আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বৃত্তির টাকা লোপাট

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিভাগের আদিবাসী স¤প্রদায়ের মেধাবী ও গরিব শিক্ষার্থীদের বৃত্তির জন্য ১২ লাখ টাকা বৃত্তি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এই টাকা আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র -নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির কর্মকর্তাদের পছন্দের শিক্ষার্থী ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তালিকায় নাম থাকলেও শিক্ষার্থীদের হাতে টাকা দেয়া হয়নি। আবার শুধু রাজশাহী বিভাগের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয়ার কথা থাকলেও বিভাগের বাইরের জেলার শিক্ষার্থীদেরও নাম দেখা গেছে তালিকায়। এদের অনেকেই টাকা পাননি। এভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই টাকা একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা বেনজামিন টুডুসহ একটি চক্র নিজেদের পকেটে পুরেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে রাজশাহী বিভাগের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেধাবী ও গরিব শিক্ষার্থীদের বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়। এ জন্য গত বছর ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ২৭ মে একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বৃত্তি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য শিক্ষার্থীদের তালিকা চাওয়া হয়। পরে প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থীর আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে বৃত্তির জন্য যোগ্য হিসেবে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থীর তালিকা স¤প্রতি প্রকাশ করা হয়। তবে এই তালিকায় নিজেদের ইচ্ছামতো শিক্ষার্থীদের নাম দেয়া হয়।
তবে এদের অনেকেই সেই টাকা এখনো হাতে পাননি। আবার কোনো কোনো শিক্ষার্থীর নাম-পরিচয় ও মোবাইল নম্বরও ভুল করে দেওয়া হয়। কলেজ পর্যায়ে তালিকার ১৪ নম্বরে নাম থাকা নাটোরের কাজলী রানীর বাবা কানাই চন্দ্র বলেন, আমার মেয়ে কালচারাল একাডেমি থেকে কোনো শিক্ষা সহায়তা পায়নি। কারা আমার মেয়ের নাম দিয়েছে বলতে পারব না। আমরা গরিব মানুষ। অনেক কষ্টে মেয়েকে পড়ালেখা করাচ্ছি।
রাজশাহী বিভাগের বাইরে নিয়ম ভেঙে রংপুর বিভাগ থেকেও বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় নাম দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের কলেজ শিক্ষার্থী সন্ধ্যা সরেন বলেন, আমি তো কোনো টাকা পাইনি। আমার নাম কিভাবে গেল ওই তালিকায়! আমাকে কেউ বৃত্তির টাকা দেয়নি। ফোন করা হয় নাটোরের শুভ্র তিরকীকেও। তিনিও একই দাবি করেন। এ ছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, পাঁচ হাজার টাকার পরিবর্তে তাকে দেয়া হয়েছে তিন হাজার টাকা।
সূত্র জানায়, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য এক হাজার ৭০০ টাকা, মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য চার হাজার টাকা এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা করে বৃত্তি দেওয়ার কথা। কিন্তু নয়ছয়ের কারণে বঞ্চিত হয়েছে রাজশাহী বিভাগের ক্ষুদ্র -নৃ-গোষ্ঠী মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীরা।
অভিযোগ রয়েছে, গবেষণা কর্মকর্তা বেনজামিন টুডুর আপন দুই ভাই হরেন্দ্রনাথ টুডু ও নরেন্দ্রনাথ টুডুর সন্তানদের নামেও বৃত্তির টাকা তোলা হয়েছে। আবার কালচারাল একাডেমির প্রশিক্ষক ম্যানুয়েল সরেনের মেয়ে মেলোডি রীলামালা সরেনও পেয়েছেন পাঁচ হাজার টাকা। কালচালার একাডেমির নির্বাহী সদস্য যোগেন্দ্রনাথ সরেন ও চিত্তরঞ্জন সরদারের সন্তানরাও পেয়েছেন বৃত্তির টাকা। কিন্তু তারা সবাই চাকরিজীবী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নানা অনিয়মের কারণে বেনজামিন টুডুকে ২০১২ সালে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। এর প্রায় পাঁচ বছর পরে নির্বাহী কমিটির কোনো সুপারিশ ছাড়ায় মন্ত্রণালয় থেকে তার বরখাস্তের আদেশটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এখন কালচারাল একাডেমিতে তিনিই লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন।
বৃত্তির টাকা নয়ছয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বেনজামিন টুডু বলেন, নাটোর আর জয়পুরহাটের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে টাকা দেওয়া হয়নি। বাকিরা সবাই টাকা পেয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি। কারো কারো নাম খুঁজে পেতেই আমাদের কষ্ট করতে হয়েছে। স্বজনপ্রীতির অভিযোগের বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, নিজেদের ছেলে-মেয়েদের নাম তালিকায় আছে। তারা টাকা পেয়েছে। তাদের বৃত্তি পাওয়ার অধিকার আছে।
বৃত্তি নিয়ে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে কালচারাল একাডেমির উপপরিচালক এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কামরুজ্জামান বলেন, আমি সবেমাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। এখনও একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সঙ্গে পরিচিত হইনি। আমি সেখানে গিয়ে জেনে বিষয়টি জানাতে পারব। কামরুজ্জামানের আগের উপপরিচালক ড. চিত্রলেখা নাজনীন বলেন, বৃত্তি বিতরণের দায়িত্ব গবেষণা কর্মকর্তা নিজেই নিয়েছিলেন। কারা বৃত্তি পেয়েছে বলতে পারব না। এই তালিকা অনেক আগেই করা হয়েছিল। তখন আমিও ছিলাম না।

শর্টলিংকঃ