আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারতের অবদান

  • 303
    Shares

।।ড. মো. হাসিবুল আলম প্রধান।।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ভারতের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত। শুধু সীমান্তে, শরণার্থী শিবিরে ও রণাঙ্গনেই নয়, কূটনৈতিক অঙ্গন ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও ভারত সরকার এবং ভারতীয় জনগণের ভূমিকা ও অবদান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় নানাভাবে ঠাঁই পেয়েছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের বহুমাত্রিক অবদানের কথা আমাদের মুত্তিযুদ্ধের অনন্য ইতিহাসেরই অংশ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি বড় জায়গা জুড়ে রযেছে ভারতের বহুমুখী ভূমিকা । বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যমূলক গবেষণায় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গটির নানা দিক বিস্তারিতভাবে নতুন প্রজন্মের নিকট উপস্থাপিত হওয়া খুবই জরুরী। বিগত কয়েক বছর ধরে নানা ধরণের লেখা ও গবেষণায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের বিষয়টি নানা আঙ্গিকে উপস্থাপিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে সকল ভারতীয় সেনা শহীদ হয়েছে তাদের পুর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করে পর্যায়ক্রমে তাঁদের পরবিারগুলোকে সম্মাননা জানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে ঘুমন্ত শান্তিপ্রিয় বাঙালিদের উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নারকীয় , বর্বরোচিত ও নৃশংস গণহত্যাযঞ্জ চালায় এবং এরই প্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ প্রত্যুষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেবার কারণে পাকিস্তানি সৈন্যদর হাতে গ্রেফতার হন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরিচালিত বর্বরোচিত গণহত্যার কথা বিশ্ববাসীকে জানাতে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সরকার গঠনের কথা মাথায় রেখে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সাথে নিয়ে ২৭ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করে সীমান্তের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান, উদ্দেশ্য ভারত গমণ। এ লক্ষ্যে ৩০ মার্চ বিকেলেই তাজউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ও মাহবুব উদ্দীনকে সঙ্গে নিয়ে জীবননগর হয়ে কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। প্রকৃতপক্ষেই তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যথাযোগ্য সম্মানের সাথে গ্রহণ করে। ৩০ মার্চ রাতেই তাঁরা প্রথমে কৃষ্ণনগরে পৌঁছান এবং সেখান থেকে কলকাতা যান। বিএসএফের আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদার ও বিএসএফের প্রধান রুস্তমজীর প্রচেষ্টায় তাজউদ্দিন আহমদ ও ইন্দিরা গান্ধীর প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে দিল্লীতে ৪ এপ্রিল সন্ধ্যারাতে। ৪ এপ্রিলের সাক্ষাতে প্রাথমিক সম্ভাষণ বিনিময়ের পর ইন্দিরা গান্ধী প্রথম প্রশ্ন করেন ÒHow is Sheikh Mujib? Is he all right?” তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বলেন যে, শেখ মুজিব তাঁদেরকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন, তাঁর বিশ্বাস মুজিব কোন গোপন স্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশ দিচ্ছেন। তবে ২৫ মার্চের রাতের পর থেকে মুজিবের সাথে তাঁদের কোন যোগাযোগ নেই। এ সাক্ষাৎকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিকট তাজউদ্দীন আহমদ সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে সহযোগিতা প্রার্থনা করেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দেশ ত্যাগ করে যারা ভারতে প্রবেশ করেছে তাদেরকে শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ, ভারতের ভূখন্ড ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার অনুমতি প্রদান, মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও সামরিক রসদ সরবরাহ ইত্যাদি। দ্বিতীয় দিন ৫ এপ্রিল আবারও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাজউদ্দিনের আলোচনা হয়। এসব আলাচনায় তাজউদ্দীনের প্রজ্ঞা ও কূটনৈতিক আচরণ এবং দূরদর্শিতা ইন্দিরা গান্ধীর মনোযোগ আকর্ষণ করে। দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় প্রার্থিত বিষয়ে ভারত সরকারের সহানুভূতি সঞ্চারিত হয় এবং সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া যায়। তাজউদ্দীন আহমদ দিল্লীতে গিয়ে কেবল মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সর্বাত্মক সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিত করেননি , তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে একটি সরকার গঠনের প্রায় সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে কলকাতায় ফিরে আসেন।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ (১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত ১৬৭ জন এমএনএ) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করে। এর মাধ্যমে সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ঘোষণাপূর্বক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ইতোপূর্বে ঘোষিত স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করেন এবং বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠণের মধ্য দিয়ে একটি বৈধ সরকারের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার প্রক্রিয়া শুরু করে। ঐদিন রাত সাড়ে ৯টায় তাজউদ্দিন আহমদের কন্ঠে বাংলাদেশ সরকার গঠন সংক্রান্ত ভাষণটি আকাশবাণী কলকাতার একটি কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল আগরতলায় কর্নেল ওসমানীকে পেয়ে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির পদ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানালে তিনি তাতে সম্মতি দেন। