আইন লঙ্ঘন করে চলছে পুকুর ভরাট

তৈয়বুর রহমান: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তায় পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে নগরীতে একের পর এক পুকুর ভরাট চলছেই। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে রাজশাহী নগরী। নগরীতে জলাশয় ও পুকুর সংরক্ষণের দায়িত্বে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) ও পরিবেশ অধিদপ্তর থাকলেও কোন নজর নেই তাদের। এদিকে ১৯টি পুকুর সংরক্ষণের দায়িত্ব থাকলেও সেদিকে নজর নেই রাসিকের।

নগরীর কাজিহাটা (নিউ গভ: ডিগ্রি কলেজ হোস্টেল পার্শ্বে) সাড়ে ৬ বিঘা জমির ওপর রয়েছে একটি পুকুর। এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এ পুকুরের পানি ব্যবহার করেন।

ওই এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, বহুদিনের ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুরটি ভরাট হলে এ এলাকার মানুষ অনেক অসুবিধায় পড়বেন। কারণ গোসল থেকে শুরু করে তারা এ পুকুরের পানি পারিবারিক বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে থাকেন। পুকুরের সামনেই নগরীর খুবই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা লক্ষ্মীপুর মোড়। এখানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে। এ কারণে সেখানে প্রতিদিন রোগ-শোক নিয়ে আসা শতশত মানুষ, হাত-মুখ ধোয়, কাপড় পরিষ্কার করে এবং গোসল করে ক্লান্তি দূর করে ।

মহল্লার রেবা খাতুন বলেন, এ পুকুরে আমরা দীর্ঘদিন ধরে গোসল করি, থালা-বাসন ধোয়া-মাজা করি। রোদের তাপ ও ভ্যাপসা গরমে পুকুর ধারের গাছের নিচে বসে আরাম করি। এ পুকুরটি থাকার ফলে এ এলাকার অনেক মানুষের উপকার হচ্ছিল। এখানকার পরিবেশও ছিল অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। এ পুকুরটি ভরাট হয়ে গেলে মানুষ অসুবিধার মধ্যে পড়বেন। আশপাশের মানুষ যারা পুকুরের পানি ব্যবহার করেন, গোসল করেন, থালা-বাসন ধোয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজে ব্যবহার করেন, পুকুরটি ভরাট হয়ে গেলে সে সব সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হবেন। আর পুকুরের কারণে এলাকার পরিবেশ ঠাণ্ডা ছিল, শীতল হাওয়া বইতো, ভরাট হলে তা থেকে বঞ্চিত হবেন এলাকার জনসাধারণ। তাই পুকুরটি ভরাট না করে টিকিয়ে রাখা অতি জরুরি বলে মনে করেন এলাকাবাসী।

কিন্তু রাতের আধারে পুকুরটিতে এখন ভরাটের কাজ চলছে অতি গোপনে। রাতের অন্ধকারে লোকচক্ষুর অন্তরালে মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। সূত্রমতে পৈতৃক সূত্রে পুকুরের মালিক হচ্ছেন কাবিল মণ্ডল এবং জমির উদ্দিন। তারা তাদের বাপ-দাদার অংশ হিসেবে ভাগ পেয়েছেন এ পুকুরটি বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এ সম্পর্কে খোঁজই রাখেন না আরডিএ এবং রাসিক।

আরডিএর সূত্র অনুযায়ী রাসিকের সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে নগরীর ১৯টি পুকুর। তার মধ্যে এই পুকুরটিও রয়েছে। অথচ পুকুরটি ভরাট হলেও রাসিক কর্তৃপক্ষ তা জানেন না। পরিবেশ আইনে জলাশয় ও পুকুর ভরাট নিষিদ্ধ থাকলেও এ পুকুরটিকে রক্ষা করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর।

