ইন্টারনাল মেডিসিনে এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। লিমেরিক স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকরা এই গবেষণায় দাবি করেছেন, রক্তে উচ্চ মাত্রার ইউরিক অ্যাসিড একজন ব্যক্তির আয়ু ১১ বছর কমিয়ে দিতে পারে।

মহিলাদের ক্ষেত্রেও একই রকম কিছু ফল দেখা গেছে। শরীরে সিরাম ইউরিক অ্যাসিডের উচ্চ মাত্রা (৪১৬মাইক্রোমল / এল এর চেয়ে বেশি) মহিলাদের আয়ু ৬ বছর কমিয়ে আনতে পারে বলে ওই রিপোর্টে জানানো হয়েছে। গবেষণার এই পরিসংখ্যানগুলো অবশ্য এখনও পরীক্ষামূলক স্তরে রয়েছে।

ইউরিক অ্যাসিড এক ধরনের রাসায়নিক যা খাবার হজম করবার সময় শরীরে উৎপন্ন হয়। ইউরিক অ্যাসিডে ‘পিউরিনস’ নামে এক ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে যা কিছু কিছু খাবারের মধ্যে পাওয়া যায়।

ইউরিক অ্যাসিড রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়ে কিডনিতে পরিশ্রুত হয়ে প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। কিন্তু মাঝে মধ্যে শরীর এতটা বেশি পরিমাণের ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদন করে ফেলে যে তা ঠিক মতো পরিশ্রুত হতে পারে না। পারিবারিক রোগভোগের ইতিহাস, কর্মঠ না হওয়া এবং প্রচুর পরিমাণ আমিষ খাওয়ার ফলে শরীরে অত্যধিক ইউরিক অ্যাসিড উৎপন্ন হতে পারে।

প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তা হলে বাতের সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং কিডনিতে পাথর তৈরি হতে পারে। এমনকি, এ থেকে কিডনি চিরতরে বিকলও হয়ে যেতে পারে।

ওজনের দিকে নজর রাখুন। মেদযুক্ত কোষ এবং বাড়তি ওজনের সমস্যা থাকলে ইউরিক অ্যাসিড বাড়তে পারে।

যে সব খাবারে পিউরিনের পরিমাণ বেশি সেই খাবারগুলো কমিয়ে দিতে হবে। মাংস, ডিম বা মাছে পিউরিন বেশি মাত্রায় থাকে। এ ছাড়া মাশরুম, মসুরের ডাল ও পালংশাক খাওয়াও কমাতে হবে।

চিনি থেকে সাবধান। বিভিন্ন ধরনের পানীয় ও মিষ্টি খাবারে ফ্রুক্টোস নামের একটি জিনিস ব্যবহৃত হয়। এই ফ্রুক্টোস কিন্তু ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যারা বেশি পরিমাণে মিষ্টি পানীয় খান তারা বেশি বাতের সমস্যায় ভোগেন।

এছাড়া, মদও ইউরিক অ্যাসিড বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত পরিমাণ বিয়ার পান করলে জয়েন্টের ব্যথার সমস্যা হয়। উচ্চ মাত্রায় চিনি খাওয়াও হতে পারে ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধির একটা বড় কারণ। দেহে উচ্চ মাত্রার ইউরিক অ্যাসিডের উপস্থিতির কারণে হতে পারে গেঁটে বাত, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা-সহ নানা রকমের অসুখ। তাই খাবারে চিনির মাত্রা কমান।

বেশি মাত্রায় পুষ্টিকর খাবার খেলেই শরীর সুস্থ রাখা যায় না। অবিলম্বে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া বন্ধ করুন। অতিরিক্ত পুষ্টি শরীর সঞ্চয় করে রাখতে পারে না। সে ক্ষেত্রে, এই পুষ্টিগুলো এক হয় মেদে পরিণত হয়, অন্যথায় শরীর থেকে বিভিন্ন উপায়ে বেরিয়ে যায়।

প্রোটিন হজমের পর শরীর কিন্তু অ্যামোনিয়া উৎপাদন করে। এর থেকেও ইউরিক অ্যাসিড সৃষ্টি হয়। তাই অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ বন্ধ করুন। একজন মানুষের ওজনের উপর নির্ভর করে তিনি কতটা প্রোটিন খাবেন – প্রতিদিন প্রতি ১ কেজি ওজনের জন্য ১ গ্রাম প্রোটিন খাওয়া উচিত (ওজন ৭২ কেজি হলে দিনে ৭২ গ্রাম)। যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা পরিশ্রমসাধ্য কাজ করেন তারা সামান্য বেশি প্রোটিন খেতে পারেন।

প্রসেস করা খাবারও কিন্তু চিন্তার কারণ। প্রথমত, এই খাবারগুলোতে বেশি পরিমাণের সোডিয়াম থাকে যা থেকে শরীরের ধাতুর ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই খাবারগুলোতে প্রচুর মেদযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করা হয় যা থেকে ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধি পায়। তৃতীয়ত, এই খাবারগুলোতে ফাইবার কম থাকে যা ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই তো ইউরিক অ্যাসিড বেশি থাকলে ফাইবার যুক্ত খাবার বেশি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ইউরিক অ্যাসিড কমাতে সাহায্য করে ভিটামিন ই । মেটে, মুরগির মাংস, বাদাম, আপেল, বিট, রাঙালু ও ব্রকোলিতে ভিটামিন-ই পাওয়া যায়।

ভিটামিন সি-ও একই কাজ করে থাকে। পেয়ারা, কমলা লেবু, বেল পেপার, পাতিলেবুতে ভিটামিন সি থাকে। ম্যাগনেসিয়ামও গাউট সমস্যা মুক্তির জন্য খুব উপকারী।

পানির কোনও বিকল্প নেই। প্রতিদিন অন্তত আট গ্লাস করে পানি পান করুন।

স্বাভাবিক অবস্থায় শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের নির্দিষ্ট মাত্রা হল, পুরুষের ক্ষেত্রে: ৩.৪–৭.0 এমজি/ডিএল এবং মহিলার ক্ষেত্রে: ২.৪–৬.0 এমজি/ডিএল। এর চেয়ে বেশি হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর জন্য অব্যর্থ টোটকা অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার। ১ চা চামচ ভিনেগার নিন, এক গ্লাস পানির সঙ্গে মিশিয়ে দিনে অন্তত ২-৩ বার এই মিশ্রণ পান করুন নিয়মিত। উপকার পাবেন।

গবেষকরা বলেছেন, চিকিৎসকদের পরামর্শের মাধ্যমে আমরা ওষুধের দ্বারা রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা স্বাভাবিক করতে পারি। স্বাস্থ্যকর খাবার ও ফিটনেস এক্ষেত্রে সহায়ক হিসাবে প্রমাণিত হতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে ইউরিক অ্যাসিডের বিপদ এড়াতে ৯ ধরণের খাবার এড়িয়ে চলা উচিৎ। পালং শাক, মাশরুম, রেড মিট, চিংড়ি, টমেটো, মুগ ডাল, মসুর, সয়াবিন এবং কফি না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