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সকাল এগারটায় পূর্ব নির্ধারিত স্থান বাংলােদশের মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলা নামক বৃক্ষরাজি ঢাকা ছায়াসুনিবিড় একটি গ্রামে এই নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় যা মুজিবনগর সরকার নামেই ইতিহাসে পরিচিত। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র জারী ও স্বাধীন বাংলাদেশের ১ম সরকার গঠন এবং ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারেরর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা বাঙালি জাতি কোনদিন ভুলবে না। ।আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার নামে মুজিবনগরকে রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করে কাগজপত্রে ব্যবহার করলেও বাস্তবে তাদের অবস্থান ছিলো কলকাতায়। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারাও ভারতেই ট্রেনিং নিয়ে তাদের অস্ত্রের সহায়তা নিয়েই জন্মভূমিতে ফেরেন দেশকে মুক্ত করতে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে ভারতীয় সৈন্যরা আমাদের মুক্তিবাহিনীর সাথে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের বিজয়কে তরান্বিত করতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত লাখ লাখ শরণার্থীকে ভারতে শুধু আশ্রয় নয়, আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র ট্রেনিংসহ অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করতে সযোগিতা করেছে। সর্বোপরি ভারতীয় সৈন্যরা ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ কমান্ড গঠন করে সরাসরি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছে। পাকিন্তানী হানাদার সৈন্যদের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ও বর্বর নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের মাটিতে, যা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সর্বাধিক শরণার্থী বিপর্যয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনাবর্তে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত সরকার এবং সেই সঙ্গে দেশটির সকল স্তরের মানুষ ও সশস্ত্র বাহিনীর অবদান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১এ বাংলাদেশের যে এক কোটি মানুষ ভারতে বিশেষ করে পশ্চিম বাংলায় আশ্রয় নিয়েছিল তাদের খাদ্য সরবরাহ , বাসস্থান ও আশ্রয় দিয়ে ভারত সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের পাশে যেভাবে দাঁড়িয়েছিল তা সত্যিই এক অনন্য ঘটনা। কেবল শরনার্থীদের জন্য সেপ্টেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত ভারতকে ব্যয় করতে হয়েছে ২৬০ কোটি টাকা। সে সময় ভারত বাদে অন্যান্য দেশ থেকে সাহায্য এসেছিল ভারতীয় টাকায় মাত্র ৫০ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তযোদ্ধাদের ট্রেইনিং ও অস্ত্র দিয়ে এবং তাঁর দেশের সৈন্য পাঠিয়ে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছেন তা বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণকে এক চিরশান্তি ও মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। লক্ষাধিক মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও অন্যান্য রশদ সরবরাহসহ সামরিক খাতে ব্যয় ছিল তখনকার মানে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ১৬ মে, ১৯৭১ সালে বাগডোগরা এয়ারপোর্টে নেমে সেখান থেকে হলদিবাড়ি ও দেওয়ানগঞ্জ শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। তিনি হলদিবাড়ি শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের সময় শরণার্থীদের বলেন যে, ভারত গরিব দেশ এবং ভারতের লোকেরাও গরিব; তবুও ভারত সাধ্যমতো এই শরণার্থীদের সেবা করবে।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর এদিন মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বের ইতিহাস শুরু হয় । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এদিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নয় মাসের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল সীমান্তে ও দেশের অভ্যন্তরে আনাচে কানাচে। সর্বত্রই পাকিস্তানি বাহিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসী আক্রমণের শিকার হয়ে পিছু হটছিল। তাদের হাতের মুঠো থেকে ক্রমেই বেরিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে তাদের দুরবস্থা বাড়ছিল। ক্রমেই বেশি সংখ্যক এলাকায় উড়ছিল বাংলাদেশের পতাকা। এদিকে মুক্তিযুদ্ধকে একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা চলমান ছিল। তারই পরিণতিতে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের জিওসি লে. জেনারেল জগুুুুজিৎ সিং অরোরার নেতৃত্বে গঠিত হয় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড। অর্থাৎ ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী এবং বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত হলো মিত্রবাহিনী। ৩ ডিসেম্বর বিকেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতার এক জনসভায় ভাষণদানকালে কোনো রকম উস্কানি ছাড়াই পাকিস্তানি জঙ্গি বিমানগুলো ভারতের পশ্চিম সীমান্তে অমৃতসর, আম্বালা ও উধমপুরমহ কয়েকটি বিমান ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে। এতে করে ভারতজুড়ে জারি হয় জরুরি আইন। সে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্তপর্ব। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের যুদ্ধ ভারতের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ মোকাবিলায় দেশকে তৈরি করা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই।’