এ সম্পর্কে আরডিএ’র পুকুর জলাশয় তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে নিয়োজিত আরডিএর প্লানার আজমিরি আশরাফির সাথে যোগাযোগ করে কাজিহাটার পুকুরটি ভরাটের কথা জানালে তিনি পুকুরের সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দেন তার এ দায়িত্বরত কর্মচারি ও কর্মকর্তাদের। সরেজমিন তদন্ত শেষে পুকুর ভরাট চলছে জানতে পারেন। তিনি এই মর্মে নিশ্চিত হন যে নগরীতে রাসিকের পুকুর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় যে ১৯টি পুকুর রয়েছে এটি তার একটি। তিনি বলেন, এরই মধ্যে পুকুরটি ভরাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নগরীর রাজপাড়া থানা, রাসিক ও জনপ্রতিনিধিদের পত্র দেয়া হয়েছে বলে আজমিরি আশরাফি জানান।

তারপরও ভরাট হচ্ছে কাজিহাটার এ পুকুরটি। আরডিএ সূত্র মতে পুকুরটি সংরক্ষণ করার কথা রাসিকের। অথচ এ পুকুর সম্পর্কে রাসিকের প্লানার গোলাম মুর্শেদকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, নগরীর পুকুর দেখার দায়িত্ব রাসিকের নয়। অথচ আরডিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নগরীর ১৯টি পুকুরকে রাসিকের সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অবহেলার কারণে নগরীর অধিকাংশ পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। এভাবে পুকুর ও জলাশয় ভরাট অব্যাহত থাকলে নগরবাসী পরিবেশ বিপর্যয়ে মুখে পড়বে। রাসিক, আরডিএ কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ যেহেতু নগরীর পুকুর জলাশয় সংরক্ষণ ও নজরদারির দায়িত্বে রয়েছে সেহেতু এর দায় তারা এড়িয়ে যেতে পারে না বলে সচেতন মহলের অভিমত। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে পরিবেশ রক্ষায় পুকুর ও জলাশয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে নগরীতে অনেক পুকুর ভরাট হয়ে গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৫৫ বছরে নগরীর প্রায় চার হাজার পুকুর ভরাট হয়েছে। এত পুকুর ভরাট হলেও এর বিরুদ্ধে আরডিএ মামলা দায়ের করেছে মাত্র দুটি! আরডিএ এবং রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের দেয়া তথ্য মতে, ১৯৬১ সালে রাজশাহী নগরীতে ছোট-বড় পুকুর, দিঘি ও জলাশয় ছিল ৪ হাজার ২৮৩টি। আর এখন তা কমতে কমতে এ সংখ্যা মাত্র ২১৪টিতে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় হেরিটেজ রাজশাহী নামের একটি সংগঠনের করা রিটের প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর উচ্চ আদালত রাজশাহী নগরীর সব জলাশয়, পুকুর, ডোবা ও খাল ভরাটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তা সত্ত্বেও নগরীতে থেমে নেই পুকুর ভরাট।

হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী জানান, এখন এক বিঘা বা তার বেশি আয়তনের পুকুর টিকে আছে ১৬৫টি। এগুলোও নানা কৌশলে ভরাটের প্রক্রিয়া চলছে। তবু নিশ্চুপ ভূমিকায় রয়েছে আরডিএ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর। কোথাও পুকুর ভরাট শুরু হলে সংস্থা দুটি একে অপরের কাঁধে দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। এ অবস্থায় কর্মকর্তারা পুকুরপাড়ে যাওয়ার আগেই পুকুর ভরাট হয়ে যায়।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কবলে রাজশাহীবাসী। প্রায় সব পুকুর ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে তারা। এখন রাজশাহীকে চরমভাবাপন্ন গ্রীষ্ম এবং অনাবৃষ্টির অঞ্চল হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। তাই অন্তত উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে এ ব্যাপারে প্রশাসনকে কঠোর অবস্থানে যাওয়া দরকার বলে তিনি জানিয়েছেন।

