আরও চারজনসহ করোনা আক্রান্ত মোট ১৮ জন

সোনালী ডেস্ক: ইতালিফেরত এক ব্যক্তির পরিবারের তিন সদস্যের মধ্যে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ গতকাল বৃহস্পতিবার আইইডিসিআরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। তবে সংবাদ সম্মেলনের পরে জানা যায় চুয়াডাঙ্গায় ইতালিফেরত একজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এনিয়ে বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে।
ব্রিফিংয়ে অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, নতুন আক্রান্ত তিনজনের মধ্যে একজন নারী, বয়স ২২ বছর। আর দুইজন পুরুষ, একজনের বয়স ৬৫ বছর, অন্যজনের ৩২। নতুন আক্রান্ত তিনজনই স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হয়েছেন এবং একই পরিবারের সদস্য। তারা ইতালি ফেরত একজনের কনটাক্টে এসেছেন। তিনিও ওই পরিবারের সদস্য এবং আগেই আক্রান্ত হয়েছেন। মহাপরিচালক বলেন, আক্রান্ত ওই তরুণীর মধ্যে উপসর্গ খুবই মৃদু। বাকি দুজনের জ¦র রয়েছে, তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া অন্য কোনো সমস্যা তাদের নেই। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে এখন মোট ১৯ জনকে আইসোলেশনে রাখ হয়েছে। আর প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে আছেন ৪৩ জন। অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গায় ইতালিফেরত একজনকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি গত ১ মার্চ ইতালি থেকে দেশে এসেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এএসএম মারুফ হাসান এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, আক্রান্ত ব্যক্তি গত চারদিন ধরে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে আইসোলেশনে ছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন।
অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের বিষয়টিকে সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে দেখছে। সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক কিট ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসক-নার্স কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুসারে পার্সোনাল প্রটেকশন (পিপিই), কোনো কিছুরই অভাব হবে না। তিনি বলেন, রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদফতর ভবনের দ্বিতীয় তলায় বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় কোনো দুর্যোগে সর্ববৃহৎ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষটি সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকছে। রাজধানীসহ সারাদেশে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো ক্ষেত্রেই অবহেলা দেখানো হচ্ছে না, বরং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য মহাপরিচালক বলেন, বরিশাল ব্যতীত দেশের বিভিন্ন বিভাগে করোনাভাইরাস পরীক্ষার পরীক্ষাগার রয়েছে। আমরা আগেও বলেছি প্রয়োজনে আইইডিসিআরের বাইরের ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষা করা হবে। অনেকেই অনেক কথা বলতে পারেন, কিন্তু এই ল্যাবরেটরিগুলোতে পরীক্ষার নমুনা পরীক্ষার জন্য কিছুটা প্রস্তুতিরও প্রয়োজন রয়েছে।
ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে ব্যাকআপ সুবিধার জন্য অতিরিক্ত ১৬টি পিসিআর মেশিনের ব্যবস্থা করার জন্য বলা হয়েছিল। ইতোমধ্যে সাতটি মেশিন পাওয়া গেছে। তিনি জানান, প্রতিদিনই নমুনা পরীক্ষার জন্য কিট সংগ্রহ করা হচ্ছে। চীন থেকে ২/১ দিনের মধ্যে টেস্ট কিট ও পিপিই আসবে। সরকারের রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) বুধবারের ব্রিফিংয়ে প্রথমবারের মত বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত একজনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছিল। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানিয়েছিলেন, সত্তরোর্ধ্ব ওই ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন বিদেশফেরত এক ব্যক্তির সংস্পর্শে আসায়। ওই বৃদ্ধের আগে থেকেই সিওপিডি (ফুসফুসের ক্রনিক রোগ) ছিল, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি জটিলতা ছিল। এ ছাড়া হৃদযন্ত্রে একবার স্টেন্টিংও হয়েছিল। এতদিন অধ্যাপক ফ্লোরাই আইইডিসিআরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের করোনাভাইরাস নিয়ে তথ্য দিয়ে আসছিলেন। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নিজে ব্রিফ করতে আসেন।
ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলা হয়, অনিবার্য কারণে অধ্যাপক ফ্লোরা আসতে পারেননি। তবে তার একজন সহকর্মী বলেন, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ায় তাদের পরিচালক কিছুটা অসুস্থ বোধ করছেন। অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আর কারও মৃত্যু হয়নি, এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ওই একজনই আছে। বিশ্বজুড়ে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৮ মার্চ প্রথম বাংলাদেশে তিনজন এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর জানায় আইইডিসিআর। ওই তিনজনের মধ্যে দুজন ইতালি থেকে এসেছিলেন। ইতালি ফেরত একজনের পরিবারের সদস্য ছিলেন আক্রান্ত তৃতীয়জন। ওই সময় আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তির পাশাপাশি আরও চারজনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল। এরপর গত ১৪ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আরও দুজন আক্রান্তের খবর জানান। ওই দুজন ইউরোপের দেশ ইতালি ও জার্মানি থেকে এসেছিলেন। তাদেরই একজনের মাধ্যমে পরিবারের এক নারী ও দুই শিশুর আক্রান্ত হওয়ার খবর আইডিসিআর জানায় সোমবার। আর মঙ্গলবার আরও দুইজনের মধ্যে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার কথা জানিয়ে বলা হয়, তাদের একজন হাসপাতালে কোয়ারেন্টিনে ছিলেন, অন্যজন বিদেশফেরত একজনের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর গত বুধবার নতুন করে একজন নারী ও তিনজন পুরুষের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার কথা জানান অধ্যাপক ফ্লোরা। তাদের মধ্যে একজন আগে আক্রান্ত একজনের পরিবারের সদস্য। বাকি তিনজন বিদেশফেরত, দুজন ইতালি থেকে এবং একজন কুয়েত থেকে এসেছেন। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আক্রান্তদের মধ্যে প্রথম দফার তিনজন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন, হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১৩ জন। আর একজনের মৃত্যু হয়েছে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫৮টি দেশে ২ লাখ ১৮ হাজার মানুষ নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা ৮৮০০ ছাড়িয়ে গেছে।

শর্টলিংকঃ