৩ ডিসেম্বর গভীর রাতেই বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড দুর্বার বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ে। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধরত বাংলাদেশের সশস্ত্র ও মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় মিত্রবাহিনী অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্ত এলাকায় অবস্থিত মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় । এ সময় নবম ডিভিশন গরীবপুর-জগন্নাথপুর হয়ে যশোর ঢাকা মহাসড়কসহ চতুর্থ ডিভিশন ষষ্ঠ ডিভিশনের বেশ কয়েকটি এলাকায় যোগাযোগ পথে (রুট) বাংলাদেশে প্রবেশ করে।এতে করে যশোর কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, জেলার আরো কয়েকটি থানা মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। ঐদিন গভীর রাতে পূর্ণাঙ্গ লড়াই শুরু হলে মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনির জেড ফোর্স, এস ফোর্স ও কে ফোর্সের সাথে সম্মিলিত বাহিনি হিসেবে ভারতের সশস্ত্র বাহিনি বাংলাদেশকে মুক্ত করার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চতুর্দিক থেকে বাংলাদেশের দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ শুরু করল ভারতীয় সেনা, বিমান এবং নৌবাহিনী। আর মুক্ত এলাকা থেকে যোগ দিল বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী। ভারতীয় নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী সমস্ত পাক অধিকৃত বন্দর অবরোধ করে জলপথে সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। আক্রমণের প্রথমেই হানাদার বাহিনীর সাবমেরিন গাজীকে বঙ্গোপসাগরে সলিল সমাধি ঘটানো হয়। পাকিস্তান এয়ারলাইন্স পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে সব ফ্লাইট বাতিল করে। সীমান্তে যৌথ বাহিনির আক্রমণ অভিযানের প্রচন্ডতার পাশাপাশি অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরে নানা স্থানে পাকিস্তানি বাহিনির উপর আক্রমণ জোরদার করেন। তার ফলে ক্রমাগত পিছু হটতে থাকে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনি। আর এ পরিস্থিতিতে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে তাদের দোসররা।

১৯৭১-এর ২৬ মার্চ প্রত্যুষে স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। ২৯০ দিন তিনি বন্দি ছিলেন পাকিস্তানে । কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় আগস্টে তাঁর গোপন বিচারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন পাকিস্তানের সামরিক জান্তার প্রধান জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। আগস্টের শুরুতে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা দেন যে পাাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ও অন্যান্য অপরাধের জন্য বিশেষ সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার করা হবে। প্রহসনের বিচারের আগে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। বন্দি অবস্থায় প্রহসনের বিচার করে তাঁকে হত্যার সব রকম আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছিল। বিশ্ববাসী বুঝতে পেরেছিল পাকিস্তান সরকার যে কোনো কায়দায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের মনোবলে চিড় ধরাতে চায়। প্রহসনের বিচার শেষ হয় ডিসেম্বরের ৪ তারিখে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শেখ মুজিবুর রহমানকে সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষকে ফাঁসির সব রকম ব্যবস্থা নিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল, যাতে ওই আদেশ-সংবলিত বিশেষ টেলিগ্রামটি পৌঁছানো মাত্রই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায়। সামরিক আদালতের সেই রায় বঙ্গবন্ধু ধীর শান্ত মনে গ্রহণ করে নিজেকে মৃত্যুর জন্য তৈরী করে রেখেছিলেন। রায় ঘোষিত হওয়ার দিবাগত রাতেই বঙ্গবন্ধুকে লায়ালপুর জেলখানা থেকে মিয়াওয়ালি জেলে হেলিকপ্টারযোগে স্থানান্তরিত করা হয় । বঙ্গবন্ধু তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রস্তুতি জানাতে গিয়ে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের কাছে এক সাক্ষাতকারে বলেছেন যে জেলে তাঁর সেলের পাশে কবর পর্যন্ত খোঁড়া হয়েছিল । ডেভিড ফ্রস্টের এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন ‘Yes, I’ve seen it with my own eyes, and I said, ‘I know, this is my grave perhaps.’ All right, I’m ready’. অষষ ৎরমযঃ, ও’স ৎবধফু’। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি প্রধানত ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সর্বাত্মক উদ্যোগ ও হস্তক্ষেপের কারণে। বঙ্গবন্ধুর প্রহসনের বিচার বন্ধ করে তাঁর মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারকে চাপ দেয়ার ব্যাপারে অনুরোধ জানিয়ে তিনি ৬৭ টি দেশের সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্যদের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছিলেন এবং শেষে তিনি স্বয়ং ইউরোপের ৫টি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। তাঁর এসব ইতিবাচক পদক্ষেপসমূহের কারণে প্রতিকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অনুকূলে এসেছিল। পাকিস্তানের সচেতন নাগরিকরাও বঙ্গবন্ধুর বিচার বন্ধ করে তাঁর সঙ্গে আলোচনার দাবি জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ হত্যা করার সাহস না পাওয়ার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে পাকিস্তানিরা ভালোভাবেই জানতো, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিবের ফাঁসির খবর বাঙালিরা জানতে পারলে সেখানে আটকে পড়া ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সেনা অফিসার ও জোয়ানদের একজনকেও বাঙালিরা জীবিত রাখবে না। পাকিস্তান কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় বন্দি মুজিবকে সামরিক আদালতে প্রহসনের বিচার করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করা হলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর নানামুখী উদ্যোগ, হস্তক্ষেপ ও সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কারনে বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষা পায়। বন্দি অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষায় শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর অবদান বাঙালি জাতি চিরদিন মনে রাখবে।