এদিকে বোয়ালিয়া ভূমি অফিসের এক জরিপ থেকে জানা গেছে, ২০১৪ সালেও নগরীর ৩৭টি মৌজায় ১ হাজার ৫০টি পুকুরের অস্তিত্ব ছিল। এর মধ্যে ৪৮টি পুকুর ছিল খাস জমিতে। ব্যক্তি মালিকানায় থাকা পুকুরগুলোর পাশাপাশি খাস জমির এসব পুকুরও ভরাট হচ্ছে অবলীলায়।

ভূমি অফিসের তথ্য মতে, ৪৮টি খাস পুকুরের মধ্যে ৯টি পুকুর লিজ নিয়ে প্রভাবশালীরা ভরাট করে নেন। এছাড়া আরও ৮টি পুকুর ভরাট করা হয়েছে কোনো লিজ ছাড়াই ক্ষমতার দাপটে। বাকিগুলোও ভরাটের প্রক্রিয়ায়। বর্তমানে নগরীর শিরোইল মঠপুকুর, সাগরপাড়া কাউম ডাক্তারের পুকুর, সুলতানাবাদ চতুর্ভূজ পুকুর, টিকাপাড়া খুলিপাড়া পুকুর, টিকাপাড়া গোরস্থানের পুকুর, সপুরা ছয়ঘাটি পুকুর, মহিষবাথানের পুকুর, মিশন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সামনের পুকুর, আরএফ পুলিশ লাইনের পুকুর, হেলিনাবাদ কলোনির পুকুর,লক্ষ্মীপুর ভাটাপাড়া জামে মসজিদের পার্শ্বে পুকুর, লক্ষ্মীপুর টিবি পুকুর, সোনাদিঘি পুকুর, বিসিকের মঠপুকুর, মেহেরচণ্ডীর দিঘি, হড়গ্রাম মুন্সিপাড়া পুকুর, রাণীদিঘির পুকুর. চাঁড়াল পুকুর, দড়িখড়বোনা পুকুর, কাদিরগঞ্জ পুকুর, পদ্মা আবাসিক এলাকার বড়পুকুর, ছোট বনগ্রাম পুকুর, শিরোইল কলোনি উচ্চ বিদ্যালয় পুকুর ও সিপাইপাড়া পুকুরসহ হাতেগোনা কিছু পুকুর টিকে আছে। তবে সিটি করপোরেশনের অবহেলা এবং জনসাধারণের যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলার কারণে এগুলোও এখন অস্তিত্ব বিলিনের পথে।

আরডিএ কর্তৃপক্ষ নগরীর ২০টি পুকুর সংরক্ষণের ঘোষণা দিলেও পুকুরগুলো সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল। আর এ বাস টার্মিনাল ও তৎসংলগ্ন মার্কেট নির্মাণ করেছে খোদ আরডিএ। পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা বলছেন, রাজশাহীতে হাতেগোণা যেসব পুকুর টিকে আছে সেগুলো রক্ষা করতে হলে এখনই পুকুরগুলোকে সংরক্ষিত ঘোষণা করে সাইনবোর্ড ঝোলাতে হবে। তবে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নূর আলম। তিনি জানান, পুকুরগুলো রক্ষায় আপাতত এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ, কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনা নিয়েই করতে হয়। পুকুর ভরাট হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, জনবল সঙ্কটের কারণে পুকুর ভরাটে অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালানো যায় না। তবে খবর পেলেই পুকুর ভরাটকারীকে নোটিশ পাঠিয়ে ভরাট বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়।

রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) নগর পরিকল্পক আজমেরী আশরাফীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে না পাওয়ায় কথা বলা হয় সংস্থাটির সহকারী নগর পরিকল্পক রায়হেনুল ইসলাম রনীর সঙ্গে। তিনি জানান, পুকুর ভরাট বন্ধ করতে কোন কাজ আরডিএ’র এবং কোনটি পরিবেশ অধিদপ্তরের, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। এ জন্য অনেক সময় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায় না। তবে এখনও পর্যন্ত আরডিএ দুই পুকুর ভরাটকারীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করেছে বলে জানান তিনি।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