মূলত ৩ ডিসেম্বর বিকেলে ভারতের বিভিন্ন বিমান ঘাটিতে আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অর্থাৎ আমাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ের একটা পর্যায়ে এসে পাকিস্তান ও ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ মোটেও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নয়, এমনকি গৃহযুদ্ধও নয়। কারণ ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারীর মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার পরপর পূর্ব পাকিস্তানের অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবেই বিলুপ্ত হয় এবং আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর বলে অনুমোদিত হয় সেই ঘোষণাপত্রে যা এক অর্থে আমাদের প্রথম সংবিধানও। যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে অপপ্রচার চালায় তারা পরিকল্পিতভাবে এ অপপ্রচার চালায়। বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে এবং তাঁর গড়া সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আমাদের হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাসহ আপামর জনগণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকের রক্ত দিয়ে বীরত্বের সাথে যে লড়াই করেছিল সেটাকে আড়াল করতেই এই মিথ্যাচার। প্রসঙ্গত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের হয়ে অমি রহমান পিয়ালএকটি প্রশ্ন বেশ শক্ত করে করেছিলেন ভারতীয় জেনারেল জেএফআর জ্যাকবকে যিনি ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে যে আত্মসমর্পনের দলিলে পাকিস্তান ও মিত্রবাহিনী স্বাক্ষর করেছিলেন সেই দলিলটির খসড়া রচনা করেছিলেন। প্রশ্নটি ছিল – কোনও কোনও মহল আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে অভিহিত করে এবং এটা আমাদের অহমে আঘাত দেয়। এ বিষয়ে আপনার দৃষ্টি ভঙ্গিটা কি? তার উত্তর ছিলো: I’ve always said it was your liberation war. It was your war of independence, not otherwise. (আমি সবসময়ই বলে এসেছি এটা তোমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ, তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ, অন্য কিছু নয়।)

তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সশস্ত্র সহযোগিতার কথা অস্বীকার করা যাবে না । আমাদের অস্ত্র বলতে কিছুই ছিলো না। ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়ে এবং অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করতে পাঠায়। যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে যখন ভারী অস্ত্রের লড়াই শুরু হলো তখন ভারত তাদের ট্যাংক, কামান, বিমান এবং যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে মিত্রবাহিনীতে সামিল হলো। এসব আমাদের কিছুই ছিল না। যার ফলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, নয় মাস যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। সেদিন বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটের দিকে ঢাকায় রমনা রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। মিত্রবাহিনীর পক্ষে দলিলে সই করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন উপ-সেনাপ্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খন্দকার । এই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয় অর্জিত হয় এং বিশ্বের মানচিত্রে নতুন একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর গভীর রাত থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করার পূর্ব পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ভারত- বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর লড়াইয়ে বাংলাদেশের যোদ্ধাদের পাশাপাশি ভারতীয় ১৬৬৮ সৈন্য শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভারতীয় সেনার নাম, ঠিকানা সংগ্রহ করা হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে ভারত সরকার ও তাঁদের সেনাবাহিনীর অনেক অবদান রয়েছে যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসেরই অংশ। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারানো ভারতীয় সেনা সদস্যদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চার দশকেরও বেশী সময় পর সম্মাননা জানানোর ঊদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সরকার। সম্মাননার অংশ হিসেবে প্রতিটি শহীদ পরিবারের হাতে জাতীয় স্মৃতিসৌধের ক্রেস্ট ও মুক্তিযোদ্ধার সম্মাননা দেওয়াসহ প্রত্যেক পরিবারকে নগদ পাঁচ লাখ টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সরকার। ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভারত সফরের সময় ৭ জন ভারতীয় শহীদ সেনার পরিবারের হাতে এই সম্মাননা তুলে দিয়েছিলেন। নানামুখী সহযোগিতার মাধ্যমে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে ভারত সরকার, ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, ভারতের সেনাবাহিনী ও ভারতের জনগণ যে বিশেষ অবদান রেখেছে তা বাঙালি জাতি চিরদিন গভীর কৃৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে।

লেখক : প্রফেসর, আইন বিভাগ ও পরিচালক, শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